• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

আমরা যারা স্বার্থপর

jafor ikbalমুহম্মদ জাফর ইকবাল: আমি আজকে যে বিষয়ে লিখছি তা নিয়ে লেখাটা বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে কিনা, আমি বুঝতে পারছি না। আমার বুদ্ধি খুব বেশি সেটা কখনোই কেউ বলেনি (যাদের বুদ্ধি খুব বেশি তারা যে খুব শান্তিতে থাকে তাও নয়) তবে কিছু একটা লেখালেখি করে আমি সেটা পত্রপত্রিকায় ছাপিয়ে ফেলতে পারি। সে জন্য আমি যেন দায়িত্বহীনের মতো কিছু লিখে না ফেলি আমার সব সময় সেটা লক্ষ্য করতে হয়। আমার চেয়ে অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে লিখেও অনেকে তাদের লেখা পত্রপত্রিকায় ছাপাতে পারেন না, তারা মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে আমার কাছে সেই লেখাগুলো পাঠান, আমি পড়ি এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আজকাল লেখাগুলো শুধু যে কাগজে ছাপা হয় তা নয়, সেগুলো ইন্টারনেটেও প্রকাশ হয়। সেখানে একটা নতুন স্টাইল শুরু হয়েছে, প্রত্যেকটা লেখার পেছনে লেজের মতো করে পাঠকেরা তাদের মন্তব্য লিখতে পারেন। আমি এখন পর্যন্ত কখনোই আমার লেখার পেছনের লেজে লেখা পাঠকদের মন্তব্য পড়িনি, কখনো পড়ব না বলে ঠিক করে রেখেছি। পৃথিবীর এমন কোনো মানুষ নেই যে নিজের সম্পর্কে ভালো কিছু শুনতে চায় না। তাই সেই মন্তব্যগুলো পড়লে আমি হয়তো নিজের অজান্তেই এমনভাবে লিখতে শুরু করব যেন সবাই আমার লেখা পড়ে ভালো ভালো মন্তব্য করে। আমি সেটা চাই না, আমার যেটা লিখতে ইচ্ছে করে আমি সেটা লিখতে চাই। আমার সব কথাই যে সবার জন্য সত্যি হবে সেটা তো কেউ বলেনি। আমার কথাটা সবাইকে মেনে নিতে হবে সেটাও আমি বলছি না, শুনতে নিশ্চয়ই সমস্যা নেই।

এত লম্বা একটা ভূমিকা দিচ্ছি তার কারণ আজকে আমি যাদের নিয়ে লিখছি তারা সবাই আমার সহকর্মী, তাদের সঙ্গে আমার ওঠাবসা! তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমার লেখাটি পড়ে তারা হয়তো একটু ক্ষুব্ধ হবেন-খানিকটা আহত বোধ করবেন তাই আগেভাগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কয়েকদিন আগে আমার টেলিফোনে একটা এসএমএস এসেছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সব শিক্ষকের একটা মানববন্ধনে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। যদিও এসএমএসটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এটি শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রোগ্রাম নয়-এটি ইউনিভার্সিটি ফেডারেশনের প্রোগ্রাম, অর্থাৎ বাংলাদেশের সব পাবলিক ইউনিভার্সিটির সব শিক্ষক সমিতির সম্মিলিত একটি প্রোগ্রাম। মানববন্ধনে দুটি দাবির কথা বলা হয়েছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল, দ্বিতীয়টি তাদের শিক্ষকতা জীবন বাড়িয়ে ৬৭ বছর করে দেয়া! আমি এই দুটি দাবি নিয়ে আমার নিজের কথাগুলো বলতে চাই।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন কত? প্রকৃত সংখ্যাটি বলা রুচিহীন কাজ হবে তাই অন্যভাবে বলি। আমি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক, আমার ছাত্রছাত্রীরা যখন কোথাও চাকরি পেয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, আমি তখন তাদের জিজ্ঞেস করি, ‘তোমার বেতন আমার থেকে বেশি তো?’ তারা একটু লজ্জা পায় কিন্তু প্রায় সব সময়েই মাথা নেড়ে জানায় যে তাদের বেতন আমার থেকে বেশি। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সিনিয়র শিক্ষক, যতদূর জানি আমার বেতন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতন! সত্যি মিথ্যা জানি না, শুনেছি সচিবালয়ের একজন মাঝারি আমলা তার গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমার বেতন থেকে বেশি টাকা পান। আমাদের পাশের দেশ ভারতবর্ষের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা একবার গিয়েছিলাম, সেখানকার লেকচারাররা সবাই নিজের গাড়ি চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন! সেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন আমাদের বেতন থেকে আনুমানিক চার গুণ বেশি! সেই দেশটি সুই থেকে গাড়ি সব কিছুই নিজেরা তৈরি করে তাই সে দেশে বেঁচে থাকার খরচ আমাদের থেকে কম। অনেকদিন আগে আমি একবার পত্রিকায় লিখেছিলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারারের বেতন একজন গাড়ির ড্রাইভারের বেতন থেকে কম। মনে আছে পরের দিন একজন লেকচারার শুকনো মুখে আমার কাছে ছুটে এসেছিল, হাহাকার করে বলছিল, ‘স্যার, আপনার লেখা পড়ে আমার বিয়ে ভেঙে গেছে।’

তবে কেউ যেন ভুল না বোঝেন, বিয়ের বাজারে কদর কমে যাবে জেনেও কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে ভালো ছাত্র এবং ছাত্রীরা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে চায়। সম্ভবত এটাই হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি! তবে এই শক্তি কতদিন থাকবে আমি জানি না। একজন ছাত্র বা ছাত্রী সবার চাইতে ভালো পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও আজকাল আর নিশ্চিত হতে পারে না সে কী আসলেই শিক্ষক হতে পারবে কিনা। নিজের সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে দলবাজি করে এমন শিক্ষকদের পাশে তাদের ঘুরঘুর করতে হয়। নিয়োগ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের পকেটে নিজেদের প্রার্থী থাকে। তারা সরাসরি একে অন্যের সঙ্গে দরদাম করেন, বলেন, ‘আমার একজনকে নেন তাহলে আমি আপনার একজনকে নিতে দেব।’ বাইরে ছাত্রনেতারা বসে থাকে, মন্ত্রীরা ফোন করে, সাংসদেরা হুমকি দেন। তাই পত্রিকায় একজন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেয়া হলেও হালি হিসেবে শিক্ষক নিতে হয়। যারা সত্যিকারের ভালো মেধাবী শিক্ষক তারা শেষ পর্যন্ত আরো ভালো জায়গায় চলে যায়, অপদার্থরা থেকে যায়। দেখতে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অপদার্থ শিক্ষকের আড্ডাখানা হয়ে যায়। তাতে কোনো সমস্যা নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রমোশনের নিয়ম খুবই উদার, বয়স হলেই লোকচাররা দেখতে দেখতে প্রফেসর হয়ে যায়।

যাই হোক, আমি অবশ্যি শিক্ষকদের বেতন নিয়ে কথা বলতে বসেছি, তারা কী পদার্থ না অপদার্থ সেটা নিয়ে কথা বলতে বসিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এক সময় খুব সম্মানিত মানুষ ছিলেন, এখন আর সে রকম সম্মানী মানুষ নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বললেই চোখের সামনে একজন জ্ঞানতাপস গবেষক এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের চেহারা ফুটে না উঠে কুটিল-কৌশলী-দলবাজ-রাজনৈতিক মানুষের চেহারা ফুটে ওঠে। যে চেহারাই ফুটুক, এই বেচারাদের সংসার খরচ চালাতে হয়, খানিকটা ঠাট বজায় রাখতে হয় সে জন্য তাদের একটা সম্মানজনক বেতন দরকার। খুব উচ্চমহলে সেটা নিয়ে দেন-দরবার করার পর একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটা মিলিয়ন ডলার উপদেশ দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, ‘আপনাদের বেতন বাড়ানোর কোনো রাস্তা নেই। পরীক্ষার খাতা-ফাতা দেখার সময় বেশি বেশি টাকা বিল করে কোনোভাবে পুষিয়ে নেন।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সেই মিলিয়ন ডলার উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। তারা পরীক্ষার খাতা দেখার জন্য টাকা নেন, পরীক্ষার গার্ড দেয়ার জন্য টাকা নেন, ভাইভা নেয়ার জন্য টাকা নেন। পৃথিবীর সব দেশে পরীক্ষার খাতা একবার দেখা হয়, এই দেশে সেটা দুইবার দেখা হয়, কোনো কোনো সময় তিনবার! আমি নিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের পড়াই, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম সব সময় তক্কে তক্কে থাকতাম কিভাবে লেখাপড়া না করেই কাজ চালিয়ে দেয়া যায়। আজকালকার ছাত্রছাত্রীদের খুব একটা উন্নতি হয়নি তারাও তক্কে তক্কে থাকে কিভাবে পড়াশোনা না করে ছাত্র জীবনটা ম্যানেজ করে ফেলা যায়। তাদেরকে জোর করে লেখাপড়া করার অমোঘ অস্ত্র হচ্ছে ঘনঘন ক্লাস টেস্ট নেয়া, আমি সেটা করি এবং আমার ধারণা মুখে স্বীকার না করলেও আমার ছাত্রছাত্রীরা সে জন্য কখনো আমাকে ক্ষমা করেনি। খুবই বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করেছি যে এখন নাকি ক্লাস টেস্ট নিলেও টাকা পাওয়া যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নানা ধরনের কমিটিতে থেকে কাজ করতে হয়। আজকাল দেখছি কমিটিতে বসে মিটিং করলেই একটা পেট মোটা খাম ধরিয়ে দেয়া হয়! আমি অপেক্ষা করে যাচ্ছি কোন দিন শুনতে পাব ক্লাস নিলেই এখন হাতে টাকার খাম ধরিয়ে দেয়া হবে। এটাই শুধু বাকি আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের টাকা উপার্জনের সবচেয়ে অসম্মানজনক এবং অনৈতিক পদ্ধতিটি হচ্ছে ভর্তিপরীক্ষা নামক প্রক্রিয়া থেকে টাকা উপার্জন। আমার কথা বিশ্বাস না করলে একবার ভর্তিপরীক্ষার পর একেকজন শিক্ষক কত টাকা করে উপার্জন করেন তার তালিকাটি এক নজর দেখা উচিত। আমি বহুদিন থেকে সাংবাদিকদের বলে আসছি ভর্তিপরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষকেরা কে কোন কাজটুকু করার বিনিময়ে কত টাকা আয় করেছেন সেটা যেন প্রকাশ করে দেন। এটি একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য হতে পারত, আমার ধারণা আমাদের দেশের সাংবাদিকদের এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য এক ধরনের সম্মানবোধ এবং ক্ষমতা আছে তাই এই তথ্যগুলো কখনো প্রকাশ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো এত বড় সম্মানী মানুষেরা অল্প কিছু টাকা-পয়সার জন্য এত ধরনের তুচ্ছ কাজ করেন তার কারণ একটাই, তাদের খুব অল্প বেতন এবং তার চেয়েও কম সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সম্ভবত তাদের আর কোনো উপায় নেই। তাই তারা যদি নিজেদের আলাদা বেতন স্কেলের জন্য মানববন্ধন করেন, পথে নেমে দাবি-দাওয়া পেশ করেন তাহলে তাদের দোষ দেয়া যায় না। আমি মনে করি তাদের দাবিটি খুবই যৌক্তিক কিন্তু তারপরও আমি কিন্তু সেই মানববন্ধনে যোগ দেইনি। কেন যোগ দেইনি সেটি বলার জন্য আমার এই বিশাল গৌরবচন্দ্রিকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন কম হতে পারে কিন্তু তারা এই দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ভাইস চ্যান্সেলররা এই দেশের মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে ওঠাবসা করেন। রিটায়ার করার পর তারা নানা দেশের হাই কমিশনার অ্যাম্বাসেডর হন। তারা প্রধামন্ত্রীর উপদেষ্টা হন। রাষ্ট্রের সব বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে তারা সদস্য থাকেন। প্রশ্ন ফাঁস হবার পর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে লাইনে আনার জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যে মিটিং ডেকেছিলেন আমি সেখানে বসে ডানে বামে যেদিকেই তাকিয়েছি সেদিকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের দেখেছি। স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের দেখিনি। সেখানে কথাবার্তা যা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাই বলেছেন, স্কুল-কলেজের লেখাপড়ার সমস্যার কথা যখন আলোচনা হয়েছে সেটাও আলোচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা; যাদের প্রকৃত বাস্তব সমস্যা নিয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। যারা এই দেশের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন সেই স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা যেন একটা গুরুত্বহীন জনগোষ্ঠী। তাদের কথা কে বলবে? কোথায় বলবে? আমি মাঝে মাঝে একেবারে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের জগৎটি প্রায় পরাবাস্তব জগতের মতো। যেভাবে তাদের দিন কাটাতে হয় ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে হয় সেটি নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হয় না। ভোটার লিস্ট থেকে শুরু করে গ্রামে কতগুলো স্যানেটারি ল্যাট্রিন আছে সেটাও তাদের করতে হয়। তারা কি যথেষ্ট বেতন পান? সেই বেতন নিয়ে তারা কি সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন? যদি না পারেন তাহলে তাদের বেতন বাড়ানোর কথা কে বলবে? কার কাছে বলবে? তাদের কথা কে শুনবে? আমি বিশ্বাস করি, তাদের কথাও আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই বলতে হবে, কারণ আমরা একেবারে ওপরের মহলে কথা বলার সুযোগ পাই তারা পায় না। তাই আমি যখন হঠাৎ করে দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাদের আলাদা একটা বেতন স্কেলের জন্য মানববন্ধন করছেন তখন আমার কেন জানি মনে হয় তারা স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের কথা বলছেন। দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার নেতৃত্বের দায়টুকু যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ঘাড়েই পড়েছে তাদের দাবিটি হওয়া উচিত ছিল সব শিক্ষকের জন্য। মানববন্ধন করা উচিত ছিল বাংলাদেশের সব শিক্ষকের আলাদা বেতন স্কেলের জন্য-শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নয়। সত্যি কথা বলতে কি আলাদা বেতন স্কেল যদি শুরু করতে হয় তাহলে প্রথমে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের দিয়েই শুরু করতে হবে। আমরা যদি আমাদের দেশের শিক্ষার মান বাড়াতে চাই, হাইফাই নূতন বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে হবে না, ভালো প্রাইমারী স্কুল দিয়েই করতে হবে।
অবশ্য বলাই বাহুল্য এই পুরো দাবিটা আসলে এক ধরনের নিষ্ঠুর কৌতুকের মতো, আমরা সবাই জানি কখনোই এটা হবে না, ক্ষমতাশালী আমলারা গলাটিপে শিক্ষকদের আলাদা বেতন স্কেলের দাবিটাকে শেষ করে দেবেন! শিক্ষক বললে যে মানুষগুলোর ছবি তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই মানুষগুলোর জন্য তাদের কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই, কোনো ক্ষমতা নেই। তাদের আলাদা বেতন স্কেল দেয়ার আগে রাস্তাঘাট তৈরি হবে, ব্রিজ তৈরি হবে, কলকারখানা হবে, এয়ারপোর্ট হবে, যুদ্ধজাহাজ হবে, ক্যান্টনমেন্ট হবে, ফাইটার প্লেন হবে, বন্দর হবে, শুধু শিক্ষকদের বেতনটুকু হবে না, তাদেরকে সম্মানজনকভাবে বাঁচতে দেয়া হবে না। কেমন করে হবে? বাংলাদেশ সরকার সারা পৃথিবীর সামনে অঙ্গীকার করেছিল যে এই দেশের জিডিপির শতকরা ৬ শতাংশ শিক্ষার পেছনে খরচ করবে। সেই অঙ্গীকার সরকার রাখেনি, এখন জিডিপির মাত্র ২.২ শতাংশ শিক্ষার পেছনে খরচ হয়। আর কোনো সভ্য দেশে শিক্ষার পেছনে এত কম টাকা খরচ করে না! সত্যি কথা বলতে কি এত কম টাকা খরচ করার পরও আমরা যে কোনো এক ধরনের শিক্ষা পাচ্ছি সেটাই মনে হয় আমাদের চৌদ্দ পুরুষের ভাষ্য! বাংলাদেশে যদি শুধুমাত্র একটা দাবি করতে হয় তাহলে সেটি হতে হবে এই বিষয়টি নিয়ে, দরকার হলে সব কিছু বন্ধ করে শিক্ষার জন্য আরো বেশি অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

২.
শিক্ষকদের দ্বিতীয় দাবিটি হচ্ছে তাদের চাকরির বয়স সীমা ৬৭ করে দিতে হবে, আমি এর সরাসরি বিরুদ্ধে। অল্প কিছুদিন আগেও সেটা ছিল ৬০ বছর। কিভাবে কিভাবে সেটা জানি ৬৫ করিয়ে নেয়া হলো, সেটাতে এখনো অভ্যস্ত হইনি এখন হঠাৎ করে দাবি উঠেছে সেটাকে ৬৭ করতে হবে। সত্যি কথা বলতে কি অন্য সবাইকে দাবি করে সেটা আদায় করতে হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত তাদের কারো কাছ থেকে সেটা আদায় করতে হয় না, নিজেরা নিজেরাই সেটা নিজেদের জন্য করে ফেলে! যতদূর জানি কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সেটা এর মাঝে করেও ফেলেছে, অন্যদের তাহলে দাবি তুলে সেটা আদায় করতে হবে কেন? নিজেরা নিজেরা করে ফেললেই পারে। পৃথিবীর নিয়ম হচ্ছে পুরনোদের সরে গিয়ে নতুনদের জায়গা করে দিতে হবে। বুড়ো বুড়ো অধ্যাপকেরা যদি সরতে রাজি না হন, বছরের পর বছর নিজের চেয়ারটা জোর করে আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন তাহলে নূতনেরা কেমন করে দায়িত্ব নেবেন? যারা চেয়ারটা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তাদের কজন বুকে হাতে দিয়ে বলতে পারবেন যে তারা নিজেদের কাজ-কর্ম গবেষণা দিয়ে এই জায়গায় পৌঁছেছেন? যারা সত্যিকারের ভালো অধ্যাপক তাদের সাহায্যটুকু নেয়ার জন্য একশ’ একটা উপায় বের করা যায়, সে জন্য তাদের চাকরির বয়স ৬৭ করতে হয় না।
যখন শুনতে পেয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরির বয়স সীমা ৬৭ করার একটা পাঁয়তারা চলছে তখন আমার একজন অধ্যাপক বন্ধু আমাকে বিষয়টা বুঝিয়েছিল। সে বলেছিল, ‘অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক অমুক প্রফেসরের রিটায়ার করার সময় এসেছে, অবসরের বয়স ৬৭ করা না হলে তারা বিদায় হয়ে যাবে ইউনিভার্সিটির পলিটিক্স আর করতে পারবে না। পলিটিক্সের জন্য তাদেরকে রাখতেই হবে সে জন্য তাড়াহুড়ো করে চাকরির বয়স ৬৭ পর্যন্ত ঠেলে দেয়া হয়েছে।’ আমার অধ্যাপক বন্ধু আরো ভবিষ্যদ্বাণী করল, বলল, ‘অমুক অমুক বিশ্ববিদ্যালয় এখন বয়সসীমা ৬৭ করবে না কারণ সেটা করা হলে অমুক অমুক প্রফেসরদের বিদায় করা যাবে না। তারা বিদায় হবার পর এটা ৬৭ করা হবে কারণ, তখন আর কোনো সমস্যা হবে না। ভাইস চ্যানেন্সলরদের বয়স কম তাদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই।’

আমি বিশ্ববিদ্যালয় জটিল পলিটিক্স বুঝি না তাই আমার অধ্যাপক বন্ধুর ভবিষ্যদ্বাণীর মাঝে কতটুকু যুক্তি এবং কতটুকু টিটকারী ধরতে পারিনি! ভবিষ্যদ্বাণীটুকু মিলে গেলে বুঝতে পারব, দেখার জন্য অপেক্ষা করে আছি!
আপাতত আমি বলতে চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বয়সীমা ৬৭ করে ফেলাটুকু হবে নেহায়েত স্বার্থপরের কাজ। শুধু নিজেদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল দাবি করে যে স্বার্থপরের কাজ করেছি, নূতন প্রজন্মকে জায়গা করে না দিয়ে জোর করে চেয়ারটা ধরে রেখে সেই স্বার্থপরতাটুকু ষোলোকলায় পূর্ণ করার আমি ঘোরতরবিরোধী।
আমার কথা কাউকে মানতে হবে না, শুনতে দোষ কী?

লেখক: শিক্ষাবিদ, কম্পিউটার বিজ্ঞানী, কথাসাহিত্যিক, সমাজ বিশ্লেষক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ