সিসি ডেস্ক: ধর্মকে পুঁজি করে ‘বিখ্যাত’ বনে যাওয়া জামায়াতের নায়েবে আমির যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ মাহফিলে ভাটা পড়েছে। ১৯৭৮ থেকে ২০১০ সালে গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তিনি যেভাবে একচেটিয়া ধর্ম ব্যবসা করেছেন, সেটা এখন শূন্যের কোটায়।
বামপন্থিদের সমালোচনা, নারীর অধিকারের কথা বলে পাশ্চাত্যের দিকে নিয়ে যাওয়া, ভারতবিরোধী আর তথাকথিত সমসাময়িক ওয়াজ মাহফিল করে রাতারাতি ‘খ্যাতি’ পাওয়া এই নেতা এখন ফাঁসির রশিতে ঝোলার অপেক্ষায়।
স্বাধীনতার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে কয়েকটা সংগঠন গড়ে তুলে রাতারাতি দেশ ও দেশের বাইরেও পেয়ে যান খ্যাতি। হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক ‘মুফাসসেরে কুরআন’।
সাঈদীর জীবন বৃত্তান্ত থেকে জানা গেছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ওয়াজ মাহফিল শুরু করলেও তিনি মূলত ১৯৮৫ সালের পর থেকেই জনপ্রিয়তা পেতে থাকেন। ১৯৮১ সালে জামায়াতে যোগদান করার পর তার উত্থান দ্রুত ঘটতে থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিল করে করে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন তিনি।
সর্বশেষ ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নিচুমনা ওয়াজ তার খ্যাতিকে আরো বাড়াতে থাকেন। সেবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি ধর্মকে পুঁজি করে আওয়ামী লীগ ও বামদের সমালোচনা করে ওয়াজের একটি ক্যাসেট বের করেন, যা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেন জামায়াতিরা। বিএনপি-জামায়াত মনে করে সাঈদীর ওই ক্যাসেট আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল।
২০০১ সালের এক নির্বাচনী সভায় সাঈদী বলেছিলেন, ‘এ নির্বাচন হবে ইসলাম আর আওয়ামী লীগের নির্বাচন। যারা আওয়ামী লীগে ভোট দেবেন, তারা কাফের’।
তার ইসলামবিরোধী কথার কারণে তখন প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সারাদেশে। কিন্তু সাঈদী তার বক্তব্য চালিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে কখনো এ বক্তব্যের জন্য ক্ষমা পর্যন্ত চাননি তিনি।
কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি যখন-তখন যাকে-তাকে কাফের, মোনাফেক বলে গালি দিতেন।
সাঈদীর শুরু যেভাবে
মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতার পর কিছুদিন পালিয়ে পালিয়ে থাকলেও পরে প্রকাশ্যে এসে ভোল পাল্টাতে থাকেন সাঈদী। আঁকড়ে ধরেন ধর্ম ব্যবসা ও ওয়াজ মাহফিলকে।
তিনি বুঝতে পারেন, নিজেকে রক্ষা ও আখের গুছানোর জন্যে ধর্মকে ব্যবহার করাই শ্রেয়। পরবর্তীতে তিনি এর পুরোটাই ব্যবহার করেছেন। ৭২-৭৩ সালে তিনি আস্তে আস্তে পিরোজপুর ছাড়তে শুরু করেন। ১৯৭৮ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় শূরু করেন ওয়াজ মাহফিল। সে সময় তিনি সামান্য খ্যাতি পেলেও ১৯৮১ সালে জামায়াতে যোগদানের পর তার উত্থান আর ঠেকানো যায়নি।
সাঈদী মূলত ১৯৮৫ সালের পর থেকেই জনপ্রিয়তা পেতে থাকেন। ১৯৮১ সালে জামায়াতে যোগদান করার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিল করে করে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে তিনি দেশের বাইরে যাওয়া শুরু করেন। বনে যান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসেরে কুরআন। তার এ তথাকথিত খ্যাতির পুরোটাই ২০০১ সালের নির্বাচনে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক দল জামায়াত।
সেবারের নির্বাচনে চার দলীয় জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সাঈদী বনে যান সুপার স্টার, দেশের সেরা মুফাসসেরে কুরআন। সঙ্গে বেড়ে যায় তার ওয়াজের চাহিদাও। তিনি তখন সংসদ সদস্য হলেও সংসদের বাইরে ওয়াজ মাহফিলে বেশি সময় ব্যয় করেছেন বামপন্থি, ভারত আর আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রথিতযশা আলেমদের সমালোচনায়।
চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে প্রতি বছর পাঁচ দিনব্যাপী কুরআনের তাফসিরের নামে ধর্মকে রাজনীতিতে চরমভাবে ব্যবহার করতে থাকেন সাঈদী। তিনি তার ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার শুরু করেন।
২০০১-২০০৬ মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের পুরো সময়সহ পরবর্তীতে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে উস্কে দেওয়ার মতো বিভিন্ন ওয়াজ চালিয়ে যান। নিজের আখের গুছানোর জন্যে ধর্মকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে তার বিবেকে বাধে নাই।
জামায়াতের দাবি, সাঈদীর ওয়াজ শুনে মুসলিম হয়েছেন ৬৫০ জনেরও বেশি ‘হিন্দু’। কিন্তু বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া ও প্রতারণা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে গরিব মুসলমানদের ধর্মের ভয় দেখিয়ে এবং টাকার বিনিময়ে নাটক করানো হতো। এটি ছিল জামায়াতের গুঁটির চাল।
তবে সাঈদীর ওয়াজ মাহফিল শুনে হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়ার এসব নাটক তাকে রাতারাতি খ্যাতি এনে দেয়।
ধর্মকে ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি ফায়দা লোটা যায় সেটা ২০১৩ সালে এসে হেফাজতে ইসলাম বুঝলেও সাঈদী ও জামায়াতিরা বুঝেছিলেন ৩৫ বছর আগে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে ‘নাস্তিক-মুরতাদ’ ও পীরদের সমালোচনা করলেই খ্যাতি পাওয়া যাবে সেটা বুঝে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে শতভাগ কাজে লাগান তারা।
এ কাজটি সাঈদীর মাধ্যমেই জামায়াত শুরু করেছিল আশির দশকে। ১৯৭৮ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি সারা দেশে কমিউনিস্টদের আশ্বাসকে মিথ্যা বলে প্রচারণা, মাজার জেয়ারতকে মাজার পূজা, কবর পূজা, পীর পূজা বলে এগুলোকে কুসংস্কার বলে মুসলমানদের মাঝে প্রচার করতে থাকেন।
আর জামায়াতিরা প্রচার করতে থাকেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর তার সমতুল্য ক্যারিয়ার শুধু সাঈদীরই রয়েছে। সাঈদীর এ ‘যোগ্যতাকে’ পুঁজি করে তাকে বঙ্গবন্ধুর সমতুল্য করার অপচেষ্টাও ছিল জামায়াতের, যা শেষ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেনি।
আজকের সাঈদী
একসময়ের ‘খ্যাতিসম্পন্ন’ সাঈদী আজ কুখ্যাত লোক। তার বিরুদ্ধে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। অপেক্ষা ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার। রাতারাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসির এখন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধী।
যুদ্ধাপরাধের দায়ে তার সর্বোচ্চ সাজার রায় হওয়ার পর থেকে তার ওয়াজ মাহফিলের ক্যাসেট, ডিভিডি বিক্রিও কমতে কমতে এখন শূন্যের কোটায়। আম-জনতা আর আগের মতো সাঈদীর ওয়াজ শুনতে আগ্রহী নয়। আগের সাঈদী নয়, যুদ্ধাপরাধী সাঈদী হিসেবে সবাই তাকে ঘৃণা করছেন।
অন্যদিকে তার নিজ দলের কর্মীরাও বিমুখ হয়ে পড়েছেন। জামায়াতেরও আগের মতো আগ্রহ নেই সাঈদীকে নিয়ে। কারণ, তারা বুঝে গেছে তাকে নিয়ে আর যাই হোক, ধর্ম ব্যবসা করা যাবে না।
সাঈদীর একাল-সেকালের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মওলানা ওবায়দুল হক বলেন, ধর্মকে যারা রাজনৈতিক বা নিজেদের কু-কর্ম ঢাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাদের পতন অনস্বীকার্য।
ইতিহাস সাঈদীকে ক্ষমা করেনি মন্তব্য করে তিনি বলেন, তিনি কুরআনের ভাল তাফসির করতে পারতেন। কিন্তু আসল জায়গা থেকে সরে গিয়ে তিনি মানুষকে ধোঁকা দিয়েছেন। হেদায়েতের নামে রাজনৈতিক কর্মী বানাতে চেয়েছেন। ফলাফল যা হওয়ার তাই ভোগ করছেন তিনি। উৎসঃ বাংলানিউজ২৪