সিসি ডেস্ক: লক্ষ্মীপুরে চাঞ্চল্যকর বিএনপি নেতা এডভোকেট নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি ছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমায় ফাঁসির দণ্ডাদেশ থেকে মুক্তি পেয়েছেন ঠিকই তবে যাবজ্জীবন দণ্ড নিয়ে এখনও তিনি কারাগারে। এইচএম বিপ্লব ওরফে বড় মিয়া তার নাম। বাবা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান পৌর মেয়র আবু তাহের। শুক্রবার বিকালে কারাবন্দি অবস্থাতেই বিয়ে করলেন বিপ্লব। পুরো বিষয়টি ঘটেছে অত্যন্ত গোপনে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কনে পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের লামচরী গ্রামের পণ্ডিত বাড়ির মৃত এডভোকেট আবুল খায়েরের মেয়ে সানজিদা খায়ের। ১০ লাখ টাকার দেনমোহর ও ৩০ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের বিনিময়ে অনুষ্ঠিত হয় এই বিয়ে। একজন মৌলভী প্রথমে কনের কাছে গিয়ে কাবিননামায় সই করান। পরে তিনি যান লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে। সেখানে কাবিননামায় সই করেন বিপ্লব। কনে সানজিদা লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের জেলার জয়নাল আবেদীন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর বাইরে তিনি আর কিছু বলতে রাজি হননি। একাধিকবার যোগাযোগ করলেও জেলা প্রশাসক একেএম টিপু সুলতান মোবাইল রিসিভ করেননি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কারাগারে বন্দি থাকা বিপ্লব আগে থেকেই বিলাসী জীবনযাপন করতেন। কারণে-অকারণে কারাগার থেকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে রাখা হতো তাকে। লক্ষ্মীপুরের জেল কর্তৃপক্ষ সব সময় তাহের পরিবারের প্রতি নমনীয় থাকতো। এই সুযোগে সম্প্রতি তাহের পত্নী ও বিপ্লবের মা নাজমা তাহের ছেলের বিয়ে দেয়ার জন্য প্রচেষ্টা শুরু করেন। একপর্যায়ে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লামচরী গ্রামের পণ্ডিত বাড়ির মৃত এডভোকেট আবুল খায়েরের মেয়ে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সানজিদা খায়েরের সঙ্গে বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়। দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছিল গতকাল শুক্রবার। এজন্য শুক্রবার ঘরোয়াভাবে বিয়ের আয়োজন করা হয় কনের বাড়িতে। কনে সানজিদার মা ফেরদৌস খায়ের পুরো বিষয়টি তদারকি করছিলেন। তাহের পরিবারেও বিষয়টি গোপনীয়তার সঙ্গে আয়োজন করা হয়। বিকালে একজন মৌলভী কনের বাড়িতে গিয়ে কাবিননামায় কনের স্বাক্ষর নেন। পরে ওই মৌলভী ও উভয় পক্ষের কয়েকজন সদস্য মিলে যান জেলা কারাগারে। সেখানে গিয়ে তারা বিপ্লবের স্বাক্ষর নেন কাবিননামায়। দেনমোহর ধার্য করা হয় দশ লাখ টাকা। বর পক্ষ থেকে কনেকে স্বর্ণালঙ্কার দেয়া হয় ৩০ ভরি। পরে অতিথিরা সবাই কনের বাড়িতে গিয়ে আপ্যায়নে শামিল হন।
আবু তাহের ও তার ছেলেদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী বাহিনীর নানা অপরাধমূলক তৎপরতার কারণে এক সময় লক্ষ্মীপুর ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। ওই সময় সেখানকার বেশির ভাগ বিএনপির নেতা-কর্মী হামলা ও মামলার মুখে এলাকাছাড়া ছিলেন। ২০০০ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর রাতে সাবেক পিপি ও জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট নুরুল ইসলামকে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর মজুপুর একটি বাসা থেকে সাদা মাইক্রোবাসে অপহরণ করা হয়। পরে তাকে হত্যা করে লাশ কয়েক টুকরা করে মেঘনা নদীতে ফেলে দেয় সন্ত্রাসীরা। পরবর্তীকালে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, তাহেরের তিন ছেলে বিপ্লব, লাবু ও টিপুর নেতৃত্বে নুরুল ইসলামকে অপহরণ করা হয়। ওই রাতেই তাহেরের বাসায় তার স্ত্রী নাজমা তাহেরের উপস্থিতিতে নুরুল ইসলামকে জবাই করা হয়। এরপর লাশ টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে মেঘনা নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এ ঘটনার পরদিন লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি এইচ এম তারেক উদ্দিন মাহমুদ বাদী হয়ে সদর থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। ওই মামলার এজাহারে কোন আসামির নাম উল্লেখ ছিল না। এ ঘটনার ১০ দিন পর বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির সংসদ সদস্যদের একটি দল লক্ষ্মীপুরে যায় এবং ৩৭ জন আসামির নাম উল্লেখ করে পুলিশ সুপারের কাছে মামলার একটি এজাহার জমা দেন। কিন্তু পুলিশ বিএনপির মামলা নেয়নি। আগের এজাহার বহাল রাখে। ২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে মামলার তদন্তে নতুন মোড় নেয়। ২০০২ সালের ৩০শে জুলাই আবু তাহের, তার স্ত্রী নাজমা, তিন ছেলেসহ ৩১ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। মামলাটি তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ২০০৩ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর মামলার নথি আসে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। ২০০৩ সালের ৯ই ডিসেম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় দেয়। তাতে তাহেরের ছেলেসহ পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও নয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। তাহের ও তার স্ত্রী নাজমাসহ তিনজন খালাস পান। বিপ্লব এই মামলার পর থেকে পলাতক ছিলেন। ২০১১ সালের এপ্রিলে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন বিপ্লব। গত টার্মে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থাকাকালীন প্রেসিডেন্ট তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফ করেন। এছাড়া যুবদল কর্মী কামাল ও শিবির নেতা মহসিন হত্যা মামলায় বিপ্লবের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল। স্থানীয় সূত্র জানায়, বিরোধী নেতাকর্মী হত্যাসহ, খুন, চাঁদাবাজি এতিমখানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে জোট সরকারের আমলে সদর থানায় ৮টি মামলা করা হয়। পরে রাজনৈতিক বিবেচনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই সব মামলা থেকে তাকে অব্যাহিত দেয়।