সিসি ডেস্ক: বগুড়ার শেরপুরে টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে পাঁচ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে লাগানো ‘আপৎকালীন’ ধান। কিছু কিছু এলাকার ধান ইতিমধ্যেই নষ্ট হতে শুরু করেছে। আর প্রায় সপ্তাহ ধরে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জিরাশাইল জাতের ধান থেকে নতুন ধানগাছ গজাচ্ছে। এমন অবস্থায় বর্ষণ অব্যাহত থাকলে জমির উঠতি জিরাশাইল ও পারিজাত ধান অধিকাংশ কৃষকই ঘরে তুলতে পারবেন না বলে ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন। আর এই ধান ঘরে তোলা না গেলে কৃষকের প্রায় ১৮ কোটি টাকা ক্ষতি হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
পানিতে লুটাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে উপজেলার বরেন্দ্রখ্যাত পাঁচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় লাগানো বিস্তীর্ণ এলাকার রোপা আউশ মৌসুমের জিরাশাইল ও পারিজাত জাতের ধান পানিতে ভাসছে। ফলে কৃষক চেষ্টা করেও জমির পাকা ধান কাটতে পারছেন না। চোখের সামনেই তা পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ছাতা মাথায় জমির আইলে বসে হা-হুতাশ করছেন তাঁরা।
বগুড়া জেলার বরেন্দ্রখ্যাত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নন্দীগ্রাম ও শেরপুর উপজেলার অধিকাংশ জমিই এই ধান চাষের আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে শেরপুর ও নন্দীগ্রাম উপজেলার কৃষকরা বেশির ভাগ জমিতেই এই মৌসুমের ধান লাগিয়েছেন। প্রতিবছর এই আপৎকালীন ধানি জমির আওতা বৃদ্ধি হচ্ছে বলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে। বোরো ও রোপা আমন মৌসুমের মাঝের ফাঁকা তিন মাসে এখানকার কৃষকরা বাড়তি ফসল হিসেবে এ ধান চাষ করেন। কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য মতে এই ধান চাষের আগে এই সময়টাতে কেবল বগুড়া জেলাতেই প্রায় সোয়া লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি হিসেবে পড়ে থাকত।
পালাশন গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন জানান, গেল বছর একই মৌসুমে সামান্য ক্ষতির মধ্য দিয়ে পার পাওয়া গেলেও এ বছর বৃষ্টি সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। তিনি ১৫ বিঘা জমিতে জিরাশাইল ধান লাগিয়েছিলেন। এর মধ্যে টানা বর্ষণে ফসল কাটার আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে ধান। একই গ্রামের আকবর হোসেন ১১ বিঘা, মোখলেছুর রহমান ৯ বিঘা, দুলাল হোসেন সাত বিঘা, শংকরআটা গ্রামের ইদ্রিস আলী ২০ বিঘা, হেদায়েত আলী সাত বিঘা, ভায়রা গ্রামের নজরুল ইসলাম সাত বিঘা, আরব আলী পাঁচ বিঘা জমিতে আপৎকালীনখ্যাত এসব জাতের ধান লাগিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগ জমির পাকা ধান এখন পানিতে ভাসছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। কৃষক ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, প্রবল বর্ষণ উপেক্ষা করেই তাঁদের এলাকার কিছু কিছু কৃষক জমির ধান কাটছেন। কিন্তু এর পরিমাণ খুবই কম।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, এক বিঘা জমিতে বিশেষ জাতের এসব ধান লাগাতে চার হাজার থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। আবার অনেক কৃষক ভালো ফলনের আশায় এর চেয়েও বেশি ব্যয় করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে টিএসপি, পটাশ, জিপসাম, জমি প্রস্তুত, ধান লাগানো, জমি নিড়ানো, ইউরিয়া সার, কাটা বাবদ শ্রমিক মজুরি ব্যয়। এ ছাড়া ওষুধ ও আনুষঙ্গিক ব্যয় তো রয়েছেই। সব কিছু অনুকূলে থাকলে গতবারের হিসাব অনুযায়ী সর্বোচ্চ বিঘাপ্রতি ১২ থেকে ১৪ মণ হারে ফলন পাওয়া যেত। বাজারদরে এক বিঘার সেই ধান বিক্রি হতো প্রতি মণ ৬৫০ টাকা হিসাবে ৯ হাজার ১০০ টাকায়। কিন্তু এবারের বৈরী আবহাওয়া কৃষকের এসব হিসাব সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। এ পর্যন্ত যাঁরা ধান কাটতে পেরেছেন তাঁদের বিঘাপ্রতি সাত-আট মণ হারে ফলন হয়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন না হলে প্রান্তিক চাষিরা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রোপা আউশ মৌসুমে এ উপজেলায় পাঁচ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে জিরাশাইল জাতের ধান (আপৎকালীন) ধান লাগানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, কৃষকের ভাষায় ‘আপৎকালীন’ এই ধানে মোটামুটি চাল হয়ে গেছে। তাই আবহাওয়া বৈরী হলেও হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হলেও ফলনে পানি সরে গেলে ধান কেটে তাঁরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। তবে এই মুহূর্তে বৃষ্টির কারণে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে কৃষকদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।