আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইদানীং ‘লাভ জিহাদ’ নামে বিচিত্র এবং বিতর্কিত এক শব্দ ভারতের রাজনৈতিক হাওয়ায় ভাসছে। মুসলিম যুবক হিন্দু মেয়েকে প্রেমের টোপ দেখিয়ে বিয়ে করার পর ধর্মান্তরিত করছে, এমনটাই অভিযোগ কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার জেরে ‘লাভ জিহাদ’কে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক।
ঝাড়খন্ডের রাজধানী রাঁচিতে রকিবুল হুসেন খান নামে জনৈক মুসলিম যুবক মিথ্যা পরিচয় দিয়ে নাম পরিবর্তন করে রঞ্জিত সিং কোহলি নাম নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের শ্যুটার ২৩ বছরের তারা শাহদেওকে বিয়ে করেছে, এই মর্মে পুলিশের কাছে অভিযোগ এসেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে রকিবুলকে দিল্লি থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঝাড়খন্ড পুলিশ।
২০০৯ সালে পূর্বাঞ্চলীয় শ্যুটিং-এ সোনাজয়ী তারা শাহদেও জাতীয় মহিলা কমিশনের কাছে প্রতারণা ও নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন, গত জুলাই মাসে কোহলি ওরফে রকিবুল তাকে হিন্দুমতে বিয়ে করেন। কিন্তু বিয়ের পর জানতে পারেন তার স্বামী এবং তার পরিবার মুসলমান। এরপর রকিবুল ও তার মা কৌসর পারভিন জোর করে তাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করে। নাম রাখা হয় সারা।
রকিবুলের বিরুদ্ধে প্রতারণা, নির্যাতন ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়৷ রকিবুল অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেন৷ তদন্ত চলছে।
অনুরূপ ঘটনার অভিযোগ ওঠে কেরালা ও কর্নাটক থেকেও৷ শুধু হিন্দু মেয়েই নয়, খ্রিস্টান ও শিখ ধর্মের মেয়েদেরকেও বিয়ে করার পর ধর্মান্তরিত করা হয় ইসলাম ধর্মে।
সবকটি ক্ষেত্রেই এর সত্য মিথ্যা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে৷
রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ, বজরং দলের মতো বিজেপির কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এর নাম দিয়েছে ‘লাভ জিহাদ’৷
এই শব্দবন্ধটিতে রাজনৈতিক রং দিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করছে কয়েকটি রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে। ঝাড়খন্ডে ভোট আগামী নভেম্বর মাসে৷ তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’ ঠেকাতে হিন্দু সংগঠনগুলি পাল্টা ব্যবস্থা নেবার কথা বলছে।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস নেতা এম জি বৈদ্য বলেছেন, মুসলিম যুবক যখন হিন্দু মেয়েকে ভালোবাসার টোপ দেখিয়ে বিয়ে করে তাকে ধর্মান্তরিত করে তখন মৌলভীরা খুশি হন। কিন্তু বিপরীতটা হলেই তারা ক্ষেপে যান।
তার অভিযোগ, কট্টর ইসলামিদের উদ্দেশ্য, ভারতে হিন্দু জনসংখ্যা কমিয়ে আনা।
মহিলা সমাজকর্মী এবং নারীবাদীরা মনে করেন, দুই সম্প্রদায়ের মেরুকরণের উদ্দেশ্যে এই ধরণের অপপ্রচার এবং বিদ্বেষকে হাতিয়ার বানানো হয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়কে হেয় করতে।
দিল্লির মহিলা সাংবাদিক সঙ্ঘের এক সভায় যোগদানকারী মহিলা আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষকদের আশঙ্কা যে, রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী হিন্দু সংগঠনগুলি আবার ২০০২ সালের বাতাবরণ তৈরি করতে চাইছে।
প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ-তরুণী পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় জাতপাত ও ধর্মকে তোয়াক্কা না করে প্রেম করে বিয়ে করছে। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে সমাজের প্রতি।
বিজেপির সংখ্যালঘু দপ্তরের মন্ত্রী নাজমা হেপতুল্লা মনে করেন, এটা সামাজিক ইস্যু। অন্য রাজনৈতিক দলগুলি এটাকে সাম্প্রদায়িক ইস্যু বানাতে চাইছে।
বিজেপি কর্মকর্তারা ‘লাভ জিহাদ’ শব্দটি সরকারিভাবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে ভালোবাসার জবাব ভালোবাসা৷ লড়াই বা যুদ্ধ নয়।
ভারতীয় মুসলিম বিদ্বজন মুকররাম আহমেদ বলেন, ‘লাভ জিহাদ’ শব্দটি সমাজকে বিভক্ত করার একটা রাজনৈতিক চালমাত্র। ইসলাম ধর্মের অনুশাসন অন্য ধর্মে মাথা গলানোর কথা বলে না৷ এই নিয়ে অপপ্রচার চলছে।
সূত্র: ডয়চে ভেলে