উঃ কী গরম, বাসটা যদি ছাড়ত তাও হত, ড্রাইভার সাব গাড়িটা ছাড়েন না ভাই, আর কতক্ষণ? পাঁচ মিনিট তো হয়ে গেল।
ড্রাইভার ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখে নিল, মেয়েটা কিছুক্ষণ আগেও বলেছে সীট থেকে দাঁড়িয়ে। এত তাড়া কীসের? সিগারেটের এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে পিছনের দিকটা দেখছে, না স্টেশনে তেমন প্যাসেঞ্জার নেই, অবশ্য এই দুপুর বেলা কমই থাকে।
স্নেহার খুব রাগ উঠে গেল, ও মেয়ে বলেই হয়ত ড্রাইভার ব্যাটা পাত্তা দিচ্ছেনা, এমন ভাব ভাড়া দিয়েছ তো কী হয়েছে, বাসটা আমাদের, ছাড়া না ছাড়ার ইচ্ছাও আমাদের, ভাল না লাগলে নেমে যাও। ইস একটা পুরুষ লোকও যদি বলত, কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই, কারো সময়ের দাম নেই, মানুষগুলো এত সস্তা কেন? আর এই একটা রামছাগল সেই কখন থেকে পাশে বসে মোবাইলে বাটন টিপেই যাচ্ছে, মেসেজ অপশনে যেন উপন্যাস লিখছেন। আহা বাবু বিদ্যাসাগর, স্ট্রিট লাইট ছেড়ে স্ট্রিট বাসে লিখছেন, কোনও দিকে খেয়াল নেই, ব্যাখাতিত উদাসিন, পারিপার্শ্বিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন! যত্বসব! কেন মিয়া তুমি তো ইয়াং ছেলে উঠে গিয়ে কড়া ভাবে কিছু বলতে পারো না? তুমি রাফ টাফ কিছু বললে যতটা না অভদ্র লাগবে তার চেয়ে বেশি মানানসই, দেখনা কেউ বউবাচ্চা নিয়ে, কেউ বুড়ো, রক্তের মধ্যে ঘুম ছাড়া কিছু নেই, কেউ গরীব খাটতে খাটতে নেতিয়ে পরছে শরীর, কারো সাহসের ব্যাকআপ নেই, হাঁদারাম! একটা মেয়ে থেমে থাকা বাসটা ঠেলছে, আর উনি যুবক ছাওয়াল হাতে মেন্দি দিয়ে বসে আছেন!
এইসব ব্যাপারে স্নেহা যতই ভাবছে ততই উগ্রভাবে রাগে ফেটে পরছে, আর অপেক্ষা করছে এই মুহূর্তে তৈরি গভীর ক্রোধ ছেলেটার উপর ঝেরে ফেলতে।
জারিফ যে ব্যাপারটা একে বারে খেয়াল করছে না তা কিন্তু নয়, ও বাসে উঠে অনেক খালি সীট পেয়েছিল কিন্তু সে দিকে খেয়াল না করে মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিলো মেয়েটার পাশেই বসবে। হাতে কারেন্ট এফেয়ারস, একটু পর পরই বাতাস দিচ্ছে। খুব গরম নাহ? আর লাগবেই না কেনো যে বর্ম পরেছো, কী দরকার বাবা এই গরমে শরীরটাকে মুড়িয়ে রাখার? অবলা প্রাণী! মুরগীর বাচ্চা! নিজের মধ্য হেসে উঠলো, এই বয়সী বোরখা পরা মেয়ে দেখলেই মুরগীর বাচ্চা মনে হয়। টুক টুক করে পা ফেলছে, নির্বোধ নিস্পাপ, নরম বিচ্ছিন্ন, খপ করে ধরে ফেললেই ছোট্ট দেহের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব ঠাণ্ডা হয়ে আসে, চোখ বড় বড় করে তাকায়, আদর না আক্রোশ? না বোঝা ক্যাবলা ঘাড়টা একটু একটু করে কাঁপায়! কেন বাবা একটু বেড়িয়ে আসলে কী হয়? যৌবনটা কী বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে? আর তোমার এই বয়সটা না শাসনের না শ্রদ্ধার, টিজ করার। না না শরীর জড়িয়ে অবশ্যই না, এই ধর চুলটা খোঁপা করা থাকলে বলা যেতে পারে “গত সন্ধ্যাটা পাওয়া যাচ্ছেনা, নিউজ পেপারে দেখলাম ওটা নাকি তোমার খোঁপায় নিখোঁজ হয়েছে!”দারুন তো! কাউকে এসএমএস করা যায়। কাকে? অনিন্দিতাকে? ক্ষেপে যাবে, কয়েকদিন ধরে ফোন করলে রিসিভ করে কিন্তু কথা বলে না। ওকে নিরস্ত্র করার ভদ্র কৌশল। অবশ্য ক্ষেপে গেলে ফোন দেবে-থাপরাইয়া দাঁত ফেলে দেব! এসব উল্টাপাল্টা মেসেজের মানে কী? দ্যাখো তোমাকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি এরপর যদি কখনো মেসেজ পাঠাও তাহলে কিন্তু খুব খারাপি আছে!
কী খারাপি আছে?
শুনতে চাও?
হ্যাঁ
তোমাকে তুই করে বলব।
মাই গড!
জারিফ হঠাৎ খেয়াল করলো পাশের মেয়েটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পরতেই-প্লিজ ড্রাইভারকে একটু বলুন না তাড়াতাড়ি ছাড়তে।
লাভ নেই, বাংলাবাস, স্টার্ট নিয়েও ছাড়তে ছাড়তে পাঁচ মিনিট।
বীর্যমরা! বলেই মুখটা ঘুড়িয়ে নিল।
মাই গড বলছে কী মেয়েটা! চরম অপমান!
ঝট করে দাঁড়িয়ে গেল-এই ব্যাটা ড্রাইভার, পটলের বাচ্চা পটল! চড়াইয়া দাঁত ফালাইয়া দেব।
এই তুই আর কতক্ষণ থাকবি এখানে অ্যাঁ? যা প্যাসেঞ্জারের বাড়ীতে গিয়া ডাইকা আন, জিম্মি পাইছ? এই তোর হেল্পার ডাক দে, গাড়ি স্টার্ট দে। সামনে আসলে কিন্তু চেহারা আগের জায়গায় থাকবে না, দে দে।
ড্রাইভার স্টার্ট দেয়, জারিফ বসে পড়লো। খারাপও লাগলো, ভদ্রাভাবেও বলতে পারতো। এই ট্রান্সপোর্ট সেক্টরটা অবশ্য গালিগালাজের ডাস্টবিন। উগ্রতা ঝেরে ফেলা আর ধৈর্যতায় শুষে নেয়ার আদর্শ জায়গা। যারা ধৈর্য ধরে তারা নাকি দেবতা, মানুষ না। এই দেবতা ড্রাইভারদের অসাধারণ ক্ষমতা দেখে ও গর্বিত। স্নেহা জারিফের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো মনে হয়, বোরখা পরা এইসব মেয়েদের হাসি কান্না কোণঠাসা কিছুই বোঝা যায় না।
বাবা একেবারে তাগড়া মরদ! চিপ দিলেই জুস টলটল করে পরে!
এঃ রাম! এসব মেয়েরা বলতে পারে?!
স্নেহা খিলখিল হেসে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। ভাবছে সবচেয়ে কড়া কমেন্টটাই ঝেড়ে দিল, ওদের বান্ধবীদের মধ্য যে সব কমেন্ট কই মাছের মত ঝরঝর করে তার মধ্য ঢোঁড়াসাপ, মাকালফল, ঝাল আইচক্রিম, তেঁতুলের খোসা এই সবও আছে।
জারিফ ঠোঁট কামড়ে ভাবছে টোক্কা দিলে কী বাজবে? দেখাই যাক না।
বাসটা থেমে থাকলেই আমার জন্য ভাল ছিল।
স্নেহার দুষ্ট চোখের মিষ্ট ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল, ছেলেটা ওকে উদ্দেশ্য করেই কি বলল?
কী?
বাসটা থেমে থাকলেই আমার জন্য ভাল ছিল।
কেন?
বস ফোন দিলে ভাববে মার্কেটে আছি।
আপনি কীসে আছেন?
সেলস এন্ড মার্কেটিঙে
ওঃ কাজে ফাঁকি দিচ্ছেন
হ্যাঁ
ভেরি ব্যাড
কী করবো ভালো লাগে
কিন্তু আমার মনে হয় কাজে ফাঁকি দিয়ে কেউ বড় হতে পারেনা
আমার তো বড় হবার দরকার নেই
না মানে পাঁচ ফিট সাত ইঞ্চির কথা বলছি না
যাই বলেন না কেন আমার শুধু মরতে ইচ্ছা হয়
কেন?
জারিফ যুতসই তীরটা ছেড়ে দিল, অন্তত মেয়েটা আধাঘণ্টার একটা টপিকস পাবে। যদি চায়।
শুধু আমার না, বন্ধুদেরও
কী করে বন্ধুরা?
কবিতা লেখে আর কদাচিৎ তৃণভোজী,মাঝে মাঝে লতাপাতা খায়।
আপনিও কী খান?
না।
তাহলে মরতে চান কেন?
ওদের ইচ্ছা হয় তাই আমারও ইচ্ছা হয়।
ওদের শ্রদ্ধা করেন?
হা।
মানুষ বড় হয় মরার জন্য, ছোট হয় বাঁচার জন্য, আপনার বন্ধুরা তো মায়কোভস্কি, ট্রাকল, কোয়েষ্টলার, মৃত্যুর প্রেমে পরছে, বয়স চল্লিশ হলেই অবশ্য ভয় পেতে শুরু করতে পারে কিন্তু আপনি তো লতাপাতা খান না, আপনার তো বাঁচা উচিৎ।
ঐ যে বললেন ছোট হয় বাঁচার জন্য, ভূমিষ্ঠর জন্য ছোট হওয়াটা মানলাম তাই বলে ন্যুড হওয়া, হাত পাতার মতো কাজও করতে হবে!
আমার তো সমস্যা হচ্ছেনা, আমিতো ন্যুড হয়ে আছি, বিশ্বাস হচ্ছেনা? হাত রাখুন আমার উরুতে, স্পর্শেই বুঝতে পারবেন নিচে প্যানটি আর ব্রা ছাড়া কিছু নেই।
এই শকটা জারিফের আজীবন মনে থাকবে, মাই গড!
ভয় পাচ্ছেন নাহ? আমারও মৃত্যুকে ভীষণ ভয়। মৃত্যু নিরুত্তর। শুধু জীবনই জবাব দেয়। তাই ইচ্ছাকৃত জীবনকে বিলিয়ে দেয়ার পক্ষে আমি নই।
জারিফ বললো-হ্যা মানুষ বেঁচে থাকে, কারণ সে স্বপ্ন দেখে, হোক মিথ্যা কিন্তু স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারেনা, আর স্বপ্ন মিথ্যাচারী বলেই সে ভুল পথের কথা বলে, যেখান থেকে মৃত্যুই পারে বাঁচাতে।
দেখুন আপনি যখন মরতে চান তখন নিজের কিছু যুক্তি তো অবশ্যই আছে যা অন্য মানুষের যুক্তির সাথে কোনোভাবেই মোকাবেলা করে না। তবুও একটা মেয়ে হিসেবে বলি কি আপনার বিশ্রাম দরকার, আর জানেনতো পুরুষের কোনও বিশ্রামই মেয়ে ছাড়া পূর্ণতা পায় না।
ওদের মধ্য আর কথা হয় না, বাস চলছে,জীবন চলছে,পৃথিবী ঘুরছে,জারিফ ভাবছে- স্টেশনে পৌঁছলে কী বলা যায়? এ মেয়ের কাছে মৃত্যুর সেলস এন্ড মার্কেটিং হবে না।
বাস থামল, স্নেহা রিক্সা ডেকে উঠে পড়লো। জারিফকে ডাকল, রিক্সায় উঠুন, কোন দিকে যাবেন আপনি?
না যাই, আপনার সাথে যেন আর কখনো দেখা না হয়, দেখা হলেই বাঁচতে ইচ্ছা করবে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল জারিফ।
কী করবো বলুন আমাকেও যে একজন বাঁচার স্বপ্ন দেখায়!
মাটির দিকে তাকিয়ে বলল স্নেহা।
দুজন দুদিকে পথ ধরে, স্টেশনে পরে থাকে অদ্ভুদ নামের বাসটি “তুমিই নোয়াব আলী”। (সংগৃহিত)