রইজউদ্দিন রকি: “হাত মে বিড়ি- মু মে পান- লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান”। চল্লিশের দশকে মুসলিম লীগের লিডাররা আজানুলম্বিত শেরওয়ানী আর জিন্নাহ ক্যাপ মাথায় দিয়ে মাঠে ময়দানে বক্তৃতা করতো। আর বাঙালি মুসলমানদেরকে আহ্বান জানাতো পাকিস্তান কায়েমের লড়াই এ সামিল হতে। সে সময় দুই/এক জন চালাক চতুর লোক সভায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করতো- স্যার সবই তো বুঝলাম কিন্তু পাকিস্তান কায়েম হলে আমাদের কি হবে?
মুসলিম লীগের লিডাররা তাৎক্ষণিক উর্দু জবানীতে উত্তর দিত- “হোগা হোগা সব হোগা- মিলেগা রুটি-কাপড়া আওর মাকান।” অর্থাৎ ভাত-কাপড়-বাসস্থান হবে। তৎকালীন লিডারদের কথা বার্তায় সে সময় অল্প শিক্ষিত অতি সহজ সরল মানুষগুলো আস্থা ও বিশ্বাস রেখে মুসলিম লীগের সাথে কাতারবন্দি হয়ে পাকিস্তান কায়েম করার লড়াই এ সামিল হয়। যদিও শেষে তেমন একটা লড়াই আর করতে হয়নি। গোল টেবিল বৈঠকেই পাকিস্তান হাসিল করা সম্ভব হয়েছিল।
তার পর দীর্ঘ ২৫ বছর এদেশটাকে শাসন ও শোষণ করার যত রকম কায়দা-কানুন আছে তার সবটাই প্রয়োগ করে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। জনগণের কাছে দেয়া ওয়াদা ভাত কাপড় আর বাসস্থানের স্বপ্ন পূরণ তো দূরের কথা জনগণের কথা বলার অধিকারটুকু বরদাস্ত করতে রাজী ছিলনা পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। সমস্ত রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে শুধু বন্দুকের নল দেখিয়ে দেশটাকে শাসন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। তাই ওই সময়টিতে শুধুমাত্র “গণতন্ত্র চাই” “গণতন্ত্র চাই শ্লোগানে পাকিস্তানী আমল শেষ হয়ে গেল কিন্তু গণতন্ত্র আর ওই আমলে দেশবাসীর কপালে জুটলো না। ঊনসত্তর এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যদিও বা একবার গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি হলো- কিন্তু তাও ছিল বিদ্যুৎ ঝলকানীর মত। নিমিষেই শেষ হলো সেই সম্ভাবনা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতের বুলেটের গন্ধে ও ব্যনটের খোঁচায় সেটিও ধুলিসাৎ হয়ে গেল। বুলেট আর ব্যনটের নির্মম আঘাতে ঝরে গেল হাজার হাজার বাঙালির প্রাণ। শুরু হলো প্রতিরোধের ও মুক্তি যুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ে চিরতরে হারিয়ে গেল ৩০ লক্ষ প্রাণ আর সম্ভ্রম হারালো দুই লক্ষ মা-বোন। রাস্তা ঘাট, কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে হাজার হাজার জনপদের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে অর্জিত হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী যা পূরণ করতে পারে নাই বাংলাদেশ তা পূরণ করবে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা- মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো এবারে পূরণ হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সর্বস্তরে জনমতের প্রতিফলন ঘটবে। প্রশাসনের সর্বস্তরে জনগণের কর্তৃত্ব বহাল হবে। গণতন্ত্র তার পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ পাবে। এ আলোকে সংবিধান ও রচিত হয়েছিল যা বাহাত্তর এর সংবিধান নামে খ্যাত। সেখানে স্থান পেয়েছিল সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ ও জাতীয়তাবাদ এর মত মৌলিক ও প্রগতিশীল এজেন্ডা। কিন্তু সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে ধরে এগুনোর উদ্যোগ কোথায়। স্বাধীনতার প্রায় ৪৪ বছরেও শাসক গোষ্ঠীর নানা সীমাবদ্ধতা, গোষ্ঠী স্বার্থ, অদক্ষতা, অযোগ্যতা আর সীমাহীন দুর্নীতির কারণে দেশ সে পথে এগুতে পারে নাই। উল্টো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার সংগ্রামের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নৃসংশ ভাবে হত্যা করার মধ্য দিয়ে- এ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি আর সামাজিক জীবনে যে উল্টো ধারার আমদানি করা হলো- দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজও সেই ধারা বহাল তবিয়তে চর্চা হচ্ছে। এ দেখে যেন স্বধীনতা নিরবে কাঁদে।
বর্তমানে আমাদের দেশে তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে এখানে পুঁজিবাদী অর্থনীতির চর্চা হচ্ছে। সেই পুঁজিবাদী অর্থনীতিও আবার কোনো উৎপাদন মুখি কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। উৎপাদন মুখি কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে হয়তো দেশে একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জাতীয় অর্থনীতি গড়ে উঠার সুযোগ পেত। এখানে মুক্ত বাজার অর্থনীতির নামে যা চলছে তা হলো লুটপাট। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজন প্রীতি, গোষ্ঠী প্রীতি, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, নদীদখল, ভূমিদখল, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ঘুম, হত্যা- হেন অনৈতিক কাজ নেই- যা এখানে বাদ যাচ্ছে।
আর এসবের মাধ্যমে এক শ্রেণির মানুষ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। এমন সস্তা পথে ধনীক হওয়ার সুযোগ যখন একটা সমাজে অ-ঘোষিত নীতি কিংবা রীতি হয়ে যায় তখন কষ্ট করে সৎভাবে জীবন যাপন করে, সৎভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করে, সৎ পথে বিনিয়োগ করে দেশের উৎপাদন মুখি কর্মকান্ডকে অগ্রসর করে নেয়া এবং সততা আর নৈতিকতার ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির সাজার দরকার কি?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে দেশ পরিচালনায় বিগত চার দশকে বুর্জোয়া ধারার রাজনৈতিক দলগুলির কোনো সক্রিয় উদ্যোগ না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার উদ্যোগের কোনো কমতি ছিলোনা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ মূলত ক্ষমতার। ক্ষমতাশীন দলের লক্ষ্য ক্ষমতাকে কিভাবে দীর্ঘায়িত করা যায়। আর যারা ক্ষমতার বাইরে তাদের লক্ষ্য কিভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায়। কি অর্থনীতি, কি রাজনীতি; কি সমাজ নীতি কোনো ক্ষেত্রে তাদের কোনো দ্বন্দ নেই। যার জন্য একদল যখন ক্ষমতা হারায় তখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তার রেখে যাওয়া যে নীতি তা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে হুবহু অনুসরণ করে নতুন যারা ক্ষমতা গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে তাদের কোনো অসুবিধা হয় না।
স্বাধীনতার পর বৃহৎ বৃহৎ শিল্প কারখানা, ব্যাংক বীমাসহ বিশেষ করে পাকিস্তানের সহযোগিতাকারী যারা এদেশে তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলিকে ফেলে গিয়েছিল- সমাজতান্ত্রিক নীতিমালাকে লক্ষ্য করেই সেই সব প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য- যখন যে সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তখন সেই সরকারের লোকেরাই এইসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে জাতীয় ভাগ্য পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার না করে নিজের নিজের আখের গুছানোর কাজে ব্যবহার করে- সমস্ত রাষ্ট্রীয় খাতকে সমূহ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। অর্থনীতিতে সে ধারা এখনও অব্যাহত আছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মানেই দলীয় নেতাকর্মীদের এক একটি লুটপাটের আখড়া। আর এই লুটপাটের কাজটি চলছে পালাক্রমে এবং শান্তিপূর্ণ সমঝোতার মাধ্যমে।
শাসক শ্রেণির রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা আর সীমাহীন এবং ক্ষমতাহীন চতুরতার অপকৌশল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রক্ষা করতে তাই সকল গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক ও সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে এমন শক্তি, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি। একাজ যতই তাড়াতাড়ি হয়- দেশ ও জনগণের জন্য ততই মঙ্গল।