সিসি ডেস্ক: ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিজের ঘরের লোকজনের প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডে বিতর্কের মুখে পড়েছে। এতে দলের ভাবমূর্তি সংকটের মুখে পড়ছে।
বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচন বয়কট করায় দশম জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশভাবে সরকার গঠন করা দলটির নেতা, তাদের আত্মীয়-স্বজন ও সরকারের মন্ত্রীদের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এ সংকটের জন্ম দিচ্ছে। পাশাপাশি সরকারবিরোধীদের সামনে আন্দোলনের ইস্যু উপহার দিচ্ছে। এবার সরকার গঠনের পর বিভিন্ন ঘটনায় এ রকম পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, দলীয় লোকজনের বিতর্কিত ইস্যু বা কর্মকাণ্ডের রেশ চাপা পড়তে-না-পড়তেই ধারাবাহিকভাবে সরকারবিরোধীদের সামনে আরেকটি
ইস্যু সৃষ্টি করছে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, নেতা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনরা
সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় ক্ষমতাসীনরা বিতর্কিত হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক মন্ত্রীপুত্র এবং জামাতার যোগসূত্র নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হয়। এমনকি সেই ঘটনার জেরে বিভিন্ন মহল থেকে মন্ত্রীর অপসারণ ও পদত্যাগেরও দাবি করা হয়। পরে সেই ঘটনায় মন্ত্রীর জামাতা র্যাব-১১-এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদের যোগসূত্র খুঁজে পায় তদন্ত কমিটি। ওই ঘটনার জেরে মন্ত্রীর জামাতা এখনো কারাগারে রয়েছেন। এমনকি নিহত নজরুল ইসলাম এবং এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূর হোসেন- দুজনই ক্ষমতাসীন দলের নেতা।
এদিকে গত ১২ জুলাই জাতীয় সংসদের লবিতে চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপির মধ্যে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। সংসদ অধিবেশন চলাকালেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সংসদ সদস্য সেদিন জানান, তারা কয়েকজন লবিতে বসে ফিরোজের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এর মধ্যেই বাহাউদ্দিন নাছিম এসে আকস্মিকভাবে সরাসরি আক্রমণ করেন ফিরোজকে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি চিফ হুইপের গায়ে হাত তোলেন।
এদিকে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে এক সেমিনারে এফবিসিসিআইর সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী আকরাম উদ্দীন আহমদকে ধমকান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সে সময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। আর এ সময় মঞ্চে খাদ্যমন্ত্রী ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লজ্জায় মাথা নত করে বসে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ অন্যরা হয়ে পড়েন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তবে অর্থমন্ত্রী এসব থোড়াই কেয়ার করেন। কারো দিকে না তাকিয়ে তিনি শাসাতে থাকেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতিকে। মন্ত্রীর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে ব্যবসায়ী, আমলা ও সাংবাদিকরা হতবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
গত মে মাসে গুলি করে, পুড়িয়ে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীকে দায়ী করে নিহতের কর্মী-সমর্থকেরা। তবে ঘটনার জন্য বিএনপির এক নেতাসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে ফেনী থানায় মামলা করেছেন নিহতের ভাই রেজাউল হক ওরফে জসিম। এ ঘটনায় ফেনীর প্রাক্তন সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারীকে কেন্দ্র করেও অনেক বিতর্ক হয় ৷
গত ৯ আগস্ট সাংবাদিকদের চরিত্রহীন ও খবিশ বলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাংবাদিকদের প্রতি এ কটূক্তি করেন মন্ত্রী। আর সে ঘটনায় সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন মন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমাও চান সৈয়দ মহসীন আলী। এমনকি দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মন্ত্রীকে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে গত রোববার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এক সভায় হাছান মাহমুদকে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ বেয়াদব বলে অভিহিত করে তার কঠোর সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। তিনি আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং প্রাক্তন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘ওর মতো বেয়াদব আমি আর দেখি নাই। সে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ বেয়াদব।’ এ-ও বলেন, ‘উনি কে? কী ছিলেন? মুক্তিযুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন? আমি জানি। কীভাবে উনি নেতা হয়েছেন, তাও জানি। এই ধরনের আস্ফালন আমি আমার রাজনৈতিক জীবনে দেখিনি। এখন নতুন নতুন নেতা জন্মে বেয়াদবি শুরু করেছে।’
গত রোববার নিউ ইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিতর্কিত মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফররত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। নিউইয়র্কে তাকে সংবর্ধনা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘টাঙ্গাইল জেলা সমিতি’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তার সেই বক্তব্যের ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দল, সংগঠন এবং সাবেক প্রধান বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি ওঠে। সে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
কারণ, এ জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্যে ঘরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীনরা। নিজ দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের সিটি সেন্টারের সামনে দ্বিতীয় ফুটওভার ব্রিজের উদ্ধোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ক্ষোভের কথা জানান ওবায়দুল কাদের। অন্যদিকে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে লতিফ সিদ্দিকীকে ‘মুখফোঁড়’ আখ্যায়িত করেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।
সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘দলের নিয়ম মেনেই মন্তব্য করা উচিত। দায়িত্বশীল পদে থেকে সবারই দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। অশোভন ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা এ ধরনের মন্তব্য কিংবা আচরণ সমীচীন নয়।’
এমনকি আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগও মন্ত্রীর অব্যাহতির সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে যুবলীগের দপ্তরসম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
অন্যদিকে, বিরূপ মন্তব্য করায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর পদত্যাগ দাবি করেছে বিএনপি। মঙ্গলবার দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে এ দাবি করেন। মন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদে দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে হেফাজতে ইসলাম। মঙ্গলবার রাজধানীর বারিধারার একটি মাদ্রাসায় সংবাদসম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির নূর হোসেন কাসেমী এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাদ আসর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এবং শুক্রবার সারা দেশে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।
এমনকি লতিফ সিদ্দিকীকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এইচ এম এরশাদ। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এরশাদ এ দাবি জানান। তিনি বলেন, `যেখানে দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং সংবিধান অনুসারে কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা যাবে না— সেখানে লতিফ সিদ্দিকী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তাই সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে তাকে অভিযুক্ত করতে হবে। এর জন্য শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না। দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’