রংপুর: স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম এবং জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া মসিউর রহমান রাঙ্গা এরশাদ ঘোষিত কমিটির কাছে রংপুর জাতীয় পার্টি অফিস হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্যাডে প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত এক জরুরি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গা।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রংপুর জেলার জাতীয় পার্টির জেলা কমিটি, মহানগর কমিটি, প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির কার্যালয় বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মোঃ মসিউর রহমান রাঙ্গাকে জড়িয়ে যে সকল খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, জাতীয় পার্টির মাননীয় চেয়ারম্যান সাবেক মহামান্য রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুর জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টি সংক্রান্ত বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর কোনো দ্বিমত নেই।
সুতরাং রাঙ্গার নাম ব্যবহার করে জাতীয় পার্টির রংপুর জেলার বিভিন্ন ইউনিটের কর্মীরা যারা জাতীয় পার্টির অফিস দখল করে রেখেছেন তাদেরকে অনতিবিলম্বে জাতীয় পার্টির কার্যালয় নবনির্বাচিত কমিটির নিকট হস্তান্তরের জন্য তিনি তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুরোধ জানিয়েছেন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, রংপুর জেলা জাতীয় পার্টি এরশাদের ঘাটি। রাঙ্গা রংপুরে কোনোরূপ দলীয় কোন্দল বা হানাহানি পরিহার করে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে সম্মিলিতভাবে জাতীয় পার্টির কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিটির বিষয়ে মোবাইল ফোনে নিশ্চিত করেছেন প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।
গত মঙ্গলবার রাত ১১টায় এরশাদ ঘোষিত মহানগর কমিটির সদস্য সচিব এসএম ইয়াসিরের ওপর হামলার জের ধরে এরশাদ ঘোষিত জেলা ও মহানগর কমিটির নেতাকর্মীরা রংপুর মহানগরীর সেন্ট্রাল রোডস্থ জাতীয় পার্টি অফিস দখলে নিয়ে সেখানে রাঙ্গার ছবি সংবলিত সকল পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার ভাঙচুর করে। বুধবার বিকেলে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত সেখানে এরশাদ ঘোষিত জেলা কমিটির আহ্বায়ক সাবেক এমপি মোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, সদস্য সচিব সাবেক এমপি এইচএম শাহরিয়ার আসিফ, জেলা কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ও সদস্য সচিব এসএম ইয়াসিরের নেতৃত্বে এরশাদপন্থী নেতাকর্মীরা অবস্থান করে।
সন্ধ্যায় তারা চলে যাওয়ার পর বুধবার বেলা সাড়ে চারটায় আবারও রাঙ্গা সমর্থিত নেতাকর্মীরা পার্টি অফিসে অবস্থান নিয়ে দখল নেয়। এ নিয়ে নগরীতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা পার্টি অফিসের অবস্থান নিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের এই নির্দেশ দিলেন। এর মাধ্যমে এক মাস ২০ দিন পর জাতীয় পার্টির অফিসটি রাঙ্গা সমর্থিতদের দখল থেকে মুক্ত হলো মনে করছে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গাকে রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি এবং প্রেসিডিয়াম পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার পর থেকেই দলীয় কার্যালয়টি রাঙ্গা সমর্থকরা দখলে নিয়ে রাঙ্গার পদ পদবি ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। আর এরশাদ ঘোষিত কমিটির নেতাকর্মীরা স্কাইভিউ লাঙ্গল ভবনে থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন।
এ প্রসঙ্গে মহানগর জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা জানান, প্রতিমন্ত্রী তার প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নিজেই দখলের কথাটি উল্লেখ করেছেন। পেইড ও অ্যাপোয়েন্টেড কর্মী এবং ক্রসফায়ারের তালিকায় থাকা সন্ত্রাসীদের দিয়ে পার্টি অফিস দখল করে জনগনের ভালোবাসা পাওয়া যায় না, এটা বুঝতে পারার জন্য তিনি রাঙ্গাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “জাতীয় পার্টি অফিস এরশাদের। এরশাদের নেতাকর্মীদের। তারাই ছিলেন। তারাই থাকবেন।
রাঙ্গা সমর্থিত নেতারা স্বেচ্ছায় অব্যাহতি
রংপুরে এরশাদ ঘোষিত জেলা ও মহানগর কমিটির পদ থেকে রাঙ্গা সমর্থিত নেতারা স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঘোষণা দেয়া হয়।
সাংবাদিক সম্মেলনে এরশাদ এখন চাটুকার, সুবিধাবাদী ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে দাবি করা হয়।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রংপুর জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিলুপ্ত জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এরশাদ ঘোষিত কমিটি জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টু।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় রংপুর জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টিকে নেতৃত্বহীন, অসহায় ও অন্ত:সারশূন্য রেখে এরশাদের নির্দেশকে অমান্য করে তৃনমূল জাতীয় পার্টি গঠন করে। তাদের ঘৃণ্য কালো থাবা ও ষড়যন্ত্রের কারণে উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভরাডুবি হয়। এখন এরশাদের নির্দেশ অমান্যকারী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এসএম ইয়াসিরসহ অন্যান্যরা এরশাদকে ভুল বুঝিয়ে নেতৃত্ব নিয়েছেন। বিষয়টি নেতাকর্মীদের বোধগম্য নয়।
লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়, এরশাদ এখন চাটুকার, সুবিধাবাদী ও ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। যারা সব সময় নিজের স্বার্থে দলের ক্ষতি করার জন্য ব্যতিব্যস্ত এবং তাদের কারনে এরশাদ সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছেন না। তবে এরশাদের পরিবারের কেউ নেতৃত্বে আসলে পার্টির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অনেক বেশি উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হতেন।
একারণে সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, এসব কারণে আমরা আমাদের স্ব-স্ব পদের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবো। নেতৃত্ব পরিবর্তন না আসলেও অন্য কোনো দলে যোগদান করবো না। জাতীয় পার্টি করবো।
সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, গত ১৮ অক্টোবর সাংবাদিক সম্মেলন করে এরশাদ স্যারকে আমাদের অব্যাহতি দিতে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় আমরা স্ব-স্ব পদ থেকে অব্যাহতি নিলাম।
প্রসঙ্গত গত ১০ ই সেপ্টেম্বর এরশাদ ঘোষিত জেলা কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টু এবং মহানগর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন কাদেরির নাম ঘোষণা করা হয়েছিল।
সাংবাদিক সম্মেলনে অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন কাদেরি, বিলুপ্ত জেলা কমিটির সহ-সভাপতি আবদুল লতিব খান, যুগ্ম সম্পাদক সামসুল আলম, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সভাপতি শামীম সিদ্দিকি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।