• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

উন্নত গুড়-পাটালী তৈরীর পরিকল্পনা গাছিদের

image_103883_0ঝিনাইদহ: কার্ত্তিক মাস শুরুর সঙ্গে সঙ্গে খেজুর গাছ তুলে গুড় তৈরীর প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঝিনাইদহের গাছিরা। বিশেষ করে জেলার পশ্চিমাঞ্চলের পোতাহাটি, আসাননগর, বোড়াই ও রাঙ্গিয়ারপোতাসহ বিভিন্ন গ্রামে খেজুর গাছ তোলার দৃশ্য চোখে পড়ে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার আসাননগর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম জানান, ‘‘তিনি প্রায় পঞ্চাশটি গাছ তুলেছেন। এক সপ্তাহ পর থেকে তিনি গাছে নলি মেরে রস উৎপাদন শুরু করবেন।’’

তিনি আরো জানান, ‘‘গত বছর তিনি খেজুরের গুড় ও পাটালি বিক্রি করে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন। এবারো তিনি আশা করছেন আরো বেশি দামে গুড় ও পাটালি বিক্রি করতে পারবেন।’’

সদরের বংকিরা গ্রামের আব্দুল মিয়া জানান, ‘‘খেজুর গাছ তোলার পাশাপাশি ভাড় ও লাকড়ি (জ্বালানী) সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।’’

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. মনিরুজ্জামান জানান, ‘‘সদরের ১৭টি ইউনিয়নে পঞ্চাশ হাজারেও বেশি খেজুর গাছ আছে। এ সব গাছ থেকে মৌসুমে পাঁচ লাখ কেজি গুড় উৎপন্ন হয়।’’

জেলা কৃষি বিভাগের একটি সুত্র জানায়, জেলায় আনুমানিক তিন লাখ খেজুর গাছ থেকে গাছিরা রস সংগ্রহ করে ২৫ থেকে ৩০ লাখ কেজি গুড় উৎপাদন করে থাকেন।।

কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে,দেশে বছরে এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ ২৫ হাজার টন খেজুর গুড়-পাটালী উৎপাদন হয়।  কিন্তু অনেক পুরানো এ পণ্যের মান উন্নয়নে সরকারি বা বেসরকারি কোন উদ্যোগ নেই। গাছিরা সেই পুরাতন পদ্ধতিতে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও রস জ্বালিয়ে গুড়- ও পাটালি তৈরি করে আসছেন। খেজুরের গুড়-পাটালী একটি রফতানি পণ্য  হিসেবে প্রবাসিদের কাছে ব্যাপক চাহিদা আছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, সোয়া ২০০ বছর আগে চিনি শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল যশোর। আর এ চিনি উৎপাদিত হতো খেজুর গুড় থেকে। এ চিনি শিল্পের কেন্দ্র ছিল ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর,সদরের ডাকবাংলা বাজার এলাকা।  তখনও আখ থেকে সাদা চিনির উৎ্পাদন শুরু হয়নি। তাই এ চিনির চাহিদা ছিল ইউরোপে।

কলকাতা বন্দর দিয়ে খেজুর গুড়ের চিনির চালান যেত। ঝিনাইদহ অঞ্চলের চিনি নবগঙ্গা ও কপোতাক্ষ,মাথাভাঙ্গা নদী হয়ে কোলকাতা যেত বলে এলাকার মুরুব্বীরা জানান।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, দেশীয় ময়রারা এ চিনি তৈরির পথিকৃত ছিল। নদীয়ার দৌলতগঞ্জের রাম সেন, বর্ধমানের সাতগাছিয়ার দশরথ ও ভগবান দেও যশোর থেকে খেজুরে গুড় নিয়ে যেয়ে চিনি তৈরি করতেন। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলার ক্ষমতা দখলের পর দলে দলে বিলেত থেকে সাহেবরা এদেশে আসতে থাকেন।

মিস্টার বাকলে নামে এক সাহেব চিনি তৈরির ব্যবসায়ে নামেন। তিনি বর্ধমান জেলার (বর্তমানে ভারত) ধোবাতে একটি বড় ধরনের চিনি কারখানা স্থাপন করেন। যশোর থেকে খেজুরে গুড় নিয়ে চিনি তৈরি শুরু করেন। খরচ বেশি পড়ায় তিনি ধোবাও সুগার কোম্পানি গঠন করে কোটচাঁদপুর ও ত্রিমোহনীতে দুটি বড় চিনি ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন।

১৮৮২ সাল পর্যন্ত মিস্টার বাকলে সাহেবের কারখানা দুটো ভাল চলে। এরপর লোকসানের পালা শুরু হয়। নিউ হাউজ নামে এক ইংরেজ কোটচাঁদপুর ফ্যাক্টরি কিনে নেন। পরে সেইনটস ব্যারি নামে আরেক ব্যক্তি ত্রিমোহনী ফ্যাক্টরি কিনে নেন।

যশোর ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে বর্ণিত তথ্যে জানা যায়, ১৮৪২ সালে কলকাতায় বসবাসরত সাহেবগণ গ্লাডস্টোন এন্ড কোম্পানি গঠন করে চিনি ব্যবসায়ে নামেন। তারা চৌগাছাতে একটি বড় চিনি ফ্যাক্টারি স্থাপন করেন। এ ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ছিলেন মিস্টার স্মিথ নামে এক বিলেতি সাহেব। পরে ম্যাকলিউড নামে আরেক সাহেব ম্যানেজার হন। ম্যাকলিউড পরিবারের অনেক স্মৃতি এখনও কোটচাঁদপুরে আছে।

কোটচাঁদপুর হাইস্কুলটি ম্যাকলিউড পরিবারের বসত বাড়িতে গড়ে উঠেছে। তাদের কবরও রয়েছে সেখানে। ১৮৫০ সালের পরও কোটচাঁদপুর ও চৌগাছার চিনি ফ্যাক্টরি দুটো চালু ছিল। ১৮৫৩ সালে মিস্টার নিউ হাউজ তাহেরপুরে একটি বড় আকারের ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। ৩-৪ বছর চলার পর লোকসান শুরু হয়। পরে চিনি তৈরি বন্ধ করে এ কারখানাতে ‘রাম’ মদ তৈরি হত।

১৮৭৪ সালে কোটচাঁদপুরের ৬৩টি ফ্যাক্টরিতে খেজুর গুড় থেকে এক লাখ ৫৬ হাজার ৪শ’ ৭৫ মণ চিনি উৎপাদন হতো। এ চিনি তৈরিতে এক ধরনের শেওলা ব্যবহার করা হত। কপোতাক্ষ নদে প্রচুর পাটা শেওলা মিলত। গুড়ের ভাড় ভেঙ্গে অন্ধকার ফ্যাক্টরির ভিতর ঝুড়িতে রাখা হত। ঝুড়ির উপর শেওলা বিছিয়ে দেওয়া হত। রস ঝরে পড়ে চিনি হত। রোদে শুকিয়ে বস্তা ভর্তি করে চালান পাঠানো হত বিভিন্ন স্থানে। প্রথম বারে উৎপাদিত চিনির মান ভাল হত। বলা হত নালুয়া চিনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিনির ব্যবসা শুরু করেছিল।

১৭৭৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতা বন্দর দিয়ে এক হাজার ৯০০ টন চিনি রপ্তানি করে। এ থেকে শতকরা ৫০ ভাগ মুনাফা হয়েছিল। ১৮০০ সালে কোম্পানি ৫৭ হাজার টন ও ১৮০৫ সালে দু’ লাখ ১৬ হাজার টন চিনি রপ্তানি করে। যার সিংহভাগ ছিল যশোর অঞ্চলে উৎপাদিত।

১৯০১ সালে যশোর অঞ্চলে চিনি ফ্যাক্টরির সংখ্যা কমে একশ’ ১৭টিতে নেমে আসে। ১৯২৪ সালে আরো কমে ৫০টিতে নেমে এসেছিল। ১৯৫০ সালেও কয়েকটি কালে সাক্ষী হিসাবে টিকে ছিল। পরে এগুলো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হজরত আলী জানান, ‘‘এখন স্বাস্থ্য সম্মতভাবে খেজুরে রস সংগ্রহ ও গুড় পাটালী তৈরি হয় না।’’

তিনি জানান, ‘‘রস সংগ্রহ করে মিলে উন্নত পদ্ধতিতে গুড় তৈরি করা যেতে পারে। আর এ ভাবে গুড়-পাটালী তৈরী করা হলে আবারো রফতানি পণ্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ