• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৭ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

থমথমে রংপুর, ৫৬ রুটে ধর্মঘট

image_105997_0রংপুর: রংপুরে শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিক সমিতির মধ্যে ধারাবাহিক আধিপত্য বিস্তারের জেরে সোমবার গভীর রাতে নগরীর সাতমাথা এলাকায় দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করেছে মহানগরীর ৩০ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের টোল আদায়কারী ইমরান আহমেদকে (৩৫)। এ ঘটনায় শ্রমিক ইউনিয়নকে দায়ী করে ইমরান ও মালিক সমিতির সমর্থকরা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এমএ মজিদ, প্যানেল মেয়র ফরিদা কালাম এবং সাতমাথায় পিকআপ মালিক সমিতি, ইউনিয়নের শাখা অফিস এবং চারটি বাস, অটো মোটরসাইকেল ভাংচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয়।  এ ঘটনার দৃশ্য ধারণ করতে গেলে নিহত ইমরান সমর্থকরা চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। লাঞ্ছিত করা হয় তিন সাংবাদিককে।
এদিকে এ ঘটনায় মালিক সমিতির সন্ত্রাসীদের দায়ী করে মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে রংপুর বিভাগের ৫৬টি রুটে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে শ্রমিক ইউনিয়ন। কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল কাদের জিলানী জানান, সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে শহর থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে সাতমাথায় ভাই ভাই হোটেলের সামনে দুর্বৃত্তরা বেধড়ক কোপায় ইমরানকে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় ইমরান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ইমরান সাতমাথা বীরভদ্র এলাকার দুলাল মিয়ার পুত্র বলেও জানান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুবলীগ নেতা ইমরানের মুত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ইমারন ও মালিক সমিতি সমর্থকরা অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে সাতমাথায় জেলা পিকআপ মালিক সমিতির অফিস, মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাতমাথা অফিস, তিনটি বাস, একটি অটো এবং দুটি মোটর সাইকেল ভাঙচুর করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় দায়িত্ব পালনের সময় চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরাম্যান এহসানুল হক সুমনের কাছ থেকে ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে তা ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
চ্যানেল নাইনের ক্যামেরাম্যান ফুলন চক্রবর্তীর ক্যামেরা ছিনিয়ে নিলেও রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি মেহেদী হাসান শিশির ক্যামেরাটি উদ্ধার করে দেন।
এ সময় ইমরান সমর্থকরা রংপুরের উদ্দেশ্যে আসা এক পথচারীকে সাংবাদিক সন্দেহে  ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করে। এ ঘটনার  পর ইমরান ও মালিক সমিতির সমর্থকরা মিছিল নিয়ে সাড়ে ৮টায় নগরীর তাজহাট মোড় এলাকায় জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও মহাগর আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক এমএ মজিদ এবং তার ভাবী প্যানেল মেয়র ফরিদা কালামের বাসায় হামলা চালায়।
এসময় তারা বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর এবং মহিলা শিশুসহ বাসিন্দাদের মারপিট করে। প্রাণভয়ে বাড়ির মহিলারা দৌড়ে অন্যত্র গিয়ে রক্ষা পায়। হামলাকারীরা এমএ মজিদের ব্যবহৃত মোটর সাইকেল ও মসজিদের সামনে থাকা একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এলাকাবাসী ও মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। তারা একত্রিত হয়ে হামলাকারীদের ধাওয়া দিলে তারা সাতমাথায় গিয়ে সশস্ত্র অবস্থান নেয়।
এ ঘটনার পর সকাল ১০টায় শ্রমিক ইউনিয়ন সম্পাদক এমএ মজিদ তার নিজ বাসভবনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘‘ইমরান হত্যাকণ্ডের জন্য মোটর মালিক সমিতির সন্ত্রাসীরাই দায়ী। তারা নিজেরা আভ্যন্তরীণ জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সেটির দায় অন্যের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা করছে। তারা আমার বাড়িঘড় অফিসে হামলা চালিয়েছে। আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। শ্রমিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে।’’
এসবের প্রতিবাদে তিনি প্রেস ব্রিফিংয়ে রংপুর বিভাগের ৫৬টি রুটে একযোগে পরিবহন ধর্মঘট ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘‘এই সন্ত্রাসীরাই ৭ সেপ্টেম্বর আমাকে মেরে ফেলার জন্য গুলি চালিয়েছিল। তারা আমাকে প্রকাশ্যে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমি বারবার প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে জানালেও আমার ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘‘আপনারা জানেন ওনি আমাকে বারবার মারার জন্য হুমকি দিচ্ছেন। আজকে তারা আমার বৃদ্ধ পিতা ও মাতাকে মারপিট করেছে। আমার দুটি মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।’’
এদিকে ধর্মঘটের খবর ছড়িয়ে পড়ায় মালিক সমিতির লোকজন রংপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরে বেলা পৌনে ১২ টায় জেলা মোটর মালিক সমিতির বুকিং ক্লার্ক শাহিনুর রহমান শাহীনের নেতৃত্বে ইমরানের হত্যকারীদের গ্রেফতার এবং  বাস ভাংচুরের প্রতিবাদে বাস টার্মিনালে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। অবশ্য পরে ইউনিয়নের তালা খুলে নেয় মালিক সমিতির লোকজন।
মোটর মালিক সমিতির বুকিং ক্লার্ক শাহীনুর রহমান শাহীন  জানান, ইমরান হত্যাকণ্ডের জন্য মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের মজিদ দায়ী। তার নামে আরো একটি হত্যা মামলা আছে। তাকে গ্রেফতার করতে হবে। তাকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত আমরা মাঠ ছেড়ে চলে যাবো না। তিনি বলেন, আমরা যেকোনো মূল্যে বাস চালাবো।
দুপুর সাড়ে ১২টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত ইমরান ও মোটর মালিক সমিতির সমর্থকরা সাতমাথায় সশস্ত্র অবস্থান করছে। পুলিশ ওই সময় পর্যন্ত সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। পুলিশ দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে তাজহাট মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে এবং পশ্চিমে তিনমাথার মোড়ে বিপুল পরিমাণ পুলিশ অবস্থান করছে। সাতমাথায় সব ধরনের দোকানপাট ও যানবাহন চলাচল বন্ধ আছে।
আকস্মিক ধর্মঘটের কারণে রংপুর বিভাগের আট জেলার ৫৬টি রুটে কোনো পরিবহন চলছে না। ফলে যাতায়াত এবং পণ্য আনা-নেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নুল আবেদীন জানান, পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে।
এদিকে মেডিকেলে উপস্থিত কোতয়ালী থানার তদন্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ইমরানের লাশ এখনো মর্গে আছে। ময়না তদন্তের প্রস্তুতি চলছে। কখন লাশ হস্তান্তর করা হবে সেটি পরে জানানো হবে।
ইমরানের পিতা দুলাল মিয়া ছেলের এমন মৃত্যুর খবর শুনে হার্ট অ্যাটাক করেছেন। তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তার অবস্থা এখনো আশংকামুক্ত নন বলে জানিয়েছেন কর্মরত চিকিৎসকরা।
ইমরানের চাচাতো ভাই জানান, ইমরানের জানাজায় মেয়র সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু অংশ নেবেন। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তাজহাট এলাকাবাসী খুরশিদ আলম বাবু জানান, এর আগেও আযম গ্রুপ সাবেক সেক্রেটারি মরহুম আবুল কালাম আজাদের সময়ে বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। সেই সময় পুলিশ আজম গ্রুপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ফাকাগুলি টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছিল।

আর আজ মঙ্গলবার ওই আযম গ্রুপের সন্ত্রাসীরা বর্তমান সেক্রেটারি এমএ মজিদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুটপাট মহিলাদের লাঞ্ছিত করলো। কিন্তু পুলিশকে বারবার খবর দেয়া সত্ত্বেও তারা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তাজহাট মোড়ে এলো। আমরা এলাকাবাসী যখন এর প্রতিবাদ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি তখন পুলিশ আমাদের সাতমাথার দিকে যেতে দিচ্ছে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ