সিসি ডেস্ক: অচিরেই সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয় উল্লিখিত আইন সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। চলতি মাসেই এটি মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে তোলা হবে। সেখানে অনুমোদনের পর আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে বিলটি সংসদে পাস হবে। অবশ্য এর আগে হাইকোর্টের রায়ে বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হয় জামায়াতের।
জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমসহ দলটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে সংগঠন হিসেবেও জামায়াতকে দোষী সাব্যস্ত করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে দলটিকে নিষিদ্ধের ও এর সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি রায়ে জামায়াতকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। সূত্র জানায়, ট্রাইব্যুনালের সুপারিশের পাশাপাশি গণজাগরণ মঞ্চ ও দেশের বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের প থেকেও দাবি উঠেছে দ্রুত জামায়াত নিষিদ্ধের। তাই সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
খসড়ায় ৪ ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, কোনো সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটি অথবা কেন্দ্রীয়, আঞ্চলিক বা স্থানীয় কমিটির সদস্য যদি অপরাধ করেন, তবে ওই অপরাধের জন্য সদস্যের পাশাপাশি সংগঠনও দায়ী হবে। ১০ ধারায়ও একটি পরিবর্তন আনা হচ্ছে। খসড়া অনুসারে, সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলার বিচারের েেত্র অন্যান্য মামলার মতোই ট্রাইব্যুনাল তার কার্যপ্রণালি বিধিমালা অনুসারে অভিযোগ গঠন, দোষী সাব্যস্তকরণ ও রায় ঘোষণা করবেন।
এটি হবে এ আইনের চতুর্থ দফা সংশোধন। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের প্রথম দফা সংশোধনীতে কয়েকটি স্থানে পরিবর্তন এনে মূলত হালনাগাদ করা হয়েছিল। ২০১২ সালে দ্বিতীয় সংশোধনীতে আসামির অনুপস্থিতিতে তাকে পলাতক ঘোষণা করে বিচার এবং এক ট্রাইব্যুনাল থেকে আরেক ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের বিধান যুক্ত করা হয়। এরপর সংশোধনী আনা হয় ২০১৩ সালে। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই সময়ের আইনে দ-ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপরে আপিলের সুযোগ ছিল না। পরে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপরেও আপিলের সমান সুযোগ রেখে আইনটির তৃতীয় সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়।
আইনজ্ঞরা জানান, আইন সংশোধন করে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা ছাড়াও সন্ত্রাসী বা জঙ্গি সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সার্কুলার জারি করে সংগঠনটি নিষিদ্ধ করা যায়। যেমন হিযবুত তাহরিরকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু সরকার জামায়াতের ক্ষেত্রে তা করছে না।
এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করাটা খুবই জরুরি। আদালতেরও এ ব্যাপারে পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ইতোমধ্যে জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়ে আইন সংশোধনীর খসড়া প্রায় চূড়ান্ত। শিগগির এটি মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে তোলা হবে। এ ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. তুহিন মালিক বলেন, সংবিধান অনুসারে সংগঠন করার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। এটি খর্ব করা মানে সংবিধান লঙ্ঘন করা। তাই সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ হবে। কারণ মানুষ হত্যা, গাড়ি পোড়ানো ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করার অভিযোগে জামায়াতকে যদি জঙ্গি সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ঘাড়েও একই দোষ চাপিয়ে তাদের বিরুদ্ধে একই সিদ্ধান্ত নিতে পারে মতাসীন প। কারণ হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগ অথবা ছাত্রদল-যুবদল রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে, গাড়ি পোড়ায় এবং মানুষ হত্যার মতো ঘটনা ঘটায়। তিনি আরও বলেন, সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধের বিষয়টি যতটা না আইনি, তার থেকে অনেক বেশি রাজনৈতিক। এ কারণে রাজনীতিবিদদের এ ব্যাপারে বিচণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এদিকে জামায়াতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য মোটেই শুভ হবে না। আর এমন কোনো সিদ্ধান্ত যদি নেওয়াই হয়, তাহলে সে ব্যাপারে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত। সরকার ইচ্ছা করে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনবে না বলে মনে করছি। জামায়াতে ইসলামীকে ধ্বংস করা যাবে না।