যে মিনিবাসটি জগলুলকে হত্যা করেছে, ওই গাড়িটির সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা ছিল না। ওই মিনিবাসটির মালিকের সঙ্গেও নয়। চালক তাঁকে নিজে হাতেও হত্যা করেনি, সুতরাং তাকে যে ‘ঘাতক’ বলতে মন্ত্রীর তরফ থেকে নিষেধ করা হয়েছে, তাতে অন্যায় কোথায়? জগলুলের হত্যার জন্য যদি কাউকে আসামি করে আদালতের কাঠগড়ায় নিতেই হয়, তা ওই মিনিবাসের দুটি টায়ার। বাসের মালিক নয়, চালক নয়, মালিক সমিতির নেতা নয়, চালক সমিতির নেতা নয়—জগলুলকে হত্যার জন্য দায়ী গাড়ির চাকা।
নগরের ব্যস্ততম রাস্তা, গালভরা নাম ভিআইপি রোড বলে যার খ্যাতি, যেখানে জগলুল নিহত হন, ঠিক ওই জায়গাটি দিয়েই ওই দিন বেলা দুটোয় আমি আসছিলাম। গিয়েছিলাম একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে। আয়োজনে ‘ট্রমালিঙ্ক’ ও ‘বিপদে আমরা’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠান। আলোচ্য বিষয় ছিল সড়ক দুর্ঘটনা কীভাবে কমিয়ে আনা যায় এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের কীভাবে দ্রুত চিকিৎসাসেবা
দেওয়া যায়। তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তখন জানতাম না যে-জায়গাটি দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সেবা দেওয়া নিয়ে কথা বলতে বলতে আসছিলাম, ঠিক সেখানেই ছয় ঘণ্টার মধ্যে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর শিকার হবেন।
জগলুল আহ্মদ চৌধূরী বাংলাদেশের খ্যাতিমান ও সুশিক্ষিত সাংবাদিকদের একজন। তিনি অধিকাংশ সময় নাম স্বাক্ষর করতেন ‘জগলুল এ চৌধূরী’। আমি তাঁকে ফাজলামো করে ডাকতাম মিস্টার চাউড্রি। স্বাধীনতার পরে একজন ইউরোপীয় সাংবাদিক তাঁকে ‘মিস্টার চাউড্রি’ সম্বোধন করার পর থেকেই আমি বলতাম ‘মিস্টার চাউড্রি’। তিনি সেটা উপভোগ করতেন এবং তিনি গত হপ্তা পর্যন্ত আমাকে ‘কবি’ সম্বোধন করতেন। কলাম-টলাম লেখার পর থেকে আমার একদা কবিখ্যাতি যখন বিলুপ্তির পথে, তখন তাঁর ‘কবি’ ডাক আমার হৃদয়ে মধু বর্ষণ করত।
আমার বন্ধু হুমায়ুন আজাদ আহত হওয়ার পর নীতিগত কারণে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা থেকে ২০০৪-এর ২ মার্চ চিরবিদায় নিয়ে যেদিন আমি বেরিয়ে আসি, তার আগে ৩০ বছর এক ঘরে অধিকাংশ সময় পাশাপাশি টেবিলে বসেছি। বন্ধু এবং সহকর্মী বলে নয়, অন্যভাবেও জগলুলকে আমি দেখেছি। জগলুল ছিলেন শতভাগ নিষ্ঠাবান সাংবাদিক। সাংবাদিকতায় পেশাদারত্ব বলতে যা বোঝায় তা তাঁর মধ্যে ছিল। বাসস ছাড়াও তিনি ছিলেন বাংলাদেশে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া, টাইম ম্যাগাজিন, জাপানের জিজি প্রেস ও কাতারের বার্তা সংস্থার প্রতিনিধি।
ঢাকায় বসে ভারতের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কে আমি যেটুকু ধারণা অর্জন করেছি, তার জন্য আমি অনেকখানি ঋণী আমার দুই বন্ধু-সহকর্মী জগলুল ও হারুণ হাবীবের কাছে। হারুণ বহুদিন থেকে ভারতের দৈনিক হিন্দু ও পাক্ষিক ফ্রন্টলাইন-এর ঢাকা প্রতিনিধি। জগলুল প্রতিনিধি ছিলেন টাইমস অব ইন্ডিয়ার। জিপিওর ডাকপিয়ন প্রতিদিন হারুণ ও জগলুলের পত্রিকাগুলো তাঁদের টেবিলে রেখে যেতেন। জগলুল মিনিট দুই চোখ বুলিয়ে এগুলো ছুড়ে দিতেন আমার টেবিলে। হারুণের হিন্দু ও ফ্রন্টলাইনকে আমি আমার নিজের কাগজই মনে করতাম। কেরালার বিখ্যাত Week-সহ আমার কাছেও কয়েকটি কাগজ আসত।
এই লেখা লিখতে গিয়ে আমার আর্দ্র চোখে ভাসছে যে দৃশ্য তা হলো: গাড়ির চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে, জোরে জোরে ‘পুরনো সেই দিনের কথা’ বা ‘মোর বীণা ওঠে কোন সুরে’ গাইতে গাইতে জগলুল ঘরে ঢুকছেন। অফিসে হোক, প্রেসক্লাবে হোক বা যেখানেই হোক, তাঁর উপস্থিতি নিঃশব্দ ছিল না। তিনি ছিলেন হাস্যরসপ্রিয়। নিজে হাসতেন, অন্যকে হাসাতেন।
বছর তিনেক জগলুল ছিলেন দিল্লিতে বাসসের বিশেষ প্রতিনিধি। দিল্লিতে তিনি হয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাংবাদিক। সবার সঙ্গেই তাঁর ভাব। ভারতের উচ্চপর্যায়ের অনেক নেতা ও কূটনীতিকের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। লেখক, সংগীতশিল্পী, চিত্রশিল্পীদের সঙ্গেও। অনেকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ‘তুমি’ পর্যায়ে।
একবার আমি খুব বিব্রত হয়েছিলাম। ঘরে ঢুকে দেখি এক ভদ্রলোক তাঁর টেবিলের সামনে বসা। আমাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই যে কবি এসেছে।’ তারপর খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘আমাদের নিমাইদা, নিমাই ভট্টাচার্য, আপনারা কথা কন, আমি ফরেন অফিস থেকে আসি।’ আমার বিশেষ ভাবান্তর লক্ষ না করে বললেন, ‘চিনলেন না, জনপ্রিয় লেখক নিমাই ভট্টাচার্যকে চিনলেন না, দাদার পিকাডেলি সার্কাস, রাজধানী এক্সপ্রেস, মেম সাহেব—কত সব নামকরা বই।’ বুদ্ধিমান ভট্টাচার্য নিজেকে এবং আমাকে উদ্ধার করেন। বলেন, আমার বই সবাই পড়ে না, একটি বিশেষ বয়সী ছেলেমেয়েরাই পড়ে। পরে তাঁকে ও আমাকে নিয়ে এক চায়নিজ রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলেন।
২৫-৩০ বছর আগের কথা। কী জন্য ঘুরেছি ঠিক মনে নেই, তবে সম্ভবত দেশ ও জনগণকে উদ্ধার করতেই হবে। অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, জগলুল, ইত্তেফাক-এর নাজিমুদ্দিন মোস্তান, আমি ও আরও কেউ কেউ দেশের নানা জায়গায় গিয়েছি। কখনো সারা দিন খাওয়া জুটত না, কোথাও খাওয়াদাওয়ার বিরাট আয়োজন। জগলুল ছিলেন ভোজনরসিক। বলতেন, পোলাও, রোস্ট, কোরমা, বিরিয়ানি দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। ইনসুলিন নিতেন; কিন্তু খেতেনও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিয়েবাড়ি ও দেশি-বিদেশিদের সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা হতো। আমাকে সঙ্গে নিয়ে বসতে তিনি পছন্দ করতেন এবং খেতে বসে অবধারিতভাবে আমার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সবাইকে রস করে গল্প শোনাতেন।
জগলুল ইংরেজি এবং বাংলা দুভাষাতেই সমান দক্ষ ছিলেন। দুভাষাতেই লিখতেন ও বলতেন ভালো। হস্তাক্ষর ছিল অতি পাকা। তাঁর রিপোর্ট ও ফিচার লেখার একটি বিশেষত্ব ছিল। একটানে ইংরেজি লিখতে পারতেন। সেকালে কম্পিউটার ছিল না। টাইপরাইটারে লিখতে হতো। যখন কাগজে লিখতেন, কাগজের একচুল জায়গাও ছাড়তেন না। কাগজের একদম বাঁ দিকে কোনা থেকে লেখা শুরু করতেন। এপিঠ-ওপিঠ লিখতেন। কাগজের অপর পৃষ্ঠায় গিয়ে লেখা শেষ করতেন ডান দিকের কোনায় গিয়ে। এ নিয়ে অনেক ঠাট্টা করেছি। বলেছি, এ কেমন কৃপণতা! অথচ জগলুল একেবারেই কৃপণ ছিলেন না। তাঁর হাত ছিল একেবারেই খোলা। তাঁর এলাকার ও ঢাকায় বহু মানুষকে তিনি টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন।
নিরহংকার জগলুলের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল। কখনো তিনি তা প্রকাশ করতেন না। তাঁর বাবা নাসিরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ছিলেন আসাম আইনসভার এমএলএ। ১৯৫৪-তে যুক্তফ্রন্ট থেকে নির্বাচন করে তিনি আইনমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাঁর শ্বশুরের দিকটিও খুবই সংস্কৃতিমান। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সিন্দু-হিন্দোল উৎসর্গ করেছিলেন যে বাহার ও নাহারকে, তাঁরা তাঁর শ্বশুর ও ফুফু শাশুড়ি। তাঁর শ্বশুরের নামে হাবীবুল্লাহ্ বাহার কলেজ। হাবীবুল্লাহ্ ছিলেন নজরুলের অতি স্নেহভাজন। চল্লিশের দশকের শেষের দিকে হাবীবুল্লাহ্ বাহার ছিলেন পূর্ব বাংলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জগলুলের শাশুড়ি আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ছিলেন পঞ্চাশের দশকে একজন অগ্রগণ্য সমাজসেবী ও শিক্ষাব্রতী। আমার বিয়েতে জগলুল এবং জগলুলের বিয়েতে আমি খাটাখাটনি করেছি। ভাবি তাজীন চৌধুরী অসামান্য হৃদয়বান মানুষ। দেখা হলে আর ছাড়তে চান না।
রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে তাজীন চৌধুরী সুপরিচিত। তিনিও অসুস্থ। জগলুলের চলে যাওয়ার আঘাত তিনি কীভাবে সইবেন?
জগলুলের মর্মান্তিক মৃত্যুর শোক দ্বিগুণ হলো, যখন খবরে পড়লাম: রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি বেশ কিছুক্ষণ সড়কেই পড়ে ছিলেন। মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কয়েকটি গাড়িকে হাত নেড়ে থামাতে বললেও কেউ শোনেনি। সহৃদয় পথচারীদের কেউ তাঁকে পান্থপথের একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। তাঁরা চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সেখান থেকে নেওয়া হয় গ্রিন রোডের আরেক হাসপাতালে। তাঁরাও তাঁকে ফেরত দেন। রোগী ভর্তি করার আগে কাউন্টারে যথেষ্ট টাকা জমা না দিলে বাংলার মাটিতে কোনো হাসপাতালই রোগীকে চিকিৎসা দিতে বাধ্য নয়।
জগলুলের মৃত্যুর সংবাদটি পড়ে আমার মনে হলো, মিনিবাসটি যখন তাঁকে আঘাত করে, তখন ওই গাড়িতে কোনো যাত্রী ছিল না। যে সড়কের চৌরাস্তায় চৌধূরীর মাথা থেঁতলে যায়, সেই সড়কে কোনো জনমানব ছিল না। কোনো পুলিশ কারওয়ান বাজার চক্করে ছিলেন না। মিনিবাসে যদি কোনো মানুষ থাকত, তা হলে বাসটি থামাতে বলত। প্রথামতো চালক লাফিয়ে বেরিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলেও গাড়িটি আটক করা যেত। আর যদি ওসব নাও হতো, কোনো যাত্রী পরবর্তী স্টপেজে বাস থেকে নেমে মিনিবাসটির নম্বর টুকে পুলিশকে জানাতে পারত। তাই মাঝেমধ্যে মনে হয় বাংলার মাটিতে কোনো মানুষ নেই—লোকজন আছে।
কয়েক বছর যাবৎ সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে চেঁচামেচি করছি। কেন করছি তা জানি না। কোনো বড় দুর্ঘটনা হলে সেখানে ছুটে যাই। কেন যাই এবং গেলে কী লাভ, তা জানি না। ইলিয়াস কাঞ্চন তাঁর স্ত্রী নিহত হওয়ার পর থেকে আন্দোলন করছেন। তা করতে গিয়ে অপমানিত পর্যন্ত হয়েছেন। তবে কিছুদিন থেকে টিভিতে দেখছি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে প্রবলবেগে গবেষণা হচ্ছে। এখন এ নিয়ে কলসালট্যান্সি হবে, সেমিনার হবে, গবেষণা হবে, বিদেশি ফান্ড আসবে। কিন্তু দরকার যা তা হলো সড়কে হত্যাযজ্ঞ কমানো। তা আমাদের মতো অক্ষমদের কাজ নয়। তা পারেন, এই মুহূর্তেই পারেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, যানবাহনের মালিক সমিতির নেতারা এবং চালক সমিতির নেতা ও পৃষ্ঠপোষকেরা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
( প্রথম আলো )