রাজশাহী: ছাত্রের গোঁফ টেনে ছিড়ে ফেললেন শিক্ষক। অমানবিক হলেও শিক্ষার্থী নির্যাতনের এ ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছেন এক শিক্ষক। এ অমানবিক ঘটনাটি ঘটেছে দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে।
মঙ্গলবার দুপুরে ক্লাস চলাকালীন কলেজের এক শিক্ষক একাদশ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আলী মুহতাসিম ঐশিককে (১৭) নির্বিচার চড়-থাপ্পড় দেয়া ছাড়াও তার গোঁফ টেনে তুলে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় ঐ শিক্ষকের বাবা ব্যবসায়ী হাসমত আলী নির্যাতনকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে নগরীর রাজপাড়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আজ একাদশ বিজ্ঞান শ্রেণির প্রাণিবিদ্যার ক্লাস চলছিল কলেজ ভবনে। ক্লাশ করছিলেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইদুর রহমান। ক্লাসের পেছনের দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী শব্দ করে কথা বললে শিক্ষক সাইদুর রহমান ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
এসময় সাইদুর রহমান আকস্মিকভাবে ক্লাসের শিক্ষার্থী ঐশিকের কাছে যান। এরপর তাকে দাঁড় করিয়ে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড় মারতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি দুই হাত দিয়ে ঐশিকের গোঁফ ধরে জোরে টান দেন এবং টানতে টানতে ছিঁড়ে ফেলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ওই ক্লাশের একজন শিক্ষার্থী জানান, শিক্ষক সাইদুর রহমান যখন গোঁফ ছিঁড়ে ফেলছিলেন তখন ঐশিক কান্নাকাটি ও অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলেন। এক পর্যায়ে ছাত্রের তুলে ফেলা গোঁফের স্থান থেকে রক্ত বোরোলে ওই শিক্ষার্থী প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। সহপাঠিরা তাকে ধরাধরি করে ক্লাশের বাইরে নিয়ে যায় এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
এদিকে শিক্ষক সাইদুর রহমানের এই আজবকান্ড কলেজের অধ্যক্ষসহ শিক্ষকরাও ছুটে আসেন আহত ছাত্রকে দেখতে। ভিড় জমে যায় কলেজ প্রাঙ্গণে। শিক্ষকের এই কান্ডে থ’ হয়ে যান শিক্ষক-ছাত্র সবাই।
ঐশিকের বাবা ব্যবসায়ী হাসমত আলী বলেন, প্রায় এক মাস আগে শিক্ষক সাইদুর রহমান ক্লাস চলাকালীন ঐশিককে মেঝেতে ফেলে দিয়ে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন। একই কায়দায় মারধর করা হয় ক্লাশের আরেক ছাত্র রাব্বীকে। ওইসময় কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুরোধে নির্যাতিত শিক্ষকদের অভিভাবকরা অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকেন।
বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী বুলবুল, তরঙ্গ, রাফি ও নিবিড়সহ ও কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, প্রাণিবিদ্যার শিক্ষক সাইদুর রহমান অত্যন্ত বদমেজাজি। সব সময় অস্থির থাকেন। মানসিকভাবে খুবই রুক্ষ প্রকৃতির। তিনি ছাত্রদের মাঝেমাঝেই মারধর করেন। চড় থাপ্পড় তার কাছে সাধারণ ব্যাপার। তিনি শিক্ষার্থী নির্যাতনের সময় নিজে একটি ছাত্র সংগঠনের নেতা পরিচয় দিয়ে থাকেন। তার অনেক ক্ষমতা তাও ছাত্রদের শুনিয়ে দেন।
শিক্ষার্থীরা আরো বলেন, ক্লাসে সাইদুর রহমান প্রায়ই বলেন, ছাত্রজীবনে তিনি একটি ছাত্র সংগঠনের ক্যাডার ছিলেন। তিনি যা ভালো ভাবেন তাই করবেন। কেউ তার কিছুই করতে পারবে না।
আহত ছাত্র কৌশিক বলেন, এর আগেও আমাকে মেঝেতে ফেলে মারধর করেছেন স্যার। কিন্তু বাসার কাউকে বলিনি। কিন্তু আজকের ঘটনাটি আমার একজন সহপাঠী বাবাকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানিয়েছেন। আমার অভিভাবকরা ছুটে এসেছেন কলেজে।
ঐশির বাবা হাসমত আলী বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন না করার ব্যাপারে উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন দিয়ে সতর্ক করার পরও শিক্ষক সাইদুর রহমান শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই শিক্ষকের বিচার চাই। এ কারণে তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছি।
অভিযোগ অস্বীকার করে সহকারী অধ্যাপক সাইদুর রহমান বলেন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমার বিরুদ্ধে অযথা অভিযোগ আনা হচ্ছে হয়রানি করার জন্য। কেন আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। ঐশিক নামের শিক্ষার্থীর গোঁফ কে ছিঁড়ে ফেলেছে জানতে চাইলে তিনি জবাব দেননি।
এ ব্যাপারে রাজপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এ ঘটনায় ঐশিকের অভিভাবকের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ পাওয়ার পর স্টাফ কাউন্সিলের বৈঠকে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগামী ৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য তদন্ত কমিটিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।