নতুন সময় বলে কিছু নেই- অনেকে ভুরু কুঞ্চন করে এ কথার দিকে তাকিয়েছেন হয়তো। ভেবে দেখুন তো, সময়কে কি দেখেছেন কখনো? দেখেছেন ঘড়ি। সেই ঘড়ির পেছনে আছে মানুষের পরিশ্রম, মানুষের সাধনা।
সময় চিরকাল একই গতিতে অসীম থেকে অসীমে প্রবাহিত হয়। মহাবিশ্বের সর্বত্র সময়ের পরিমাপ সমান নয়। পরমাণুর গতি যত বাড়ে, ততই সময়ের গতি কমতে থাকে। ধারণা করা হয়, আলোর সমান গতি বেগ অর্জন করলে সময় শূন্য বা স্থির হয়ে যায়। তাহলে নতুন সময় কী করে তৈরি হয়? সময় নয়, বরং নতুন হয় মানুষ। মানুষের নতুন চিন্তা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন আবিষ্কার সময়কে নতুন করে তোলে। এই সমুদ্র এক হাজার বছর আগেও এমনই ছিল। এ আকাশও তাই। আমাদের কাছে দ্রুতগামী জাহাজ ছিল না। উড়োজাহাজ ছিল না। চাঁদ ছিল, মহাকাশযান ছিল না। মানুষ তার নতুন আবিষ্কার, বিজ্ঞানের গবেষণা ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে এই সময়টিকে নতুন সময়ে পরিণত করেছে। এখন আমরা মঙ্গলগ্রহে বসবাস করার স্বপ্ন দেখি। আমার কাছে তাই নতুন সময় বলে কিছু নেই, আছে নতুন মানুষ। নতুন মানুষ তৈরি করতে না পারলে নতুন সময়ের দেখা আমরা পাব না।
সারা পৃথিবীতে এখন পুঁজি মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশ ২০২১ সালে মধ্য আয়ের দেশ হবার স্বপ্ন দেখে। টাকা দিয়ে কি নতুন সময়, উন্নত জীবন পাওয়া সম্ভব? আমার সেটি মনে হয় না। কারণ উপার্জনের চেয়ে টাকা কীভাবে ব্যবহƒত হলো, সেটাই বিবেচ্য হওয়া উচিত। এখন মধ্যপ্রাচ্যে নানা রকম অমানবিক পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত যে তরুণসমাজ দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে, ২০৩০ সালে তাদের বয়স হবে ৪০ থেকে ৫০। এরা দেশ ফিরবে। শ্রমের চাহিদা কমবে। এভাবে পরের দেশের ময়লা সাফ করে, গৃহকর্মী কিংবা উটের রাখাল হয়ে আর বেশি দিন কোটি টাকা পাঠানোর জনসংখ্যা কর্মক্ষম থাকবে না। আমরা কি আমাদের আগামী প্রজš§কেও এভাবে জনশক্তি রপ্তানির নামে সুইপারের জীবন বেছে নিতে বাধ্য করব? নাকি দেশে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করব? আমরা কি এভাবেই সারা দেশে রিকশা চালনার মতো অমানবিক পেশাকে অব্যাহত রাখব? আমরা কি বাংলাদেশে তিন-চার রকমের শ্রেণি বিভাজিত শিক্ষা চালু রেখে, ব্রিটিশ ইংলিশ স্কুল, সরকারি বাংলা স্কুল এবং ধর্মীয় মাদ্রাসার মধ্যে একই সঙ্গে শিক্ষার বৈষম্য ও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যকে আরও স্থায়িত্ব দেব?
এসব প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কেবল টাকা কামিয়ে মধ্য আয়ের দেশ হলে আখেরে নতুন সময় কোনো কাজে দেবে না। ক্ষুদ্রঋণ নামের দাদন ব্যবসা, এনজিও নামের বেতনভোগী সমাজসেবী আর সিএসআর করে লাভের জন্য আগ্রাসী, মহৎ ব্যবসায়ী সমাজ কোনো দিনই দেশে বিরাজমান ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য দূর করতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, মাথাপিছু গড় আয়ের পরিমাণ কোনোভাবেই সামাজিক বণ্টনকে নিশ্চিত করে না। আয় বাড়লেই সেই আয়ের সুফল সবার ঘরে পৌঁছায় না। এই দেশে বেতন-ভাতার বৈষম্য, কাজের সামাজিক শ্রেণিভেদ একধরনের বর্ণবাদে রূপ নিয়েছে। টেলিভিশনের সাংবাদিক ৩০ হাজার টাকা বেতন পেলে সেই টেলিভিশনের প্রধান পান তিন লাখ টাকা। সরকারি বেতন স্কেল কোনোভাবেই বিরাজমান দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতিপূর্র্ণ নয়। দুর্নীতি তার সর্বব্যাপী চেহারায় বিকাশমান। আয় বাড়লে সেটি কমার কোনো নমুনাও আমরা দেখি না। তাই আয় বাড়িয়ে নতুন সময় পাওয়ার কল্পনা একধরনের বিলাসী স্বপ্ন কিংবা আষাঢ়ের দিনে সময়ক্ষেপণ।
আমাদের চাই নতুন মানুষ। যে মানুষ মানুষের মূল্য দেবে। যে মানুষ মানুষের জন্য জীবন দেবে। যে মানুষ আমরা দেখেছি। ১৯৭১ সালে যে মানুষ সব ফেলে নিজের রক্ত দিয়েছে অকাতরে। ১৯৫২ তে যে মানুষ আমার বাংলা ভাষাকে তার গৌরবের শীর্ষে আসন দিয়েছে আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। আমাদের চাই নতুন মানুষ, যে মানুষ তার চিন্তা দিয়ে সমৃদ্ধ করবে পৃথিবীকে। চাই দক্ষ নবীন প্রজš§। চাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্পদের বণ্টন, ভূমির সংস্কার। চাই জš§রোধ এবং প্রতিটি নতুন জšে§র জন্য আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা।
চাই বিজ্ঞানমনস্কতা, চাই উদারতা, চাই নারী-পুরুষের সামজিক ও পারিবারিক সমতাবিধান। চাই আধুনিক সুবিধাদি। চাই পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা। আর এসব কখনোই সময়ের অপেক্ষায় থাকলে পাওয়া সম্ভব নয়। নতুন মানুষই কেবল পারে নতুন সময়কে আমাদের সামনে এনে দিতে। আমি তাই সময় নিয়ে ভাবি না, মানুষ নিয়ে ভাবি।
লেখক: চিকিৎসক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব