রেজোয়ান সিদ্দিকী: রেলে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে বস্তা বস্তা টাকার দুর্নীতি করে ‘কালো বিড়াল’খ্যাত আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একবার বিরোধী দলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর শেখ হাসিনা ছুঁলে ছত্রিশ ঘা। এটা যেন বিরোধী দল মনে রাখে। বিরোধী ২০ দলীয় জোট সে কথা মনে রেখেছে কি না, বলতে পারি না। কিন্তু কথাটা এবার মনে রাখার দরকার হয়ে পড়েছে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তির দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রকে। তারা কল্পনাও করতে পারেনি কোন বাঘের গুহায় তারা ঢুকে পড়েছে। এইবার যুক্তরাষ্ট্রের খবর আছে। তারা টের পাবে, কত গমে কত আটা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অপরিমিত শক্তি আর ক্ষমতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র, এর রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা, তার ‘দুই আনার মন্ত্রী’ নিশা দেসাই বিসওয়াল, কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কোনো ধারণাই নেই। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ভুলেই গেছে যে, শেখ হাসিনা ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, ‘বাংলাদেশের জাতির জনক’ ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। পৃথিবীর কাউকে তিনি খাজনা দিয়ে চলেন না। দেয়ার দরকারও নেই। বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্রকেই জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন এই রাষ্ট্র কাউকে পরোয়া করে চলে না।
শেখ হাসিনা সঠিকভাবে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বন্ধু থাকল কি থাকল না, তাতে আমাদের কিছুই যায় আসে না। এই যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের তো সমর্থন দেয়ইনি, বরং বিরোধিতা করেছে। তারা পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে। তাদের নিয়ে আমাদের এত পিরিতের কী দরকার! একেবারে খাঁটি কথা। তারা পাকিস্তানের পক্ষে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয় দেখাতে। তাদের সম্পর্কে আমাদের তো দরদের কিছু নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়া থেকে ফিরে খুব স্পষ্ট করে সে কথা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছেন। জানিয়েছেন তার ভ্রমণোত্তর সংবাদ সম্মেলনে। তিনি এবার শুরু থেকে যেসব সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তাতে সরকারের আস্থাভাজন মিডিয়ার সাংবাদিকেরা ছাড়া আর কারো প্রবেশ নিষেধ। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) মহাপরিচালক ছিলাম। সাংবাদিকদের প্রথিতযশা প্রশিক্ষক দিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছি সারা দেশে। তাদের কিভাবে প্রশ্ন করতে হয়, তার ওপর প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছি। এখন দেখলাম, নতুন বা পুরনো কোনো সাংবাদিকের ক্ষেত্রে এর কোনো কিছুই কাজ করেনি। তাদের অনেকে অবশ্য সেই টেনিউর-এ সাংবাদিকই ছিলেন না।
এখন তোষামোদের যে সাংবাদিকতা দেখছি, তা আমাদের কাছে ছিল অকল্পনীয়। দেখলাম, প্রশ্ন করতে গিয়ে আমার সহকর্মীরা প্রথমে নানা বিষয়ে কেবল প্রশংসা করতে থাকেন। এ দিকে আসল প্রশ্ন হারিয়ে যায়। বেছে বেছে ওই ধরনের সাংবাদিকদেরই সংবাদ সম্মেলনে ডেকে নেয়া হয়। সব টিভি চ্যানেলেরও সেখানে প্রবেশ নিষেধ।
এ রকম একটি পরিবেশে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী গত বৃহস্পতিবার ফের একহাত নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। তিনি বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তারা বন্ধ করতে চেয়েছিল, পারেনি। ’৭১ সালে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। সপ্তম নৌবহর পাঠাতে চেয়েছিল। পদ্মা সেতুতে তারা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ শেষ হয়ে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র পাশে না থাকলে আমরা মরে যাবো না। মনে রাখতে হবে, আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমাদের সে মর্যাদা নিয়ে চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র পদ্মা সেতুর কাজ শুরুর আগেই আমাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অপবাদ দেয়। তারা বিশ্বব্যাংককে নানা ধরনের চাপ দিয়েছিল। বিশ্বব্যাংক বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই অর্থায়ন বাতিল করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশেই বিশ্বব্যাংক ওই চুক্তি বাতিল করেছে। তিনি বলেন, কোনো একটি কারণে কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে, তা তো বলা যাবে না। একটা দেশ পাশে না থাকলে শেষ হয়ে যাবো? বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বাংলাদেশের অনেক বন্ধু রয়েছে।
এখানে প্রশ্ন-উত্তর পর্বে বরাবরের মতোই উত্তর ছিল না। বরং প্রধানমন্ত্রী সব প্রশ্নের পাল্টা প্রশ্ন করেছেন। টিআইবির দুর্নীতির সূচক প্রকাশকে তিনি সহজভাবে নেননি। টিআইবি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যারা দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে না। টিআই কেন হঠাৎ এ সময়ে এমন রিপোর্ট প্রকাশ করেÑ এ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে তারা এই রিপোর্ট দিলো। তাদের উদ্দেশ্যটা কী, এটিও বিষয়। টিআইবি বললে তো হবে না! তাদের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে হবে। গাড়িতে, ট্রাকে, দোকানে দুই টাকা চার টাকা দুর্নীতি হয়তো কোথায়ও হয়। পৃথিবীর কোন দেশ আছে যেখানে দুর্নীতি নেই? আমরা সরকারে আছি, আমরা দুর্নীতি করছি কি না, সেটাই প্রশ্ন। দুর্নীতি করলে তো প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশ হতো না। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন দেশ পেছনে গেছে। আর এখন আমরা সামনে নিয়ে যাচ্ছি। যারা দুর্নীতির কথা বলে, তাদের সোর্স অব ইনকাম আমরা খুঁজে দেখব।’
প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জবাব না দিয়ে বা প্রতিকারের ব্যবস্থা না জানিয়ে বলেন, ‘মাঝে মাঝে প্রশ্ন ফাঁসের খবর পাওয়া যায়। বিএনপির সময় তো প্রশ্ন আগেই দিয়ে দেয়া হতো। আমাদের সময় কোনো অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’ বিমানের মাধ্যমে টনকে টন স্বর্ণ চোরাচালান সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিমান তো আগে মুখথুবড়ে পড়েছিল, এখন যারা বিমানে ভ্রমণ করেন, নিশ্চয়ই তাদের তফাতটা চোখে পড়বে। বিমানের নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যাত্রীদের তল্লাশি করায় স্বর্ণ ধরা পড়ছে। যেটা আগে করা হতো না। যারা ধরা পড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। পত্রপত্রিকায় চেয়ারম্যানের পালিত পুত্র নিয়ে নানা ধরনের খবর এসেছে। এখানে চেয়ারম্যানের দোষ কী? যারা ধরা পড়েছে, তাদের ছাড়িয়ে আনতে কি চেয়ারম্যান গিয়েছে?’
অর্থাৎ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেননি প্রধানমন্ত্রী। বরং প্রতিটি বিষয়েই মুখরা যুক্তি দিয়েছেন। অনেকের মতে, এটা প্রকারান্তরে অভিযোগগুলো স্বীকার করে নেয়া এবং দায় অপরের ওপর চাপিয়ে দেয়া। আর সব ক্ষেত্রেই ঘুরে ফিরে বিএনপির ওপর দোষ চাপানোর গৎবাঁধা চেষ্টা চালানো।
এ সরকারের মন্ত্রীরা যা বলেন বা করেন, তার সবই যেন একেবারে বেদ-বাইবেল। এর সামান্যতম সমালোচনা বা ভিন্নমতও তারা সহ্য করতে প্রস্তুত নন। এই অসহ্যওয়ালাদের তালিকায় শুধু হাইব্রিডরা নয়, এখন তোফায়েল আহমদরাও যুক্ত হচ্ছেন। দেশে বিদেশে কেউই তাদের কোনো কাজেরই সমালোচনা করতে পারবে নাÑ এমনই এক অদ্ভুত মানসিকতা পেয়ে বসেছে তাদের।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন যে প্রায় ভোটারবিহীন ছিল সে কথা বলতে যাওয়াটাও যেন এখন পাপে পরিণত হয়েছে। মানসিকতা যেন এমনÑ আমাদের দেশে আমরা ভোটারওয়ালা বা ভোটারবিহীন, যেভাবেই নির্বাচন করি না কেন, যেভাবেই ক্ষমতায় আসি না কেন, ক্ষমতায় থাকি না কেন, আমরা যা ইচ্ছা, তা করব, ছাত্রলীগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হবে, তাতে কার কী? মনে রাখতে হবে এটা আমাদের দেশ। এতে অন্য কারো নাক গলানো চলবে না। প্রশ্নবিদ্ধ বিচারের মাধ্যমে কাউকে চরম দণ্ড দিলেও কিছু বলা যাবে না। অপর দিকে, ফাঁসির জন্য অপেক্ষমাণ আসামিদের ছেড়ে দিলেও না।
আর এ কারণেই এখন সারা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে । সেখানে সরকার শালীনতা-অশালীনতার মানদণ্ড ভুলে গেছে। মন্ত্রীদের ভাষায় মনে হয়, তারা বেসামাল। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা সম্পর্কে সরকার বরাবরই খড়্গহস্ত। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ৫ জানুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচনকে নির্বাচন মনে করে না। তাই সরকারকে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক মনে করে না। এ কারণেই তারা নতুন করে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। এ রকম কথা বললেই মনে হয় সরকারের কাটা ঘায়ে কেউ যেন নুনের ছিটা দিয়ে বসেছে।
এবার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেসাই বিসওয়াল। তিনি দেখা করেছিলেন কথিত বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ এবং দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথে। রওশনের কাছে তিনি দু’টি বিষয় জানতে চেয়েছিলেন। একটি হলো, বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও তারা কিভাবে সরকারের মন্ত্রী আছেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, (সবার অংশগ্রহণমূলক) নির্বাচন কবে হবে? এতেও সরকারের হোমড়া-চোমরাদের গা জ্বলে গেছে।
নিশা দেসাইয়ের ঢাকা অবস্থানকালেই খুলনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশের অতিথি, মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেসাইকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই আনা মন্ত্রী, চার আনাও নাÑ এক মন্ত্রী আছেন নিশা দেসাই। তার এখনো বিয়ে হয়নি। তার সাথে বাংলাদেশের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিভিশনে দেখে মনে হয়, ২২-২৩ বছরের মেয়ের সামনে একদম শিশু খালেদা হাত পেতে বসে আছেনÑ ক্ষমতাটা যেন এই মিস দেসাই হাতে তুলে দেবেন।’
ঢাকাস্থ বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনাকে ব্যঙ্গ করে সেদিন সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘আমার বাড়িতে একটি কাজের মেয়ে আছে। তার নাম মর্জিনা। রাতে বাসায় গেলে সে বলে, মামা, টিভিতে বারবার আমার নাম (মজিনা) বলে কেন? তখন ওকে বলি, ও হলো মার্কিন রাষ্ট্রদূত মর্জিনা। ও চাইছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে নামাতে। এ কথা শুনে কাজের মেয়েটি তার নাম পরিবর্তন করেছে।’ আশরাফ বলেন, ‘এমন কোনো শক্তি নেই যে, এক সেকেন্ড আগেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে নামাতে পারবে। বিএনপি বলেছিল, নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে তাদের (বিএনপির) পক্ষে থাকবেন। কিন্তু মনমোহন সিংয়ের চেয়েও মোদি আওয়ামী লীগের পক্ষে কট্টর অবস্থান নিয়েছেন।’ সৈয়দ আশরাফ আরো বলেন, আর কাজের বুয়াদের সরকার পরিবর্তনের দিন শেষ হয়ে গেছে।
সৈয়দ আশরাফ ভুলেই গিয়েছেন যে, ড্যান মজিনা এ দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। নিশা দেসাই সে দেশের সহকারী মন্ত্রী। তাদের অসম্মানকে সংশ্লিষ্ট দেশ নিজেদের অসম্মান বলেই জ্ঞান করে। এ ক্ষেত্রে শিষ্টাচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিষ্টাচার বিষয়টি আওয়ামী অভিধানে একেবারেই অনুপস্থিত বলে দুর্মুখরা মন্তব্য করেন। তারা গালিগালাজ ও আদি রসাত্মক কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গিতে ওস্তাদ। সুরুচির এখানে বড়ই অভাব। মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তার বাসার কাজের বুয়ার সাথে তুলনা করা শিষ্টাচার তো নয়ই, বরং চরম ইতরতা।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা সৈয়দ আশরাফ কি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, এই ধরনের বক্তব্যের পরিণতি কী হতে পারে? এর কী প্রভাব পড়তে পারে মার্কিন উন্নয়ন সহায়তা ও বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে। এর আগেও অন্তত চারজন মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে যে অনাকাক্সিত বক্তব্য দিয়েছিলেন, মার্কিন সরকার এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বিরূপ করে তুলতে বাধ্য। বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ শেষে বিসওয়াল বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ‘অংশগ্রহণমূলক একটি নতুন নির্বাচন দেখতে চায়।’ এতেই সম্ভবত দিশেহারা হয়ে পড়েন সৈয়দ আশরাফ। সরকার তখন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে নিয়মরক্ষার নির্বাচন বললেও এখন বলছে যে, পাঁচ বছরের একদিন আগেও তারা ক্ষমতা ছাড়বে না। সরকারের ধারণা হলো যে, বিসওয়াল বাংলাদেশে এসেছিলেন নতুন নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বেগম জিয়াকে আন্দোলন অব্যাহত রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে। এই ধারণা থেকেই তার ওপর সরকার এমন ক্ষেপে গিয়েছিল।
এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের মন কষাকষি শুরু হয়। যদিও এ কথা সবাই জানে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের আঁতাতের মাধ্যমে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেয়া হয়। এরপর আসে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রকল্প। এর কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য ঘুষ নেয়ার অভিযোগ তোলে বিশ্বব্যাংক এবং তারা তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনসহ চারজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানায়। শেখ হাসিনা ওই মন্ত্রীকে ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে বিশ্বব্যাংকের সে দাবি অস্বীকার করেন।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের তদন্ত দল তদন্ত করে এবং প্রমাণিত হয়, প্রকল্পের কাজ শুরু আগেই সেখানে বিশাল অঙ্কের দুর্নীতি হয়েছে। এ জন্য সরকার ওই মন্ত্রীকে সরিয়ে দিলেও অন্যান্য শর্ত পূরণ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করে দেয়। তাদের সাথে ওই প্রকল্প থেকে সরে যায় আইডিবি, এডিবি এবং জাইকা। সরকারের বদ্ধমূল ধারণা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনাতেই বিশ্বব্যাংক পিছিয়ে গেছে। তা ছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার অভাব আছে বলে অভিযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এই বিচারপ্রক্রিয়ায় জামায়াত নেতাদের ফাঁসি না দেয়ার চাপও আছে তাদের তরফ থেকে। এরপরও মার্কিন মনোভাব অস্বীকার করে দিল্লি, ঢাকা, মস্কোর যে বলয় সরকার তৈরি করতে চাইছে, তাতেও ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র।
আর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে কোনো কথাই শুনতে চায় না সরকার। বান কি মুন বাংলাদেশের জাতিসঙ্ঘে অন্তর্ভুক্তির বার্ষিকী উপলক্ষে যে বাণী পাঠিয়েছিলেন, তাতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আহ্বান ছিল বলে সে বাণীও সরকার পত্রিকার ক্রোড়পত্র থেকে বাদ দিয়ে দেয়।
এ হেন পরিস্থিতিতে এক দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রচারণাযুদ্ধ শুরু করেছে সরকার। অপর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জেএসপি সুবিধা দাবি করে আসছে। গার্মেন্ট খাতে মোট রফতানির ২৩ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সে অর্ডারও সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। শেখ হাসিনা বলছেন, বাংলাদেশের গার্মেন্ট না নিলে যুক্তরাষ্ট্রেরই অসুবিধা হবে। গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রেরই বিপদ। এগুলো কোনো অর্থনীতির সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। এখন বাংলাদেশ সরকারের অবস্থা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের যাত্রাভঙ্গের জন্য নিজের নাক কেটে বসছে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com