• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

গরু নেই, তাই নিজেই ঘানি টানেন নীলফামারীর আজিজুল

image_1825_229092সিসি নিউজ: টানার জন্য নেই কোন গরু বা অন্য কোন পশু। তাই পশুর পরিবর্তে তেলের ঘানি টানতে হয় ওদের। পাঁচ সদস্যের পরিবারের সদস্যদের মুখে দুটো খাবার তুলে দিতেই জোয়াল কাঁধে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তেলের ঘানি টানেন আজিজুল ইসলাম ওরফে আজিজুল তেলী। কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের ঘানি দীর্ঘ তিন-চার ঘন্টা টানলেই সরিষা থেকে বের হয় ফোঁটা ফোঁটা তেল। আর এই ফোঁটা ফোঁটা তেলই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
আজিজুল ইসলাম। তবে এলাকায় পরিচিত আজিজুল তেলী নামে। বাড়ি নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার পৌর এলাকার ৬ নং ওয়ার্ডের কাজির হাট পান্থাপাড়া গ্রামে। মোট পাঁচ ছেলে-মেয়ে আজিজুলের। বড় দুই মেয়ে আন্জুয়ারা ও রুমি বেগমের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর হলো। সামান্য একটু জমিতে দুটো ঘর করে তিন ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছেন আজিজুল ইসলাম। একটি ঘরে থাকেন তিন ছেলে-মেয়ে। আর একটি ঘরে ঘানি। ঘানির পাশেই আটাল (বাঁশের তৈরি বিশেষ বিছানা) করে স্ত্রী আরজিনাকে নিয়ে থাকেন আজিজুল। যে জমিতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছেন সে জমিটিও তার নিজের নয়। বাড়ি করার মতো কোন জায়গা না থাকায় এলাকার এক ব্যক্তি তাকে জায়গাটুকু নিয়েছেন বাড়ি করে থাকার জন্য।
সরেজমিন আজিজুলের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী আরজিনা, ছেলে মহসীন (১৬) ও দুই মেয়ে সুমি (১৩) ও আসমাকে (১০) নিয়ে তেলের ঘানি টানছেন আজিজুল। কাজের ফাঁকে কথা হয় আজিজুলের সাথে। তিনি বলেন, ঘানি টানার জন্য কোন গরু না থাকায় ২০ বছর ধরে নিজেই ঘানি টানছি আমি। তিনি জানান, পরিবারে সদস্যরা মিলে প্রতিদিন পাঁচ কেজি সরিষা ভাঙলে সোয়া কেজি তেল বের হয়। আর এজন্য পরিবারের সব সদস্য মিলে টানা তিন-চার ঘন্টা শ্রম দিতে হয় বলে জানান তিনি। আর এ উৎপাদিত তেল ও খৈল বেচে প্রতিদিন একশ সত্তর থেকে একশ আশি টাকা পর্যন্ত আয়। আর সামান্য এ আয় দিয়েই কোন রকমে কষ্টে চলে তার পরিবার।
আজিজুল বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। মন চাইলেও শরীর আর চলে না। বাধ্য হয়েই পরিবারের নিত্যদিনের খাদ্য জোটাতে অমানুষিক শ্রমে ঘানি টানছি। অনেক চেষ্টা করেও জোটাতে পারিনি একটি গরু কেনার টাকা।’
কথার এক ফাঁকে আজিজুল দুঃখ করে বলেন, ‘গরুর ঘানি মোক টানির নাগেছে। মাঝে মাঝে নিজেকে গরু মনে হয়। কিন্তু কিছু তো করার নাই। গরুর কামটা নিজে না করলে বউ-ছাওয়া তো না খায়া থাকবে। একটা গরু থাকিলে মোক আর ঘানি টানি নাগিল না হয়’।
আজিজুলের স্ত্রী আরজিনা বেগম জানায়, নিজের জমি নাই তাই অন্যের জমিতে বাড়ি করে আছেন তারা। আয় রোজগারের পথ না থাকায় তার স্বামী বেছে নিয়েছেন তেলের ঘানির কাজ। কিন্তু সেই ঘানি স্থাপনের ২০ বছরেও সামর্থ্য জোটেনি একটি গরু কেনার। এমন অপারগতায় তারা নিজেরাই করছেন পশুর সে কাজ।
ছেলে মহসীন আলী (১৫) পঞ্চম শ্রেণীতে লেখাপড়া ছেড়ে নেমেছে পিতার কাজের সহযোগিতায়। আর পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে সুমি আক্তার ও চতুর্থ শ্রেণীর আসমা বেগম লেখাপড়ার ফাঁকে সহযোগিতা করছে মা-বাবার ঘানি টানার কাজে। মহসীন আলী বলেন, ‘জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখছি একটি গরু না থাকায় বাবা নিজেই ঘানি টানছেন। এখন বাবার বয়স হয়েছে, তাই আগের মতো আর ঘানি টানতে পারে না। তাই বাবার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে লেখাপড়া বাদ দিয়ে বাবার ঘানি টানতে সাহায্য করি’। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া সুমি (১২) ও চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া আসমা বলে, ‘লেখাপড়ার ফাঁকে যতটুকু পারি বাবাকে সাহায্য করি’। সেখান থেকে চলে আসার পর দেখা হয় আজিজুলের বড় ভাই আমিনুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, ‘দরিদ্র হওয়ায় কলুর পেশা বেছে নেয় আজিজুল। কিন্তু ঘানি স্থাপনের পর একটি গরুর অভাবে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে নিজেই গরুর কাজটি করে যাচ্ছে আজিজু’। তিনি আরও জানান, ঘানি টানার শ্রমে তার পরিবারে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ কেজি চালের প্রয়োজন। সামান্য এ উপার্জনে যেখানে তার সংসারই চলে না সে গরু কেনার টাকা পাবে কোথায়? এ বিষয়ে জলঢাকা পৌরসভার মেয়র ইলিয়াছ হোসেন বাবলু বলেন, ‘আজিজুলের ঘানি টানার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। বিষয়টি অবশ্যই অমানবিক ও কষ্টদায়ক। খোঁজখবর নিয়ে পৌর পরিষদের পক্ষে তাকে কিভাবে সহায়তা করা যায় এ বিষয়ে অবশ্যই উদ্যোগ নেয়া হবে, যাতে তাকে আর নিজে ঘানি টানতে না হয়’।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ