সিসি ডেস্ক: একের পর এক পাবলিক পরীক্ষা। পরীক্ষার জালে আটকা পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। দিশেহারা অভিভাবক। ব্যস্ততার শেষ নেই শিক্ষক এবং স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষেরও। যাদের দুই থেকে তিনজন ছেলেমেয়ে স্কুল-কলেজে পড়ে পাবলিক পরীক্ষার চাপে তাদের অবস্থা শোচনীয়। একজনের পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই আরেকজনের শুরু। সন্তানের পেছনে সময় দিয়েই তাদের জীবন পার। ঘরসংসার ধর্মকর্ম সামাজিকতা কোনো কিছুতেই মনোযোগী হতে পারছেন না অনেকে।
ঘন ঘন পাবলিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে চলছে জমজমাট কোচিং, প্রাইভেট, মডেল টেস্ট-বাণিজ্য। চলছে সাজেশন, সহায়িকা, একের ভেতরে সব, অনুশীলনী, মডেল টেস্ট প্রভৃতি চটকদার নামে জমজমাট নোট এবং গাইড ব্যবসা। বছরে চারটি পাবলিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দিন থেকে চলছে নানামুখী অসুস্থ প্রতিযোগিতা। মা-বাবা পাগলের মতো ছুটছেন সন্তানের জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ ৫ নিশ্চিত করার জন্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছুটছে কে কার আগে যাবে সে প্রতিযোগিতার পেছনে। শেষ পর্যন্ত এসবের ভিকটিম বা শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
মতিঝিল আইডিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে কথা হয় আকলিমা বেগম নামে একজন অভিভাবকের সাথে। ঘন ঘন পাবলিক পরীক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে আকলিমা জানান, আমরা আর পারছি না ভাই। ভীষণ হাঁপিয়ে উঠেছি। এক ছেলের জেএসসি শেষ হলো। কয়েক মাস পরে বড় ছেলে এইচএসসি দেবে। আরেক মেয়ে কাস ফোরে পড়ে। এভাবে একের পর এক আসছে পরীক্ষা। মেয়ে আগামীতে সমাপনী দেবে। সে জন্য এখন থেকেই তাকে ভালোভাবে গড়ে তোলার জন্য কোচিং-প্রাইভেট শুরু করেছি। আকলিমা জানান, না করে তো উপায় নেই। সবাই জিপিএ ৫, গোল্ডেন জিপিএ ৫ পাবে, বৃত্তি পাবে। আমাদের ছেলেমেয়ে না পেলে খারাপ লাগবে না?
আকলিমা বলেন, তিন সন্তানের লেখাপড়া, একের পর এক পরীক্ষার কারণে আমরা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোথাও ঠিকমতো বেড়াতে যেতেও পারি না। বছরের পর বছর চলে যায়, ছেলেমেয়েদের নিয়ে নানার বাড়ি, দাদার বাড়ি যেতে পারি না। কখনো গেলেও দু-এক দিনের বেশি থাকতে পারি না। ছুটে আসতে হয় সন্তানের কাস, পরীক্ষার কারণে। এমনকি ঠিকমতো নিজের ঘরসংসারও দেখাশুনা করতে পারি না। বুয়াই সব দেখাশুনা করে। আমাদের জীবন হয়ে গেছে রোবটের মতো। সন্তানের চেয়ে আমাকেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় তাদের পড়াশোনা নিয়ে। তারপর খরচের বিষয় তো আছেই। আকলিমা জানান, এত ঘন ঘন পরীক্ষা না থাকলে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম।
রেহানা (আসল নাম নয়) জানান, তার এক মেয়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। তিনি তার মেয়েকে বাংলাসহ সব বিষয়ে কোচিং করান। একটি নম্বর বেশি পাওয়ার জন্যও তিনি তার মেয়ের জন্য যত কষ্ট এবং টাকা খরচ দরকার তা করতে রাজি আছেন। সে জন্য যেখানে যে স্যারের ভালো নোট, শিট পাওয়া যায় তা তিনি সংগ্রহ করেন। কোনো কোনো বিষয়ে দুইজন শিক্ষকের কাছেও কোচিং করান। কোনো অবস্থাতেই মেয়ের গোল্ডেন জিপিএ ৫ মিস করা যাবে না। স্কুল আর কোচিং-প্রাইভেটÑ এই হলো তার মেয়ের জীবন। বাসায় যতক্ষণ থাকে খাওয়া এবং ঘুমে কেটে যায়। পড়াশোনা মূলত কোচিং-প্রাইভেটেই করে থাকে। রেহানা জানান, তার আরেক ছেলে একাদশ শ্রেণীতে এবং আরেক ছেলে মেডিক্যালে পড়ে। একাদশ শ্রেণীতে পড়–য়া ছেলের পেছনে সময় দিতে হয়। আকলিমার মতো রেহানাও জানান, পরিস্থিতির কারণে তিনি ছেলেমেয়ে নিয়ে এ ধরনের বিরামহীন প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য হয়েছেন।
আকলিমা ও রেহানার মতো অসংখ্য অভিভাবকের একই অবস্থা। অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, স্কুলে যা পড়ায় তার ওপর তো পুরোপুরি নির্ভর করা যায় না। শুধু স্কুলের পড়ার ওপর নির্ভর করলে ছেলেমেয়ে হয়তো পাস করবে কিন্তু ভালো রেজাল্ট তো করতে পারবে না। তাই ভালো ফলের জন্য বাধ্য হয়েই তারা কোচিং-প্রাইভেটের দিকে ঝোঁকেন।
পরীক্ষা ঘিরে অসুস্থ প্রতিযোগিতা : এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার সাথে প্রাইমারিতে পিএসসি এবং অষ্টম শ্রেণী শেষে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা চালুর কারণে শুরু হয়েছে নানামুখী অসুস্থ প্রতিযোগিতা। পিএসসি এবং জেএসসি, জেডিসি পাবলিক পরীক্ষায় রূপ নেয়ায় একে কেন্দ্র করে অভিভাবকদের শুরু হয়েছে ভালো ফলের তীব্র প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে একধরনের ভীতি ও চাপ।
রেহানার মতো অনেক অভিভাবক রয়েছেন, যারা প্রায় সব বিষয়ে কোচিং করাচ্ছেন সন্তানদের। প্রাইমারি শিক্ষার্থীদের যারা কোনো দিন সন্তানদের প্রাইভেট ও কোচিং করানোর কথা চিন্তা করেননি তারাও এখন অস্থির হয়ে ছুটছেন প্রাইভেট পড়ানোর পেছনে।
পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রাইভেট, কোচিং ব্যবসার সাথে সাথে শুরু হয়েছে জমজমাট গাইড ব্যবসা। এ পরীক্ষা চালু হওয়ার পর বিভিন্ন সময় বাংলাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর জন্য কমপক্ষে ৫০ ধরনের সহায়িকা রয়েছে বিভিন্ন দোকানে। ব্যাপক বেচাকেনা হচ্ছে গাইড নামের এসব সহায়িকা পুস্তক। দোকানিরা জানিয়েছেন, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর এমন কোনো শিক্ষার্থী নেই, যারা কোনো-না-কোনো গাইড কিনছে।
অন্য দিকে পিএসসি, জেএসসি পরীক্ষার পক্ষে অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক। তাদের মতে এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বেড়েছে। সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।
মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক রোখসানা জানান, ঘন ঘন পরীক্ষায় কষ্ট হচ্ছে সত্যি তবে ছেলেমেয়েরা এখন পড়ছে বেশি। না পড়ে তো কোনো উপায় নেই। সবার মধ্যে পড়ার প্রতিযোগিতা চলছে। মা-বাবাও সন্তানের বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন এখন।
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মুগদা দিবা শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক দেওয়ান বাকিউল্লাহ সমাপনী পরীক্ষা সমর্থন করে বলেন, বৃত্তি পরীক্ষাটা আলাদা করে দিতে হচ্ছে না এটা একটা ভালো দিক। তিনি বলেন, তবে শিশুদের ওপর যাতে বেশি চাপ না পড়ে সে জন্য তাদের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী পড়ার বিষয় কমিয়ে আনা উচিত। বর্তমানে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের ১২-১৩টি করে বিষয় পড়তে হয়। কোনোটায় ৫০ নম্বর, কোনোটায় ১০ নম্বর। আবার রয়েছে সৃজনশীলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন এবং পরীক্ষা পদ্ধতি। তা ছাড়া অঙ্ক নিয়ে অনেকের মধ্যে রয়েছে ভীতি। এত কিছুর সাথে অনেক সময় কুলিয়ে উঠতে পারে না শিক্ষার্থীরা।
তবে ঘন ঘন পাবলিক পরীক্ষার কারণে নানামুখী অসুস্থ প্রতিযোগিতা, কোচিং-প্রাইভেট এবং মডেল টেস্টের বাণিজ্যসহ এখন প্রতি বছর প্রশ্নফাঁসের কারণে অনেকে এ পরীক্ষা বাতিলের পক্ষে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর এমিরেটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এত ঘন ঘন শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় বসানো ঠিক নয়। এসএসসি এবং এইচএসসি ঠিক আছে। কিন্তু পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষা নেয়া উচিত নয়।
একই মত পোষণ করেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, সমাপনী এবং জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করা উচিত। তা ছাড়া স্কুলেও বছরে দু’টির বেশি পরীক্ষা থাকা উচিত নয়। এত পরীক্ষা নিলে ছেলেমেয়েদের সুস্থ মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তাদের ওপর বেশি চাপ পড়ে। পড়াশোনার পাশপাশি তারা যাতে খেলাধুলা, বেড়ানো এবং গল্পের বই পড়তে পারে সে সুযোগ দেয়া উচিত। কিন্তু এখন পাবলিক পরীক্ষার চাপে তারা দিশেহারা। শুধু পড়া আর পড়া। এর বাইরে কোনো কিছু ভাবার তো কোনো সুযোগ নেই তাদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেন, এত অল্প বয়সে শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি করা কোনো অবস্থাতেই সমর্থন করা যায় না। শিশুদের উচিত যতটা সম্ভব ফ্রি রাখা। তাতে তাদের চিন্তার বিকাশ হবে। তার বদলে তাদেরকে ছোটবেলা থেকেই তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে প্রবেশ করালে তারা নিজস্বতা বিকাশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।
অভিভাক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, যত বেশি পরীক্ষা তত বেশি কোচিং-প্রাইভেট এবং মডেল টেস্ট বাণিজ্য। সমাপনী পরীক্ষা অবশ্যই বাতিল করা উচিত।