সিসি ডেস্ক: আগামীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধরন ও প্রকৃতি নিয়ে ২০ দলীয় জোটের প্রধান বিএনপি ও অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি ধীরে চলো নীতিতে আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে চাইলেও জামায়াত চাইছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কঠোর আন্দোলন। সম্প্রতি ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক এবং সর্বশেষ জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে এ মতপার্থক্য দেখা গেছে বলে সূত্র জানায়। সূত্র আরো জানায়, জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলন কৌশল নিয়ে জোটের অন্য অনেক শরিক দল সহমত প্রকাশ করলেও বিএনপির মনোভাবের কারণে তা প্রকাশ করছেন না। তারা মনে করছেন, শর্ট টাইম রাজপথের কঠোর আন্দোলন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে সরকার পতন সম্ভব নয়। এছাড়া লংটাইম আন্দোলনের জন্য রাজপথের নেতাকর্মীদের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনাও বেশি। তাই পরিকল্পনামাফিক শর্টটাইমের কঠিন আন্দোলন চাইছেন তারা। পক্ষান্তরে বিএনপি মনে করছে, আগামীতে আন্দোলনকে ধাপে ধাপে কঠিন করার পাশাপাশি সরকারকে দেশি-বিদেশি চাপের মুখে রাখতে পারলে একসময় তারা আমাদের দাবি মানতে বাধ্য হবে। এছাড়া সরাসরি কঠিন আন্দোলনে গেলে সরকার ওই আন্দোলনকে দমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড়সহ সমূহ ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া আন্দোলনের সহিংসতার দায়ভারও ২০ দলীয় জোটের ওপর ফেলবে। ফলে দেশি-বিদেশি বন্ধুমহল বিরূপ মনোভাব নিতে পারে বলেও অতি সাবধানে তারা আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে চাইছেন।
জোট সূত্র জানায়, গত ২২ নভেম্বর ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ডা. রেদোয়ান উল্লাহ শাহেদী মুক্ত আলোচনায় বলেন, লংটার্ম আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া কঠিন। লংটার্মে সরকার পতনের আন্দোলন হয় না। শর্টটার্মে সরকার পতনের আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবরোধের মতো কর্মসূচি দিলেই ভালো। কারণ আমরা অবরোধ ডাকলে তো সরকার নিজেই সারাদেশ অবরোধ করে ফেলে আর এ ধরনের কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে দিলে সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে।
একইভাবে জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকেও জামায়াতের পক্ষ থেকে আন্দোলনে আরো বেশি ভূমিকার রাখার কথা বলা হয়। জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিক্ষোভ সভা সেমিনার করে সরকার পতন সম্ভব নয়। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়লেই একটা হরতাল দিয়ে সরকার পতন হবে না। একটা টার্গেট নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সরকারের পতন ঘটাতে হলে সিরিয়াস কর্মসূচি হাতে নিয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে মাঠে নেমে পড়তে হবে।
অপরদিকে জোটের অন্যতম শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী আগামী আন্দোলনের কৌশল বিষয়ে বলেন, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কিংবা চলো চলো ঢাকা চলোর মতো কর্মসূচি দিলে সরকারের পক্ষ থেকেই পুরো ঢাকাকে অবরুদ্ধ করে ফেলবে। এই অজুহাতে এবং কর্মসূচি পালনে বাধার প্রতিবাদে জোটের পক্ষ থেকেও লাগাতার অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়া হতে পারে। এভাবে কয়েকদিন চলতে থাকলে সরকার এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়বে।
তবে আন্দোলনে সক্রিয়তা নিয়ে জোটের শরিক জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে এখনো সন্দেহের মধ্যে রয়েছে বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল। জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকে এ বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
সূত্র জানায়, বৈঠকে খেলাফত মজলিশের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ ইসাহাক বলেন, আমার বয়স হয়েছে। যে কোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। তাই জীবন নিয়ে আমি ভাবি না। স্বৈরাচারী সরকার হটানোর আন্দোলনে আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত আছি। তিনি খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, কারা আন্দোলনে এলো আর কারা এলো না, এটা বিষয় নয়। কারণ স্রোতের বিপরীতে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। তারা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এ সময় তার কথা শেষ হতে না হতেই খালেদা জিয়া বলেন, কিন্তু জামায়াতের সর্বশেষ দুটি হরতালে নেতাকর্মীদের মাঠে দেখা যায়নি।
তাৎক্ষণিক বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ হাসতে হাসতে বলেন, শাহেদী ভাই (জামায়াত নেতা) আপনারা কি সরকারের সঙ্গে কথা বলেই হরতাল দিয়েছিলেন? এ সময় বৈঠকজুড়ে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
জামায়াত সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের এক বছর পূর্তি অনাড়ম্বরভাবে পালন করতে পারলে আগামীতে আন্দোলন কঠিন হয়ে উঠবে। জনগণও আমাদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। ফলে তারা একসময়ে মন্দের ভালো হিসেবে এই সরকারকেই গ্রহণ করবে বলে মনে করছে তাদের সংগঠন। এছাড়া বিগত দিনের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে সূত্র জানায়, লংটার্ম আন্দোলনের জন্য যে ধৈর্য ও সাহস দরকার তা আমাদের অনেক দলেরই নেই। এমনিতেই আন্দোলন চলাকালে কারো খোঁজ পর্যন্ত থাকে না। নিজের মোবাইল ফোন পর্যন্ত বন্ধ করে কর্মীদের বন্দুকের সামনে রেখে পালিয়ে বেড়ান। এ ধরনের নেতাদের সংখ্যাই জোটের মধ্যে বেশি। তাহলে লংটার্ম আন্দোলনে তারা (নেতাকর্মীরা) কেন ঝুঁকি নেবে।
জামায়াত-শিবিরের অপর একটি সূত্র জানায়, দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনেকেরই গলায় ফাঁসির রশি ঝুলছে। এ অবস্থায় দলের নেতাদের বাঁচাতে এবং দলকে পুনর্গঠন করতে এ সরকারের পরিবর্তনের বিকল্প নেই তাদের। এ অবস্থায় তারা যে কোনো ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। এ জন্য তারা নিজেদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছেন। কিন্তু বিএনপি আন্দোলনে না ঝুঁকলে তারা এককভাবে কোনো রিস্ক নেবে না আবার একইভাবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সামনেও জেলের ভয় আছে। সরকার সুযোগ পেলেই বিরোধী শিবিরে আঘাত করবে। সরকারের ওপর দেশের জনগণের আর আস্থা নেই। জোটের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। এ জন্যই তারা (জামায়াত) সরকারকে কোনো সুযোগ দিতে চায় না।
এদিকে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বৈঠকে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালেই কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন। এ জন্য দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হরতাল দিয়ে লাগাতার কর্মসূচি পালন শুরু হবে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে যাওয়ারও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কবে দাম বাড়াবে আর কবে আন্দোলন হবে তা নিয়ে জোটের নেতাদের মধ্যেই একধরনের সমালোচনা আর হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। দলের মধ্যেও নেতাকর্মীদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বিএনপির এসব কর্মসূচিকে কিচেন (রান্নাঘর) মার্কা কর্মসূচি বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। তারা জানান, সরকার যদি জ্বালানির দাম না বাড়ায় তাহলে ২০ দলীয় জোটও আন্দোলনে যাবে না। এটা যদি বিএনপির কৌশল হয়ে থাকে তাহলে সরকারও তাদের স্বীকৃতির জন্য এই দায়িত্ব নেবে না। মোট কথা, বিএনপি আসলে কোন প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে চাচ্ছে তা তারা নিজেরাও জানে না।
বিএনপির এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে জোট নেতারা ৫ জানুয়ারিকে ভোট কারচুপি দিবস আখ্যায়িত করে সাদামাটা কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। একাধিক বৈঠক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনটাকে আওয়ামী লীগ ব্যাপকভাবে পালন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদেরও একটা কিছু করা দরকার। সে বিষয়ে অনেকেই তাদের মতামত তুলে ধরেছেন। উপস্থিত প্রায় ১০ মহাসচিব ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দিনটাকে ভোট কারচুপি দিবস হিসেবে পালনের বিষয়টি তুলে ধরেন অথবা অন্য কোনো নামে দিবসটি ব্যাপকভাবে পালনের বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন। তবে এ ক্ষেত্রেও জামায়াত ৫ জানুয়ারিকে টার্গেট করে ডিসেম্বরের শেষে দিক থেকেই আন্দোলন শুরুর পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
তবে এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। দলের অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া জানান, আমি ওইসব বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম না বলে আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না। যারা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করারও পরামর্শ দেন তিনি।