• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫২ অপরাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

ওরা শহীদ জায়া!

rajshahi-spacail-Durgapur-Libaretion01-e1418660868167সিসি ডেস্ক: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার যুগীশো পালশা গ্রাম। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ওই গ্রামের হিন্দু পল্লী থেকে স্থানীয় রাজাকারের সহযোহিতায় পাক বাহিনীর সদস্যরা ৪২ জনকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে। বিধবা হয় ৪২ নারী। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সময় অনেক পেরিয়েছে। অনেক কিছু বদলে গেছে। কিন্তু বদলায়নি ওই ৪২ পরিবারের ভাগ্য।

যুদ্ধে বাড়ির অভিভাবকদের হারিয়ে পরিবারগুলো হয়ে নিঃসঙ্গ। তারা যে কূল হারিয়েছে স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে তারা আর তা খুঁজে পায়নি। বিধবা ৪২ নারীর মধ্যে বেঁচে থাকা ৩৫ জনের সবাই ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে।

সোমবার সকাল সাড়ে ৬টা। শীতের সকালে চারিদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা। যুগীশো গ্রামের হিন্দু পল্লীর ৭ থেকে ৮ জন নারীর দল সাদা কাপড় পরে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। সবার বয়স ৬০ এর উপরে। কাছে গিয়ে জানা গেল তারা সবাই ভিক্ষা করার জন্য বের হয়েছেন।

মঙ্গলকার সকালে যখন বিজয়ের ৪৪ বছরের সূর্য উঠবে, দেশে মাতবে বিজয়ের আনন্দে তখন তারা ভাতের চিন্তায় ভিক্ষার থালা নিয়ে নামবে রাস্তায়।

দলের একজনের নাম নিয়তী বালা দাস। বয়স ৮০ এর কাছাকাছি। এই বয়সে ভিক্ষা করার কারণ জানতে চাইলে তিনি  বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় তার স্বামী বিভারণ চন্দ্র প্রামাণিককে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে পাক-হানাদার বাহিনী। সে থেকেই তাদের পরিবারে শনি নেমে আসে। পরিবারের ঘানি টানতে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির পথই বেছে নিতে হয়েছে তাকে।

নিয়তী বালা দাসের চামড়া জড়ানো চোখের কোণে জল লক্ষ্য করা গেল। কিছুক্ষণ চেষ্টা করলেন কান্না থামানোর। কিন্তু পারলেন না। অবশেষে কাঁদতে লাগালেন। তিনি মাঠের মধ্যেই মাটিতে বসে পড়েন। তার সঙ্গী ছিলেন শহীদ শিতল দাসের স্ত্রী পঞ্চমী দাস (৭২), শহীদ নগেন চন্দ্র দাসের স্ত্রী সুধাশু বালা (৭০), শহীদ ঘেতন চন্দ্র দাসের স্ত্রী সুশীলা বালা (৭১), শহীদ বিভারণ চন্দ্র দাসের স্ত্রী নিয়তী বালা (৬৮), শহীদ নিবারণ চন্দ্র দাসের স্ত্রী সুন্দরী দাস (৭০), শহীদ শ্রীকান্ত দাসের স্ত্রী তরু বালা (৭২), শহীদ যোগেন্দ্র নাথের স্ত্রী অনন্ত বালা (৬৯), শহীদ যদুনাথ চন্দ্র দাসের স্ত্রী প্রমীলা দেবী (৬৬) ও নগেন্দ্র নাথ কর্মকারের স্ত্রী যমুনা বালা কর্মকার। তারাও নিয়তী বালার সঙ্গে বসে পড়লেন।

নিয়তী বালা দাস ১৯৭১ সালের কথা বলতে না পারলেও বাংলা সালের হিসেবে ১৩৭৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর সে দিনের সে নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা স্মরণে রেখেছেন। ওইদিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, সেদিনের কথা কি আর ভুলা যায় ক্যা। দিনটি আছিল অবিবার (রবিবার)। সুর্য মাথার ওপরে উঠিছে এ সময় দুইটি গাড়িতে পাক বাহিনী গায়ে ঢুকি পড়ে। পাক বাহিনীর গাড়িতে সেদিন ছিল বখতিয়ারপুর গাঁয়ের পিচ কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সরকার। সেদিন আজিজ সরকারের নির্দেশে আমাদের গাঁয়ের মানুষকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় বাঁশ ঝাড়ের কাছে।

নিয়তী বালা বলেন, বাঁশ ঝাড়ের কাছে নিয়ে গিয়ে মাটির দিকে মুখ করে শুইয়ে দেয়া হয় ওই ৪২ জনকে। এরপরে চলে বুট আর বেয়োনেট দিয়ে নির্যাতন। এভাবে কিছুক্ষণ নির্যাতন করার পরে ব্রাশফায়ার করে ৪২ জনকেই হত্যা করা হয়। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাক বাহিনী চলে গেলেও বখতিয়ারপুর গ্রামের পিচ কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সরকারের নেতৃত্বে সেদিন সমস্ত হিন্দু পল্লীতে আগুন ধরিয়ে লুটপাট চালানো হয়। যারা বেঁচে ছিলো তারা প্রাণ বাঁচাতে ওই রাতেই ভারতে পালিয়ে যায়।

ঘটনার দিনের ভয়াবহতা বর্ণনা দিতে গিয়ে তারা জানান, যতীন নাথ নামে তার এক জন আত্মীয় আছে। তার ৯ বছরের এক ছেলে ছিল। সেই ছেলেকে রেখে যতীন্দ্র নাথ কিছুতেই পাক বাহিনীর সঙ্গে যেতে চাইছিলেন না। ছেলেটাও যতীনের লুঙ্গি টেনে ধরছিলেন পেছন থেকে। এ দৃশ্য দেখে পাক বাহিনীর কয়েকজন সদস্য রেগে গিয়ে ৯ বছর বয়সী ছেলেকে গুলি করে যতীনকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যান।

স্বাধীনতার পরে তারা দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু এসে দেখা যায় কোনো কিছুই তাদের নেই। বাড়ি-ঘর সব খোলা মাঠ হয়ে গেছে। হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল যা ছিলো সব লুটপাট করা হয়েছে। ফসলী জমি গুলো দখল হয়ে গেছে। কোনো রকমে মাথা গোজার ঠাঁই তৈরি করে তখন থেকে ভিক্ষা করে সংসার পার করে আসতে হচ্ছে তাদের।

শহীদ শহীদ শিতল দাসের স্ত্রী পঞ্চমী দাস অভিযোগ করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বামীদের এভাবে হত্যা করা হলেও মেলেনি শহীদের স্বীকৃতি। এমনকি যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন ধারনের জন্য দেয়া হয়নি সরকারি কোনো অনুদান। তাই বাধ্য হয়ে জীবন জীবিকার তাগিদে ও পরিবারের সদস্যদের মুখে দুই বেলা দুই মুঠো ভাত তুলে দিতেই ভিক্ষা করছি।

তবে এ শেষ বয়সে এসে আর ভিক্ষাবৃত্তি করতে চান না নিয়তী বালা কিংবা পঞ্চমী দাসরা। তাদের দাবি বর্তমান সরকার তাদের জন্য না হলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবেন এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

বাংলামেইল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ