সিসি নিউজ : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় হলেও নীলফামারীর রেলওয়ের শহর সৈয়দপুর হানাদার মুক্ত হয় আরও ২দিন পর ১৮ ডিসেম্বর। গোটা দেশ হানাদার মুক্ত হওয়ার পরও অবাঙ্গালীদের অবরুদ্ধতার কারণে সৈয়দপুরে কোন মুক্তিযোদ্ধা প্রবেশ করতে পারেনি। এইদিনে নীলফামারী জেলার সীমান্ত এলাকা হিমকুমারী ক্যাম্প থেকে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী যৌথভাবে প্রবেশ করে সৈয়দপুর শহরে। সেই সাথে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে ঢুকে পড়ে শহরে কয়েক হাজার লোক। উড়ানো হয় জাতীয় পতাকা শহরের পৌরসভা ভবনে ও অস্থায়ী আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে।
স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও সৈয়দপুরে কতজন শহীদ হয়েছেন এর কোন সঠিক হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন সূত্র মতে, এই সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজার বলে ধারনা করা হয়। ৭১ এর ১৩ জুন শহরের গোলাহাট এলাকায় নির্মম ভাবে হত্যা করা ৪৪৭ জন নারী পুরুষকে। স্বাধীনতার পর থেকে সৈয়দপুরের আপামর মানুষ নির্মম হত্যাকান্ডের স্বাক্ষী গোলাহাট বধ্যভুমিতে স্মৃতিস্তম্ভ গড়ার দাবি করে আসছিল। স্বাধীন দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও চিহ্নিত এ বধ্যভুমিতে নির্মান করা হয়নি কোন স্মৃতিস্তম্ভ। চলতি বছর ওইদিনে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শওকত চৌধুরীর নিজ উদ্যোগে সেখানে নির্মাণ করছেন শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। ওই স্মৃতিস্তম্ভ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব নিজু কুমার আগরওয়ালা সিসি নিউজকে জানান, রেললাইনের পাশে নির্মাণ হচ্ছে স্মৃতিস্তম্ভ। ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। দ্রুত গতিতে কাজ চলছে। আগামী ফেব্রুয়ারী মাসের মধ্যে এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে।
শহরের একমাত্র স্টেডিয়াম অভ্যন্তরে ওই সময়ে অবাঙ্গালীদের বসবাসের কারণে সেখানেই বিভিন্ন জায়গা হতে বাঙ্গালীদের হত্যা করে মাটি চাপা দেওয়া হয়। অদ্যাবধি ওই স্থানটিকে চিহ্নিত করা হয়নি এবং নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতিস্তম্ভ। আজকের প্রজন্ম ভাল করে জানার আগেই সৈয়দপুর স্টেডিয়াম গণহত্যার স্থানটি মুছে যাচ্ছে স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে। সৈয়দপুর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার একরামুল হক বলেন, ধারনা করা হয়েছিল বর্তমান সরকারের সময়ে এ সকল গণহত্যার স্থান চিহ্নিত করে স্মৃতিসৌধ বা বধ্যভুমি নির্মাণ করা হবে। কিন্তু তা আজও হয়নি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
অপরদিকে ৭১ এর ২৬ মার্চ স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ লড়াই শুরু হলেও সৈয়দপুরে শুরু হয় এরও ৩দিন আগে। সেদিন স্থানীয় সেনানিবাসের পাক সেনারাসহ তাদেরই দোসর অবাঙ্গালীদের একটি অংশ ঝাপিয়ে পড়ে শহরের নিরীহ বাঙ্গালীদের ওপর। শহরের সংখ্যালঘু বাঙ্গালীরা দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যায়। আশ্রয় নেয় পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে। আর যারা পালাতে পারেননি তাদের অনেককেই করা হয়েছে হত্যা কিংবা বন্দী। এই শহরের প্রথম শহীদ হন শহরের পাশ্ববর্তী চিরিরবন্দর উপজেলার আলোকডিহি ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান মাহতাব বেগ। তিনি শহরের আটকেপড়া বাঙ্গালীদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসায় গুলি করে তাকে হত্যা করা হয় ২৩ মার্চ ভোরে। সেই থেকে ২-৩ দিন ধরে চলে গ্রামবাসীদের সাথে পাক সেনা ও তাদের সহযোগি অবাঙ্গালীদের লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাক সেনারা ঢুকে পড়ে গ্রামগুলোতে। তারা একটির পর একটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ২৪ মার্চ তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) ডা. জিকরুল হক, ডা. শামসুল হক, ডা. বদিউজ্জামান, ডা. আমিনুল হক. ডা. ইয়াকুব আলী ও তুলশীরাম আগারওয়ালাসহ গ্রেফতার করে রাখা হয় স্থানীয় সেনানিবাসে। সেখানে ৩ সপ্তাহ ধরে নির্যাতন চালানো হয় তাদের উপর। অত:পর ১২ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাস সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে অবস্থিত নিসবতগঞ্জ বালারখাল নামক স্থানে তাদেরকে হত্যা করা হয়। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কমলা প্রসাদ জীবিতকালীন সময়ে জানিয়েছিলেন, ওই বধ্যভুমিতে সেদিন একসাথে সেখানে হত্যা করা হয় প্রায় ৩০০ জনকে। এরা ছিলেন সবাই সৈয়দপুরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। সৈয়দপুর শহরের প্রবেশ মুখগুলোর স্থানীয় অবাঙ্গালীরা নাম রেখেছিল খরচা খাতা। অর্থ্যাৎ ১,২ ও ৩ নং গেট। প্রতিদিন কোন গেটে কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল তখন তা লিপিবদ্ধ করা হতো। এদিকে যুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়ে সৈয়দপুর শহরে জল্লাদখানায় পরিণত হয়েছিল। রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক কর্মচারীদের বয়লার শপে জীবন্ত নিক্ষেপ করে প্রায় ৩০০ বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়েছিল। গত বছর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ডিএস মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরীর আন্তরিক সহযোগিতায় ও কারখানা শ্রমিকদের স্বেচ্ছাশ্রমে রেলের পাত দিয়ে ওইসব শহীদদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে অদম্য স্বাধীনতা। নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে ওই স্মৃতি সৌধে গত বছর প্রথম পালিত হলো বিজয় দিবস। ৭১ সেই উত্তাল সময়ে সৈয়দপুরে সবচেয়ে বেশি হত্যাকান্ড ঘটে ১২ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে। সে সময় তড়িঘড়ি করে সৈয়দপুর বিমানবন্দরটি তৈরি করতে পাক সেনারা স্থানীয় বন্দি বাঙ্গালীদের মাটি ভরাট কাজে ব্যবহার করতো। এক্ষেত্রে কেউ আপত্তি করলে তার ভাগ্যে নেমে আসতো নির্মম নির্যাতন। বন্দী বাঙ্গালীদের শ্রমে নির্মিত বিমানবন্দর ব্যবহার করে পাকিস্তানী হানাদাররা যুদ্ধ বিমান চালিয়ে বাঙ্গালীদেরকেই হত্যা করে। বিমানবন্দর নির্মাণে বন্দী বাঙ্গালীদের মধ্যে অন্যতম হলেন কাশেম আলী মল্লিক, ফকর উদ্দিন, আব্দুস সাত্তার, আব্দুর রশিদ প্রমুখ। এরপর ১৩ জুন কৌশলে মাড়োয়ারীদের রেলষ্টেশনে একত্রিত করে ৩ভাগে ভাগ করেছিলেন। বৃদ্ধ-যুবকদের পৃথক করে নারীদের নিয়ে যাওয়া হয় শহরের গোলাহাট আস্তানা-ই-হক (আস্তানা হক বিল্ডিং নামে পরিচিত)। সেখানে আটক নারীদের পাক সেনা ও তাদের দোসররা গণধর্ষন চালায়। স্বাধীনতার পর ধর্ষিতা সেই নারীদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য মতে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সৈয়দপুরের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বাঙ্গালীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। অসংখ্য মা-বোনকে তার্দে ইজ্জত হারাতে হয়েছে। অগণিত বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এসব শহীদদের স্মরণে স্বাধীনতার অনেক পরে ২০১১ সালে শহরের বিমানবন্দর সড়কের ডাকবাংলোর সামনে কেন্দ্রীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু এরপরেও ভিত্তিপ্রস্তর করেই থমকে যায় এর নির্মাণ কাজ। চলতি বছরে এটি নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয় বিরোধী দলীয় হুইপ আলহাজ্ব শওকত চৌধুরী এমপি। স্মৃতিসৌধ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন খোকন সিসি নিউজকে জানান, ইতোমধ্যে নির্মাণ কাজের এক-চতুর্থাংশ শেষ হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা। যার অধিকাংশ অর্থ যোগান দিয়েছেন সংসদ সদস্য শওকত চৌধুরী।
অপরদিকে ২০০১ সালে শহরের জিআরপি মোড়ে শহীদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতি অম্লান। সেখানেও শহীদদের পুরো তালিকা নেই। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের গৌরবান্বিত ইতিহাস দিন দিন ধূসর হয়ে যাচ্ছে।