• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

জিহাদ মরিয়া প্রমাণ করিল বাবা নির্দোষ

zihad-father_62749|| তাপস রায় ||
‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা ব্যাটাই চোর’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতার গিন্নির মতো এ দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনাকারী কর্তাব্যক্তিরা সম্ভবত সন্দেহ রোগে ভুগছেন। সন্দেহ বড় মারাত্মক মানসিক রোগ, এ রোগ সংক্রামকও বটে! নইলে দেশে বড় কোনো ঘটনা ঘটলেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা সামাল দিতে বিষয়টিকে লঘু ঘটনা প্রমাণের জন্য উঠেপড়ে লাগবেন কেন? কেনই বা তারা অন্যের ঘারে দোষ চাপাতে ব্যস্ত হয়ে উঠবেন? আর কেনই বা তাদের ঠোঁটের ডগায় ঘটনার মনগড়া ব্যাখ্যা তৈরি হয়েই থাকবে? রানা প্লাজা, পিনাক-৬ ডুবে যাওয়া, সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়া এবং অতিসম্প্রতি শিশু জিহাদের ক্ষেত্রে আমরা যা দেখলাম তাতে এ কথার সাক্ষ্য মেলে। রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পেছনে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের যোগসূত্র আবিষ্কার করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার প্রয়াস পেয়েছিলেন। যদিও সেই তেতো শরবত তার দলকে এখনও গিলতে হচ্ছে।
শ্যালা নদীতে যখন তেলবাহী জাহাজ ডুবে গেল, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল এক ব্যক্তি বলে দিলেন, এতে সুন্দরবনের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। বলিহারি তার দিব্যদৃষ্টি! একইভাবে জিহাদের মর্মন্তুদ এ ঘটনাটিকেও তারা সন্দেহের চোখে দেখলেন। এক পর্যায়ে তারা বলেই ফেললেন, ‘আমরা নিশ্চিত হয়েছি, পাইপের ভেতর শিশুর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই উদ্ধারকাজ স্থগিত ঘোষণা করা হলো।’ শুধু তাই নয়, জিহাদের বাবাকে তারা থানায় ধরে নিয়ে গেলেন এবং তাকেই জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি আপনার ছেলেকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন? ভাবা যায়! এ ঘটনার পর থেকে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, ‘পিনাক-৬’ ডুবে যাওয়ার দৃশ্য যদি কেউ মুঠোফোনে ক্যামেরাবন্দি না করতেন, লঞ্চটি যদি রাতের আঁধারে ডুবে যেত তাহলে কর্তৃপক্ষের জন্য ঘটনা সামাল দেয়া অনেক সহজ হতো। তারা ডুবে যাওয়া প্রাণহীন মানুষগুলোর জীবিত স্বজনদের প্রাণের গভীরের আর্তনাদ ধামাচাপা দিতে ঠাস্ করে বলে দিতে পারতেন, পিনাক-৬ তো ডোবেই নি!
ভারতের দক্ষিণ হরিয়ানায় ২০০৬ সালের ২৩ জুলাই মাটির নিচে ৬০ ফুট গভীর পাইপ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রিন্স নামের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে। ভারতীয় সেনারা টানা ৫০ ঘণ্টার অভিযানে কূপ খনন করে প্রিন্সকে উদ্ধার করে। এ ঘটনা সে সময় পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিল। জিহাদের ঘটনাতেও দেশব্যাপী আলোড়ন তৈরি হয়। দেশবাসীর হৃদয়ে জিহাদের জন্য তৈরি হয় গভীর উদ্বেগ, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া উৎকণ্ঠা এবং প্রার্থনা। পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ে গুজব। দুঃখজনক হলেও সত্য এই গুজব তাদের তৈরি যারা রাষ্ট্রের হয়ে জিহাদকে উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন। তাদের বিশ্বাস এতটাই প্রবল ছিল যে, জিহাদের নিখোঁজের এই ঘটনাটি তাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে! সন্দেহ মেটাতে পুলিশ এক পর্যায়ে জিহাদের বাবা নাসির ফকিরকে থানায় নিয়ে যায়। রাতভর সেখানেই তাকে আটক রাখা হয়। হায়! বাবার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতেই বুঝি জিহাদ শেষবারের মতো বাধ্য হলো আমাদের মুখ দেখাতে; কিন্তু ততক্ষণে যে সমগ্র জাতি ব্যর্থতার গ্লানিতে মুখ ঢেকেছে লজ্জায়।
আর কত লজ্জা, আর কত ব্যর্থতা, আর কত উদ্ভট বিবৃতি, আর কত অপরিনামদর্শিতার উদাহরণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা তৈরি করবেন? বলা হচ্ছে শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ। অনেক ক্ষেত্রে কথাটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এই একুশ শতকে এসেও কী আমাদের পাতিল, বালতি, কড়াই দিয়ে ফোমের সাহায্যে শ্যালা নদী থেকে তেল তুলতে হবে? উদ্ধার না হোক অন্তত পাইপের মধ্যে জিহাদের খোঁজ পেতে চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে? অথচ ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণার দশ মিনিট পরেই সাধারণ মানুষের চেষ্টায় সেই পাইপ থেকেই জিহাদকে উদ্ধার করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো, এ ঘটনায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা যারা ঘটনাটিকে গুজব বলেছিলেন তারা কী লজ্জা পাচ্ছেন না? আমরা কিন্তু ভীষণ লজ্জা পাচ্ছি। আমাদের এই লজ্জা বহুগুণ বেড়ে যায় যখন শুনতে পাই ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এবং ঢাকা ওয়াসার কর্তা ব্যক্তিরা বলেন, এ ধরনের উদ্ধার কাজের জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। এ ধরনের দুর্ঘটনায় কাজের অভিজ্ঞতা এই প্রথম! কথা শুনে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারি না।
ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বলে একটা বিষয় আছে। আমাদের দেশে বিষয়টি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষিত জনবল পেতে আমাদের অন্তত আরো দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। তাহলে ‘প্রশিক্ষণ’ বলে যে শব্দটি আছে তার কী হবে? আমরা কী এই দশ বছর হাতুড়ে লোকবল, অনাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়েই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মোকাবেলা করব? আর এভাবে বাড়তেই থাকবে মৃত্যুর মিছিল?
ক্ষমা করো জিহাদ। তোমার মৃত্যুর কারণকে যারা গুজব বলেছিল, যারা পাইপের ভেতরে তুমি নেই বলে এই অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল রাষ্ট্র তাদের কতটা অপরাধী ভাববে জানি না, কিন্তু আমরা এ ঘটনা স্মরণ রাখব। তুমি না হয় ভুলেই যেও। কিন্তু জানি অনেক চেষ্টা করেও তুমি ভুলতে পারবে না সেইসব মানুষের কথা যারা এ দেশে ‘সাধারণ’ বলে আখ্যায়িত হয়। এই মানুষগুলোই দেশের যে কোনো বিপদে বুক আগলে দাঁড়ায়, এগিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত সেইসব সাধারণ মানুষদেরই উদ্যোগে আমরা তোমাকে পেলাম। নইলে এ হতো মানবতার চরম অপমান। সেই অপমানের হাত থেকে গুটিকয় তরুণ আমাদের বাঁচিয়েছে, তুমি যেমন বাঁচিয়েছ পুলিশের হাত থেকে তোমার বাবাকে।
শুনেছি সেই পাইপের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভেবে আঁতকে উঠতে হয় দেশজুড়ে এমন আর কত মুখ মৃত্যুর জন্য হাঁ করে রয়েছে। সেগুলো ঢাকবে কে? চতুর লোকেরা বলেন, একটি মিথ্যা বারবার বললে নাকি সেটা সত্য হয়ে যায়। কিন্তু বহু আগেই জ্ঞানীরা বলে গেছেন, একটি মিথ্যা হাজার বার বললেও সেটি মিথ্যাই থাকে। আমাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা সম্ভবত এই কথাটি জানেন না। তাদের এ কথাটি জানা দরকার। একইসঙ্গে এই সন্দেহ রোগের চিকিৎসাও জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ