হাসান মাহমুদ, লালমনিরহাট: দিনমজুর গাজী ইসলাম (২৬) ও তার ছোট ভাই নুর ইসলাম ওরফে কালু (২৪)। সারাদিন অন্যের বাড়িতে কাজ করে বাবা নয়োব আলী মা ফাতেমা আর দুজনেরই স্ত্রী সন্তানে পেটের ভাত যোগান। পাড়াপর্শি থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও তাদের দিনমজুরী করার কাহিনী জানেন। কিন্তু সামান্য একটু জমির জন্যই এলাকার এই নিরহ দুই সহোদরকে প্রতিপক্ষের যোগ সাজসে থানা পুলিশ তাদের কথিত মাদক ব্যবসায়ী সাজিয়ে বাড়ি থেকে ধরে আনায় হতাশ ও ক্ষুদ্ধ উঠেছে গ্রামের সাধারণ মানুষ। ঘটনাটি ঘটেছে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বাড়াইপাড়া গ্রামে। এর এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রতিপক্ষ মাদক ব্যবসায়ী হাকিম ও দোলোয়ারের কাছ থেকে থানা পুলিশের বিরুদ্ধে মোটা অংকের লেনদেন হয়েছে বলে এলাকাজুড়ে ব্যাপাক গুঞ্জন উঠেছে।
খোঁজ জানা গেছে, ওই এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের চোখ পড়ে দিনমজুর গাজি ও কালুর একখন্ড জমির উপর। আর সেই জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরেই থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে তাদের জরাজীর্ণ খোলা রান্না ঘরে রাঁতের আধাঁরে রাখা হয় তিন কেজি ভারতীয় গাঁজা। এই অবস্থায় মঙ্গলবার রাত ১১ টার দিকে হাতীবান্ধা থানার উপ-পরিদর্শক আজমিরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ মাদক ব্যবসায়ী হাকিমের ভাই দেলোয়ারকে সাথে নিয়ে সেই জরার্জীন খোলা রান্না ঘর থেকে তা উদ্ধার করে। এসময় পুলিশের ওই দলটি ঘুমন্ত গাজি ও কালু নামের দুই সহোদরকে ঘুম থেকে তুলে উদ্ধারকৃত গাঁজাসহ থানায় নিয়ে আসে।
বুধবার সকালে ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকাবাসীদের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। প্রতিবেশীদের ভাষ্য মতে, অত্যন্ত গরীব ও নিরহ একটি পরিবার মাদক বলতে কোন বস্তুই না চিনলেও উল্টো তারাই পুলিশি ভাষায় রাতারাতি মাদক ব্যবসায়ী হওয়ায় সাধারণ মানুষজনের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনেকেই বলছেন ওই পরিবারে সাথে বিরোধ চলে আসছিল প্রতিবেশী মাদক ব্যবসায়ী হাকিম আর তার ভাই দেলোয়ার হোসেনের। তাদের নামে ইতোপূর্বে একাধিক মাদক মামলাও রয়েছে বলে এলাকাবাসী ও পুলিশ সুত্রে জানা গেছে। আর তাই ওই দুই মাদক ব্যবসায়ীর মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে হাতীবান্ধা থানার এসআই আজমির নিরিহ দুই দিনমজুরকে ধরে এনে মাদক ব্যবসায়ী সাজানোর অপচেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার বিকেলে সরেজমিনে গাজি ও কালুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের লোকজনের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এসময় তাদের মা ফাতেমা বেগম প্রতিনিধিকে বলেন, ওই দুই সন্তানের দিনমজুরীর আয় দিয়ে আমরা পেটের ভাত পাই। কিন্তু প্রতিবেশী মাদক ব্যবসায়ী হাকিমরা আমার ছেলে দুটোকে পুলিশ দিয়ে ফাঁসিয়ে জেলে পাঠিয়েছে। এখন আমরা কি খাবো! কি করে এই অপবাদ থেকে বেঁচে জেল থেকে তাদের ছড়িয়ে আনবো!- বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন ওই মহিলা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাতীবান্ধা থানা উপ-পরিদর্শক আজমির সাংবাদিকদের বলেন, “ ইতোপূর্বে ধৃত গাজি কালুর বিরুদ্ধে থানায় বা কোথাও কোন মাদক মামলা নেই বলে স্বীকার করেন। তবে ওই এসআই এর দাবি উদ্ধারকৃত গাঁজা ধৃত দুই সহোদরের রান্না ঘরে পাওয়া গেছে। এসময় পুলিশের অভিযানের সাথে এলাকার কোন মাদক ব্যবসায়ী ছিল কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রতিবেশে দেলোয়ার তাদের অভিযানে সহায়তা করেছে মাত্র। তবে এসআই আজমিরের দাবি আমরা শুরুতে মাদক ব্যবসায়ী দেলোয়ারের বাড়িতে অভিযান করেছি। কিন্তু সেখানে কোন কিছু না পেয়ে দেলোয়ারকে সাথে নিয়ে গাজী ও কালুর বাড়ির রান্নাঘর থেকে ওই গাঁজা উদ্ধার করা হয় বলে তিনি স্বীকার করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই এলাকার ইউ,পি সদস্য কফিল উদ্দিন বলেন, “ শুধু আমি নই পুরো ঘটনায় এলাকার মানুষ হতাশ। একটি দিনমজুর পরিবারকে রাতারাতি মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে বলে দাবি ওই ইউ,পি সদস্যের।
একই কথা বলেন সংশ্লিষ্ট টংভাঙ্গ ইইনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম হোসেন। তার ভাষ্য মতে, একটি নিরিহ গরীব পরিবারের সদস্যদের কথিত মাদক ব্যবসায়ী সাজিয়ে থানা পুলিশের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি হাতীবান্ধা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের জানান হয়েছে।
হাতীবান্ধা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মতিন প্রধান সাংবাদিকদের জানান, এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য আইনে একটি মামলা হয়েছে। আসামীদের গতকাল বুধবার বিকেলে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।