সিসি নিউজ: অধ্যাপক ডাঃ এম আমজাদ হোসেন ১৯৫৩ সালের ৫ জুলাই দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর থানার সুখদেবপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন।তিনি দিনাজপুর সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে কৃতিতের সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।১৯৭৮ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে অর্থপেডিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস ডিগ্রী লাভ করেন।১৯৭৯ সালে পার্বতীপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৮১ সালে পঙ্গু হাসপাতালে,১৯৯০ সালে বাংলাদেশ কর্মকমিশন কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে সহকারী, সহযোগী ও অধ্যাপক হিসেবে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। ২০০২ থেকে অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান হিসেবে ২০০৭ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মরত ছিলেন। ২০০৮ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে ল্যাবএইড স্পেসালাইজড হাসপাতালে চীফ কনসালটেন্ট হিসেবে যোগদান করে অদ্যাবধি কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি বিভিন্ন দেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং সম্মুখ যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অবৈতনিক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৯৯ সালে শিক্ষা স্বাস্থ্য ও বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে স্বপ্ন গঠনে একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান এবি ফাউন্ডেশন গঠন করেন। এই প্রতিষ্ঠান ২০০০ সালে আমেনা বাকী স্কুলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং ২০০১ সালে ২৯ জানুয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভধন হয়। বর্তমানে দেশের একটি অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এবং এই স্কুলে গরীব মহিলাদের জন্য হস্ত শিল্প, প্রান্তিক গরীব শিশুদের জন্য স্কুলিং,৬টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।
দরিদ্র জনসাধারণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা প্রদানে অরাজনৈতিক, অলাভজনক জনহিতকর বেসরকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবি ফাউন্ডেশন কাজ করে চলেছে। এ.বি ফাউন্ডেশনের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল ইতোমধ্যে এই অনগ্রসর অঞ্চলের শিক্ষাপ্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পিয়ার উদ্দীন আহম্মেদ জানান, ২০০৭ সাল হতে বিদ্যালয়টি শতভাগ পাস নিশ্চিত করেছে এবং গত জেএসসিতেও শিক্ষাবোর্ডে তৃতীয় ও দিনাজপুর জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান জানান, নিয়মিত পড়ালেখা, শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, এলাকাবাসী এবং কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতা, শিক্ষার্থীদের অধ্যাবসায় এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণকে শ্রেণী পাঠদানে যথাযথ কাজে লাগিয়ে এ ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। দুর্বল ছাত্রদের জন্য শ্রেণী পাঠদানের বাইরে বিশেষ ক্লাস এবং নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণ করার ব্যবস্থা ফলাফল ভাল করার অন্যতম কারণ। তিনি আরো জানান, মানবিক বিভাগের দুর্বল ছাত্রী খুশী মনি রায় ও বিজ্ঞান বিভাগের রোকনুজ্জামান টেস্টে তুলনামূলক খারাপ রেজাল্ট করলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। কাজেই ভালো ফলাফলের জন্য কোচিং সেন্টারে যাবার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, অন্যের ছেলেমেয়েদের নিজের ছেলে-মেয়ে মনে করে আন্তরিকতার সাথে পাঠদান ও তত্ত্বাবধান করলে ভাল ফলাফল যে কোন প্রতিষ্ঠানই অর্জন করতে পারে। ভবিষ্যতে শিক্ষকসহ এলাকাবাসীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে বিদ্যালয়টিকে দেশের মডেল বিদ্যালয় হিসেবে পরিণত করার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এবারের জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী মোছা. ওয়াহিদা আক্তারের অভিব্যক্তি জানতে চাইলে সে জানায়, স্যারদের আন্তরিকতা ও বাবা-মায়ের সহযোগিতা আমার সাফল্যের পিছনে সবচেয়ে বেশি অংশীদার। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা লাভ করে দেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখবো।
দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলা আধুনিক শিক্ষা-সুবিধা বঞ্চিত, পশ্চাৎপদ, অবহেলিত শিক্ষায় অনগ্রসর একটি এলাকা। এখানে অধিকাংশ দরিদ্র ও অনুন্নত জনগোষ্ঠীর বাস। ২০০০ সালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবীদের মেধার বিকাশ ঘটাতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৭ একর জমির উপর নির্মিত একতলা ভবনের এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা ল্যাবএইড হাসপাতালের কর্মরত অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেন। তিনি তার মাতা পিতার নামে গড়ে তোলেন ‘‘আমেনা-বাকী ফাউন্ডেশন বা এ.বি ফাউন্ডেশন’’। যা একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, অলাভজনক জনহিতকর বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। এই ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য আধুনিক ও সময়োপযোগী শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, দুস্থ মহিলাদের আত্মনির্ভর করে গড়ে তোলার জন্য সেলাই শিক্ষা কার্যক্রম, বয়স্ক শিক্ষা, কৃষি ও মৎস্য চায়, দুঃস্থ ও দরিদ্রদের আর্থিক উন্নয়নের জন্য ক্ষদ্র ঋণ সুবিধা চালু, গণপাঠাগার নির্মাণসহ দরিদ্র জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করা। এ.বি ফাউন্ডেশনের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘‘আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল’’।
২০০০ সালের ৫ জুলাই আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন অধ্যাপক ডাঃ এম আমজাদ হোসেনের মাতা বিশিষ্ট সমাজসেবী আমেনা খাতুন। আমেনা-বাকী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলটি দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত চিরিরবন্দর উপজেলাধীন পার্বতীপুর ও দিনাজপুর পাকা সংযোগ সড়কের পাশে এবং চিরিরবন্দর উপজেলা হেড কোয়ার্টারের সন্নিকটে অবস্থিত। স্কুল ভবন, আবাসিক ভবন, খেলার মাঠ, ফুলের বাগান ও চলাচলের রাস্তা সহ প্রায় ৫(পাঁচ) একর। ২০০১ সালে নার্সারী থেকে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত ১৬৫ জন ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তি করানো হয়। ১৩ জন ছাত্র নিয়ে ২০০১ সালের জুন মাসে আবাসিক এর কার্যক্রম শুরু হয়। এ.বি ফাউন্ডেশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্কুলের কার্যক্রম এলাকার জনসাধারণ সন্তুষ্ট হলে ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করার সিদ্ধান্ত হয়। ২০০২ সালে স্কুলের প্রতি ছাত্র-ছাত্রীর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করানো হয়। সংস্কৃতি, খেলাধূলায় এবং পড়ালেখার মান দ্রুত বৃদ্ধি পেলে ২০০৩ সালে আবাসিক ৭৫ জন ছাত্র সহ ৩২৫ জন ছাত্র-ছাত্রী সহ স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৬ সালে ৩টি আবাসিক রুম তৈরি ও একটি ক্রয়কৃত বাসা। অধ্যক্ষের জন্য ২ কক্ষ বিশিষ্ট ১টি টয়লেট সহ বাসা। আইটিসি রুম ১টি উদ্বোধন করেন স্কুলের সহ সভাপতি নূরুল ইসলাম মন্ডল। এভাবে উত্তরোত্তর প্রতিষ্ঠানটিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রযুক্তির ব্যবহার বিনোদনসহ মনোমুগ্ধকর পরিবেশে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০০৭ সালে ১৮ জন ছাত্র-ছাত্রী বিজ্ঞান ও ৬ জন ছাত্র মানবিক বিভাগ থেকে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১০০% পাস করে। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১২ জন জিপিএ-৫ এবং মানবিক বিভাগ থেকে ১ জন জিপিএ-৫ অর্জন করে। ১ জন জিপিএ ৪ ও ১০ জন সকলে ৪.৫ এর উপরে পায়। এভাবে প্রতি বছর স্কুলটির সাফল্য এলাকাবাসীর মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে। স্কুলটির বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১২০০ জন। এর মধ্যে আবাসিক ছাত্র-২৩০ ও ছাত্রী-৯০ জন।
তিনি বাংলাদেশ অর্থপেডিক সোসাইটির আজীবন সদস্য, এছাড়া এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অর্থপেডিক সার্জনস-এর সদস্য। বাংলাদেশে অর্থপেডিক চিকিৎসায় নিয়ে এসেছেন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত আছেন। সংগৃহিত