এম আর মহসিন: জীবিকা নির্বাহ ও সৃষ্টিশীল কিছু করার তাগিদে সৈয়দপুরের আব্দুল আজিজ শুরু করেন মাশরুম চাষ। অতঃপর এর পুষ্টিগুন ও সহজলভ্য করতে চালান বিস্তর গবেষনা। মাদার সংগ্রহ করে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে নিজস্ব ল্যাবে এর বীজ তৈরীর পর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেন। এতে অভাবনীয় সাফল্য আসায় এর মাধ্যমে বাড়তে থাকে কর্মসংস্থান ও প্রচলন। আর কৃষিজ এ ওষুধী পণ্যে ভুমিকা রাখায় স্থানিয়,আঞ্চলিক ও জাতীয়ভাবে সেরা কৃষি উদ্যোক্তার পুরস্কার লাভ করেন এ উদ্ভাবক। উৎসাহে উজ্জিবিত হয়ে উৎপাদন বাড়ানোয় দেশের সিংহভাগ মাশরুমের চাহিদা পুরন হয় তার উৎপাদন কেন্দ্র হতে। তবে ২০দলীয় জোটের ডাকা দীর্ঘ অবোরোধ আর হরতালে মাথায় হাত পরেছে এ গবেষকের। দেশের চলমান রাজনৈতীক সংকটে প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসানের ফাদেঁ পড়েন। এতে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে তার মাশরুম উৎপাদন কেন্দ্রটি। আর এর সাথে কর্মরতদের দূর্দশা নেমে এসেছে। তাই এ কৃষিজ পন্যটি রক্ষায় সরকারসহ বিরোধীদলের কাছে সহনশীল রাজনৈতিক কর্মসুচি ঘোষনার দাবি জানান স্থানিয় ভোক্তাসহ এ মাশরুম চাষি ।
সৈয়দপুর শহরের টেকনিক্যাল কলেজপাড়ায় আব্দুল আজিজ জীবিকার তাগিদে ২০০৮ সালে শুরু করেন মাশরুম চাষ। অজ্ঞাত এ খাদ্য উৎপাদন ও বিপননে তিনি নিজের সাথে চ্যালেজ্ঞ গ্রহন করেন। চাষের পাশাপাশি শুরু করেন গবেষনা। এ খাদ্যে দ্বারা মানবদেহের উপকারিতা। আমিষসহ বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেলের উপস্থিতি পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি মুলক প্রচারনা চালিয়ে এটাকে সহজপ্রাপ্য করেন। ঢাকার সাভার হতে গ্যানোডার্মালুচিডার্ম মাশরুমের মাদার সংগ্রহ করেন। টিস্যূ কালচারের মাধ্যমে মাশরুম বীজ উৎপাদন করেন। আর উৎপাদিত কাচামাল প্রক্রিয়াজাত করে ট্যাবলেট ও পাউডার করে সরবরাহ করেন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। এতে দিন-দিন চাহিদা বেড়ে যায় আব্দুল আজিজের মাশরুমের। ব্যাংক ঋন নিয়ে শুরু করেন বানিজ্যিক ভিক্তিক মাশরুম চাষ। গড়ে তোলেন ফাতেমা এন্টার প্রাইজ নামের উৎপাদন ও বিপনন কেন্দ্র। এতে সম্প্রসারনের পাশাপাশি আত্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাশরুমের প্রচলন বেড়ে যাওয়ায় পুরুস্কৃত হন। বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক, বাংলাদেশ একাডেমি অব এ্যাগ্রিকালচার এ্যাওয়ার্ড-২০১২,ষ্টার এ্যাওয়ার্ড-২০১২,সিটি ক্ষুদ্র উদ্যক্তা-২০১১ পুরস্কার পান। সকলের উৎসাহে নতুন উদ্্যমে এ বছর উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রকল্প হাতে নেন। নিয়োগ দেন অর্ধশতাধিক শিক্ষিত দক্ষ শ্রমিক। কিন্তু সে স্বপ্নে গুড়ে বালি পড়ে, দেশের চলমান রাজনৈতীক কর্মসুচির কারণে। ২০দলীয় বিরোধী দলীয় জোটের ডাকা গত ৬ জানুয়ারি হতে অনির্দিষ্ট কালের অবরোধে। ঢাকাসহ সারাদেশের সাথে অচল যোগাযোগ ব্যাবস্থার কারনে মাশরুম সরবরাহ বন্ধ হয়। তবে তার উৎপাদন কেন্দ্রের প্রতিদিনের সংগৃহিত কাচা মাশরুমের বোঝা বাড়তে থাকে। আর সরবরাহ না হওয়ায় কাজ কর্মের অভাবে এক তৃত্বিয়াংশ কর্মচারিকে ছাটাই করেন। এভাবে গত ৩৫দিনের অবরোধ আর হরতালের ফাদে পড়ে প্রায় ৫মন মাশরুম আটকে আছে। পাশাপাশি শুকিয়ে সংরক্ষনের পরে ও ছত্রাক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে প্রায় ১০মন মাশরুম। যার মুল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা।
গত বুধবার আব্দুল আজিজের ওই উৎপাদন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়,১২ থেকে ১৫জন শ্রমিক কাজ করছে। কেহ কাঁচা মাশরুম সংগ্রহ করছে। কেহ সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করতে শুকানোর জন্য সে গুলো কাটছে। বিপুল নামের ল্যাব কর্মচারি জানান, এখন চলছে শীত মৌসুম। এ মৌসুমে ন্যানডেক ওয়েষ্টার উপজাতের মাশরুম প্রতিদিন উঠছে। বাইরে সরবরাহ বন্ধের কারণে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে রাখা হচ্ছে। এরপরেও শুকনো মাশরুম ছত্রাক্রান্ত নষ্ট হচ্ছে। নষ্ট আর আটকে থাকা এ পন্যে প্রতিদিন প্রায় ৫০হাজার টাকার লোকসানের ঘানি টানছে। হরতাল-অবোরোধের আগে এ পন্যটি প্রতিদিন ১৫০ থেকে২০০ কেজি বাইরে যাইত। এভাবে মাশরুম সরবরাহ না হওয়ায় কাজ কর্ম কমায় মালিক অনেক শ্রমিককে ছাটাই করেছে।
একই কথা বলেন সাথি(২০) নামের এক ল্যাবে কর্মরত মহিলা কর্মচারি। তিনি আরো বলেন, মৌসুম শুরু হতেই অবরোধে কবলে পড়ে এ উৎপাদন কেন্দ্রটি। তাই এ কারখানার মালিকের সাথে-সাথে আমাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। এখন কোন রকম কাজ চলছে। এ কাজ টুকু যে কোন সময় বন্ধ হতে পারে। এ নিয়ে স্থানিয় মাশরুম ভোক্তা মোঃ এনামুল হক আক্ষেপের সাথে বলেন, ভেজালের এ যুগে শতভাগ স্বচ্ছ পুষ্টি জাতীয় এ খাদ্য দেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধসহ পুষ্টির অভাব পুরন করছে। আর হরতাল-অবোরোধে পড়ে এ অঞ্চলের গর্বিত প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হতে চলেছে যা দুঃখ জনক। এ নিয়ে সরকারসহ বিরোধিদলকে কৃষি অর্থনীতি নিয়ে ভাবা উচিত। ফাতেমা এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাশরুম উৎপাদক আব্দুল আজিজ বলেন, আমি যে স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছি। সেটা পুরনের পথে এগুচ্ছিল। চলতি বছর সারা দেশে প্রায় ১টন মাশরুম সরবরাহের পরিকল্পনা চলছিল। আর সে লক্ষ্যে চলছিল উৎপাদন। কিন্তু দেশের রাজনৈতীক কর্মসুচি আমাকে বর্তমান সর্বশান্ত করার পথে। একদিকে অতি উচ্চলাভের ব্যাংক ঋন কিভাবে পরিশোধ করব। আর কিভাবেই বা দির্ঘ এ লোকসান কাটিয়ে উঠব তা ভাবতে পারছিনা। তাই দ্রুত এ রাজনৈতীক সংকট থেকে দেশ মুক্ত না হলে মাশরুম হয়ত হারিয়ে যাবে। তাই এ কুষিজ পন্য রক্ষায় সরকারসহ বিরোধী দলের কাছে আকুতি এ নিয়ে একটু ভাবুন।