
।। মাসুদ মজুমদার ।। দেশে ফতোয়া বিতর্ক উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফতোয়া হচ্ছে ইসলামের ব্যাপারে নতুন বা তর্কিত কোনো বিষয়ে বৈধ কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক অভিমত, রায় বা মীমাংসা। ইসলাম চিরায়ত, গতিশীল ও জীবনবাদী ব্যবস্থা হবার কারণে গবেষণা ও ফতোয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। একদল মানুষ ফতোয়া বললেই ভুল বুঝেন ও তেতে ওঠেন। তাদের কাছে ফতোয়া মানে ধর্মাচার, মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীদের কাজ। ফতোয়ার মতো একটি প্রগতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক ধারণাকে খেলো করে দেয়ার জন্য কিছু বকধার্মিক যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী ইসলামবিদ্বেষী একটি দুষ্টুচক্রও। ফতোয়া বা অভিমত প্রাতিষ্ঠানিক হলে এর যে অর্থ দাঁড়ায়, একজন বা একাধিক ব্যক্তির মর্জির প্রকাশ হলে ভিন্ন অর্থ দাঁড়ায়। বাংলাদেশ কেন, বিশ্বের কোনো গ্রহণযোগ্য আলেম কোনোকালে কোনোভাবেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এমন ফতোয়া বা অভিমত দেননি, যাতে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভ্রান্তির জন্ম দেয়, ইসলামের প্রতিষ্ঠিত ধারণা থেকে জন্ম নেয়া গ্রহণযোগ্য আচরণগুলো চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। এক ধরনের কম শিক্ষিত মানুষ, যাদের কাছে ধর্মের মৌলিক জ্ঞান নেই, যুগজিজ্ঞাসা সম্পর্কে অজ্ঞ, আধুনিক বিজ্ঞানমানস অনুপস্থিত; তারা ফতোয়া দেয়ার অধিকার বা এখতিয়ার রাখেন না।
অনেক তর্ক-বিতর্কের পর আমাদের উচ্চ আদালত বিশেষজ্ঞ অভিমত নিয়ে ফতোয়া সম্পর্কে যে রায় দিয়েছেন, সেটা কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গ্রহণযোগ্য। যারা এই বিতর্ক সৃষ্টি করে পানি ঘোলা করতে চেয়েছিলেন, তারা সফল হননি। ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা উপস্থাপন করার জন্য তারা পশ্চিমা ধাঁচে ইসলামকে ইউরোপের মতো মধ্যযুগীয় ধর্মবিশ্বাস হিসেবে চিহ্নিত করতে ষড়যন্ত্র করেছিলেন। বর্বরতার সাথে এই মানবিক আদর্শকে তুলনা করার অপপ্রয়াস চালিয়েছিলেন। উচ্চ আদালতের রায় তাদের মুখ বন্ধ করেছে।
নতুন বিতর্কের জট পাকালো ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ইফার ফতোয়ার ধরন, তাদের বিগত ক’বছরের আচরণ, ইসলামের মৌলিক বা মূল ধারাকে কোণঠাসা করার নানা উপায়-উদ্যোগ সাধারণ মানুষকে সন্ধিগ্ধ করেছেÑ আসলে এ ধরনের ফতোয়ার অর্থ কী, তারা কাদেরকে মসজিদবিমুখ করতে চান সেটা বড় জিজ্ঞাসা হয়ে আছে। ইসলাম নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র বিস্তৃত ও বিস্তীর্ণ। অনেক নতুন নতুন গবেষণা সময়ের দাবি। সেসব ব্যাপারে নির্লিপ্ত থেকে হঠাৎ করে চেয়ারে নামাজ পড়া না পড়া নিয়ে কেন এতটা উৎসাহ তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন এখন কার্যত বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে না, অংশত সরকারি নীতির প্রতিফলন ঘটায়। সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির প্রকৃত রূপ ইসলাম সঙ্কোচনÑ ফাউন্ডেশনের বর্তমান ডিজিসহ পুরো ব্যবস্থাপনা সেই মিশন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ফাউন্ডেশন পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিয়েছে। এই ফতোয়ার সাথে ইসলামের প্রায়োগিক ঈমান-আমলের সম্পর্ক দূরতম বলেই মূল ধারার আলেমরা মনে করেন। তাই ফতোয়া দেয়া আবার প্রত্যাহার করার নাটকীয় ঘোষণা কোনো তাৎপর্য বহন করে না।
আল্লাহর রাসূল আরকান-আহকামসহ নামাজ পড়ার একাধিক প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। নিজেই সাহাবাদের নিয়ে একাধিক প্রক্রিয়ায় নামাজ আদায় করার নজির রেখে গেছেন। যেকোনো পরিস্থিতিতে ফরজ নামাজ আদায় করতে হয়। শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার পদ্ধতি বৈধ। শর্ত শুধু পরিবেশ পরিস্থিতি এবং আদায়কারীর শারীরিক অবস্থা ও অবস্থানগত বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। রাসূল উটের পিঠে যেমন নামাজ আদায় করেছেন, তেমনি রোগশয্যায়ও নামাজ বাদ দেননি। যুদ্ধের মাঠেও নামাজ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো অনুমোদন নেই।
সফরে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও কসর নামাজ আদায় করতে হয়। এখন প্লেনে নামাজ আদায় করা হয়। যানবাহনে নামাজ আদায়ের সুবিধামতো নানা রীতি অনুসরণ করা হয়। বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের যুগে প্রযুক্তিধারণা বিবেচনায় নিয়ে নামাজ আদায়কারী নামাজ আদায় করবেন, তাতে এতটা গরজ করে ফতোয়া দিয়ে চেয়ার বিতর্ক এক ধরনের হঠকারিতা কিংবা অন্য কোনো ক্ষুদ্র মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ কি না, আলেমরা তাও ভেবে দেখতে চান। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ ‘ফতোয়াবাজ’ শব্দটি নতুনভাবে চালু করে দিতে মতলববাজদের জন্য উসকানি ও সুড়সুড়িদাতার ভূমিকা পালন করেনি তো!
এই দেশে ধর্মকর্ম নিয়ে অসংখ্য নীতিগত বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে এ সময়ের ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ নেতৃত্ব দিতে কার্পণ্য করেনি। তারা জাতীয় মসজিদের ভাব মর্যাদা ক্ষুণœ করতে খতিব বিতর্কও এড়াতে পারেননি, বা এড়াননি। ইফার ডিজি নিজেও নানা কুতর্ক ও বিতর্কের জন্মদাতা। এখন ফতোয়া বিতর্ক সৃষ্টি করে আবার প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, সেই প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া জরুরি।
খ. কারো ভুলে যাওয়া উচিত নয়, অমাবস্যা এক রাতের বিষয়। পূর্ণিমাও দু’দিন হয় না। চাঁদ ওঠে ক্ষীণকায় অবস্থায়। আবার ডুবেও যায় ক্ষীণ হতে হতে। মানুষের জীবনে অসংখ্য অমাবস্যা আসে। আসে পূর্ণিমা। কিন্তু এর তিথি স্থিতি ও বাড়া কমা নিয়ে মানুষ কমই ভাবে। কারণ প্রকৃতির বর্ণাঢ্য রূপময়তা ও সৃষ্টিবৈচিত্র্য নিয়ে ভেবে দেখার সময় মানুষ পায় না। মানুষ দৌড়ায় অর্থবিত্ত, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির পেছনে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেউ উদ্বিগ্ন। কেউ উৎকণ্ঠিত। কারো দায়িত্ব হয়ে পড়েছে এটা বলা যে, খালেদা জিয়াকে দিয়ে আর কিছু হবে না। এই বিএনপি দিয়ে আর নয়। অনেকেই শেখ হাসিনার দোর্দণ্ড প্রতাপ-প্রতিপত্তিতে এতটা ক্ষুব্ধ ও ঈর্ষাকাতর যে, তার ক্ষমতার মেয়াদ আরো বাড়–কÑ এটা সহ্য করতেই চাচ্ছেন না। কোনো দৃঢ়চেতা জাতি এভাবে চিন্তা করে না। ভুলে গেলে চলবে নাÑ বর্তমানে গণতন্ত্রের ভাষা অকার্যকর। ক্ষমতার দাপটের কাছে নত হয়ে আছে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার।
আমরা যারা কলম পিষি তারা পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করি। ভবিষ্যৎ বক্তা নই। আমাদের দায় জ্যোতিষীর দায় নয়, রাজনৈতিক ভাষ্যকারের দায়। তাই পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে মন্তব্য করাটাই আমাদের কার্যপরিধির অংশ। এটা নিশ্চিত করে বুঝি মানুষ পরিবর্তনকামী হয়ে উঠেছে। যারা ক্ষমতার চৌহদ্দিতে আছেন তারা টের পাচ্ছেন না পরিবর্তনকামী মানুষের মানসিক যন্ত্রণার কারণগুলো। তারা বুঝতেও চাচ্ছেন না। তাই টেন্ডার দখল, ভোটকেন্দ্র দখল থেকে ক্লাব দখল সবই তাদের জন্য বৈধ হয়ে গেছে। তাদের সত্যনিষ্ঠা ও নীতি জ্ঞান ভোঁতা হয়ে গেছে।
কার্যত একটি মাত্র কারণে মানুষের মনে পরিবর্তনের চিন্তা ঠাঁই পায়নি। কেউ একটি কারণে প্রতিক্রিয়া দেখায়ও না। আবার কেউ কেউ মনস্তাত্ত্বিক কারণেও পরিবর্তন প্রত্যাশা করে। সরকার বুঝুক আর না-ই বুঝুক, অসংখ্য মানুষ, সংখ্যা হিসেবে যার তালিকা লক্ষ কোটি হবে। তারা সংক্ষুব্ধ। সমাজের শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে অল্প কিছু মানুষ সুবিধাবাদী। সুবিধাভোগী, কায়েমি স্বার্থবাদীর সংখ্যাও বেশুমার নয়। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহারের সুবাদে তারা ক্ষমতাবান। আবার ক্ষমতাদর্পিও। তাই জনগণ একটা সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করাটাকেই নিরাপদ মনে করে।
প্রতিবাদী জনগোষ্ঠীর যে অংশটি ধৈর্যহারা, সংযমহারা, তারা কলমের জোরে বন্দুকও উপড়ে ফেলতে চান। এটাও ভাবেন না যে, গ্রহণ বা গ্রাসকাল পূর্ণ হতে হয়। পূর্ণ গ্রাস না হলে প্রকৃতির নিয়মে পরিবর্তন ঘটে না। আর চাইলে পূর্ণিমার রাতে অমাবস্যা হবে না। অমাবস্যার রাতে পূর্ণিমার চাঁদ চেয়ে পাওয়া যাবে না।
সূরা আসরের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে, তারা ছাড়া, যারা পরস্পরকে সত্যনিষ্ঠ হওয়ার পরামর্শ দেয় এবং নিজে সত্যের ওপর থাকার চেষ্টা করে। ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য সচেষ্ট থাকে।
তাই শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কারণেই নয়, ভাষ্যকারের অবস্থানের জন্যও নয়, প্রকৃতির নিয়মেও পাপকে ষোলোকলায় পূর্ণ হতে হয়। পূর্ণগ্রাস কিংবা পুরো অমাবস্যার জন্য অপেক্ষা করুন। তারপর প্রাকৃতিক নিয়মেই চাঁদ উঠবে। অসত্য বেশি দিন টেকার নয়। সত্য যখন সামনে এসে দাঁড়াবে, অসত্য বিতাড়িত হবেই। কারণ অসত্যের পতন অবশ্যম্ভাবী।
তাই কাউকে দরবেশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। জ্যোতিষী সাজারও গরজ নেই। শুধু সময়কে উপলব্ধি করে যার যার করণীয় নির্ধারণ করাই যথেষ্ট। বিশ্বাসী মন সব সময় সায় দেয়Ñ যা হওয়ার তা আসমান থেকেই হবে, তবে কার্যকারণ মানুষই সৃষ্টি করবে। তাতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কোনো বিষয় নয়। খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাও আসল উপাত্ত নন। ওপরওয়ালাকে ভরসায় নিন। এটা নিয়তিবাদীর হেয়ালি নয়। খেয়ালি মনের চাপাবাজিও নয়। ধ্বংস, নয়তো পরিবর্তনের এটাই চিরায়ত প্রাকৃতিক নিয়ম। এই নিয়মভাঙার সাধ্য শাসকদের নেই। শাসিতদেরও নেই। তবে শাসিত শ্রেণী মজলুম হলে তাদের আহাজারি আরশের প্রভুর দরবারে দ্রুত পৌঁছে যায়। এটা কোনো সান্ত্বনার বাণী নয়। হতাশাবাদী কিংবা অদৃষ্টবাদীর অক্ষম বিলাপও নয়, বিজ্ঞানমনস্ক মনের যুক্তিও। প্রতিটি ক্রিয়ার পাল্টা প্রতিক্রিয়া অর্থহীন সংলাপ হতে পারে না।