॥ এড.মোফাজ্জাল হোসেন দুলাল ॥ আজ ১৪ই জুন। প্রয়াত রাজনীতিক বেগম খুরশীদ জাহান হকের ৯ম মৃত্যু বার্ষিকী। বেগম খুরশীদ জাহান হক যিনি দেশে ‘চকলেট আপা’ বলে সমধিক পরিচিত ছিলেন। দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভানেত্রী ছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানের পদও অলংকৃত করেন। তিনি ১৯৩৯ সানের ১১ই অগাষ্ট জন্ম গ্রহন করেন। সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় দিনাজপুরের উন্নয়নের রুপকার চকলেট আপা চির বিদায় গ্রহন করেন ২০০৬ সানের এই দিনে।
স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সনের সাধারন নির্বাচনের প্রাক্কালে দিনাজপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে তার অভিষেক ঘটে। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তিনি তেমন সক্রিয় না থাকলেও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সংগ্রামরত ৭ দল ও ১৫দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অন্তত: দু’বার তার বনানীস্থ বাসায় বৈঠক করেন। যাই হোক’৯১ এর সাধারন নির্বাচনে তিনি দলীয় প্রার্থী ছিলেন না বটে কিন্তু দিনাজপুরে বি,এন,পি দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে সমগ্র দিনাজপুরে ব্যপক নির্বাচনী কর্মকান্ড পরিচালনা করে জাতীয়বাদী রাজনীতিতে এই অঞ্চলে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন।
অত্যন্ত ধর্মভীরু, মৃদুভাষিনী কিন্তু দৃড় প্রত্যয়ী এই রাজনীতিক সেই সময় পর্যন্ত আওয়ামী অধ্যুষিত দিনাজপুরে সত্যিকার অর্থে জেলার মাটি ও মানুষের মাঝে বি,এন,পির রাজনৈতিক আদর্শকে অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত করেন। ‘৯১-‘৯৬ এর শাসনামলে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় বোন বেগম খুরশিদ জাহান হক একজন মনোনীত এম,পি হিসেবে দিনাজপুরে সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তার প্রতিটি মূহুর্ত¡ কেটেছে উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে। শুধু উন্নয়ন কর্মকান্ডের মধ্যে তিনি নিজেকে সীমাবন্ধ রাখেননি, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম-গ্রামান্তর, পাড়া-মহল্লায় সর্বত্র স্বশরীরে উপস্থিত থেকে বিএনপির রাজনীতিকে জনগনের দোর গড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। এভাবে দিনের পর দিন প্রতিটি এলাকায় গনসংযোগ করে সংগঠন হিসেবে বিএনপিকে এক শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড় করান তিনি। তার প্রমান, অনেক প্রতিকূল অবস্থাতেও চকোলেট আপা ১৯৯৬ সালে এর সাধারন নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৯৫ সনের ২৪শে আগষ্ট কিশোরী ইয়াসমীন হত্যার পর দিনাজপুর সহ সারা দেশে সর্বস্তরের মানুষ যখন পুলিশ কর্তৃক অসহায় দরিদ্র কিশোরী ইয়াসমিনকে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল তখন স্থানীয় বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি বেগম খুরশিদ জাহান হককে রাজনৈতিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার মানসে দিনাজপুরে তাকে ‘অবাঞ্চিত’ ঘোষনা করেন। কিশোরী ইয়াসমিন হত্যার তিন দিন পর আন্দোলনরত মানুষের উপর পুলিশ ও বিজিবি (তৎকালীন বিডিআর) নির্মমভাবে গুলি চালালে সাজু, কাদেরসহ অন্তত ৭জন আন্দোলনকারী নিহত হোন। সেই সময় বিদেশে অবস্থানরত বেগম খুরশীদ জাহান হক ঢাকায় ফেরেন এবং এর কয়েক দিন পর দিনাজপুরে আগমনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো তার আগমন প্রতিহত করার ঘোষনা দিলেও তিনি দৃপ্ত পদভাবে দিনাজপুরে পদার্পন করেন। আর বছর খানেকের মধ্যেই অনুষ্ঠিত সাধারন নির্বাচনে এই দিনাজপুরের মানুষই তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেন। এই সময়ে দেশে বিদেশে ইয়াসমিন হত্যার ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি যথেষ্ঠভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও দিনাজপুরের সাধারন মানুষ বিরোধী দল কর্তৃক চকোলেট আপাকে রাজনৈতিক ভাবে হেনস্থা বিষয়টি ভালভাবে গ্রহন করেন নি।
মূলত: ১৯৯১ সনে দিনাজপুরে বিএনপি দলীয় রাজতীতির হাল ধরার সময় থেকে জেলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেন। স্মার্তব্য যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দিনাজপুরে মেডিকেল কালেজ ও হাসপাতাল নির্মানে উদ্যোগ গ্রহন করেন। মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য জমি অধি গ্রহন সম্পন্ন করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া। ভবন নির্মানার্থে ১০ লক্ষাধিক ইট ও নির্মান সামগ্রী এরশাদ শাসনামলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়। বেগম খুরশীদ জাহান হক তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিকট ব্যক্তিগত ভাবে দিনাজপুুরের মানুষের এই প্রাণের দাবী বাস্তবায়নের জন্য আহবান জানান। অতঃপর মেডিকেল কলেজ ভবন নির্মান কাজ শুরু হয়। দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, বর্তমান প্রধান মন্ত্রীর প্রথম শাসনামলে দিনাজপুর বাসীর এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন আবারো থমকে পড়ে। ২০০১ সনের বি,এন,পি সরকার গঠনের পর চকোলেট আপা মন্ত্রীত্ব লাভ করেন এবং তার নিরলস প্রচেষ্টায় দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল পূনার্ঙ্গ রূপ লাভ করে।
দেশের উত্তরের জনপদ বৃহত্তর দিনাজপুরে হার্ট এর রোগীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকায় স্থানান্তর করার সমস্যাটি চকোলেট আপাকে ভাবিয়ে তোলে। জেলা শহরের মুন্সী পাড়ায় অত্যন্ত সীমিত পরিসরে তিনি জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন গঠন ও এর কার্য্যক্রম শুরু করেন। দেশের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক ঢাকা থেকে নিয়মিত এসে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিতেন। আঁতুড় ঘরেই এই প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী হামলার শিকার হয় যা দিনাজপুর রোগীর অজানা নয়। আজ জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন ও রিসার্চ সেন্টার ঢাকার বাইরে এক অনন্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড ঘোষনা, বেগম তৈয়বা মজুমদার ব্লাড ব্যাংক, সদরের প্রায় সকল ইউপি ভবন নির্মান, সরকারী-বেসরকারী স্কুল কলেজের ভবন ও আডিটোরিয়াম নির্মান জজকোর্ট ভবন, জেলা প্রশাসন ভবন, ষ্টেশন ভবন, নতুন সার্কিট হাউজ বিল্ডিং, রাজবাটিতে মূক ও বধির ইন্সিটিটিউট প্রতিষ্টা, সরকারী কলেজ, হাবিপ্রবি উন্নয়ন, সদর হাসপাতাল, ডায়াবেটিস হাসপাতাল ও চক্ষু হাসপাতাল উন্নয়ন, বাধ নির্মান, গ্রামের রাস্তা ঘাট পাকা করন, মাঝাডাঙ্গা ব্রীজসহ অসংখ্য ছোট বড় ব্রীজ-কালভার্ট নির্মান, রামসাগরকে প্রাচীর পরিবেষ্ঠিত করন ও সবুজায়ন করা ছাড়াও মসজিদ মন্দিরের উন্নয়ন তার কীর্তি গাঁথাকে চির অম্লান করে রাখবে। বি,এন,পি রাজনীতিকে পছন্দ করেন না এমন মানুষও বিশ্বাস করতে বাধ্য হোন যে, চকোলেট আপাই এক সময়ের অবহেলিত দিনাজপুরকে উন্নয়নের সিড়ি বেয়ে উপরে টেনে তুলেছেন।
বেগম খুরশীদ জাহান হক চকোলেট আপা ২০০৬ সনে বেগম রোকেয়া পদকে ভূষিত হোন। এ সময় তিনি বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় নিজ হাতে পদক গ্রহন করতে পারেন নি। অসুস্থ্য হওয়ার পর তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী নিজ নির্বাচনী আসন এলাকা দিনাজপুর জেলা শহরে অবস্থিত উত্তর ফরিদপুর গোরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয় বাবা মায়ের কররের পাশে। আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বেহেস্তবাসী করুন।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, দিনাজপুর জেলা বিএনপি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, দিনাজপুর সদর।