সিসি ডেস্ক: তিন হাজার কোটি টাকার হিসাব না দিয়েই বার্ষিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বেসিক ব্যাংক। এ অর্থের বিপরীতে রাখা হয়নি কোনো প্রভিশন। শুধু বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কখনও আদায় হলে তা আবার ঋণ স্থিতির সঙ্গে যোগ করা হবে। আর আদায় না হলে ১০ বছরে প্রভিশন সংরক্ষণ করা হবে। আগের পরিচালনা পর্ষদের সময়ে দেওয়া এসব ঋণের বেশিরভাগই অস্তিত্বহীন হওয়ায় আর্থিক বিবরণী থেকে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন এই আর্থিক বিবরণীর চূড়ান্ত অনুমোদনও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বেসিক ব্যাংক সম্প্রতি ২০১৪ সালের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী বা ব্যালান্সশিট প্রস্তুত করে তা প্রকাশ করেছে। সেখানে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ হওয়া মোট ঋণ স্থিতি দেখানো হয়েছে ৮ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির ঋণ স্থিতি ছিল ১১ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণ ৫ হাজার ১০৯ কোটি টাকা দেখানো হলেও আসলে রয়েছে ৮ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুটি ক্ষেত্রেই ব্যাংকটি ২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা কম দেখিয়েছে। একইভাবে ব্যাংক থেকে সরবরাহ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মার্চ ভিত্তিক ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন প্রতিবেদনে ঋণ স্থিতি দেখানো হয়েছে ৮ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে পাঁচ হাজার ৮০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, আর্থিক বিবরণীতে দেখানো খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২ হাজার৩৬৪ কোটি টাকা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি ৪৩১ কোটি টাকা সংরক্ষণ করায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা। এই প্রভিশন সংরক্ষণে বেসিককে পাঁচ বছর সময় দেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী থেকে কোনো কিছু বাদ দিতে হলে নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অবলোপনের পর বাদ দিতে হয়। বেসিক ব্যাংক সেটি না করে একটি অংশ লুকিয়ে রেখে থাকলে দু’ধরনের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছে। প্রথমত, আমানতকারী বা সাধারণ গ্রাহক সঠিক আর্থিক পরিস্থিতি জানতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, ঋণ অনুমোদন বা বিতরণের ক্ষেত্রে যারা অন্যায় করেছে তারা পার পেয়ে যাবে।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, আগের পর্ষদের সময়ে অনিয়ম করে বিতরণ করা কিছু ঋণের সুবিধাভোগীকে খুঁজে বের করেছে বর্তমান কর্তৃপক্ষ। তবে ২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকার আসল সুবিধাভোগী কে বা কারা তা না পাওয়ায় মূল আর্থিক বিবরণী থেকে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, আর্থিক বিবরণী থেকে কোনো ঋণ বাদ দিতে হলে অবলোপন করে আলাদাভাবে হিসাব করতে হয়। আর অবলোপন করতে হলে তার বিপরীতে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা ও শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংক থেকে বিতরণ হওয়া সব ঋণই যেহেতু কোনো না কোনো আমানতকারীর অর্থ এ কারণে ব্যাংকের মুনাফা বা মালিক পক্ষের অর্থ থেকে এই সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়।তবে বর্তমানে প্রভিশন রাখার মতো সক্ষমতা বেসিক ব্যাংকের না থাকায় আমানতকারীর প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অবলোপন না করে স্থগিত হিসাবে রাখা হয়েছে। এই ঋণ ব্যাংক কখনও আদায় করতে পারলে ব্যাংকের ঋণ স্থিতির সঙ্গে যোগ করবে। আদায় না হলে এর বিপরীতে যে প্রভিশন রাখতে হবে তা সংরক্ষণে সময় পাবে ১০ বছর।
বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, টাকা আদায়ের জন্য সব গ্রাহককে তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে অনেকের সঙ্গে কথা বলে তার দায় স্বীকার করিয়েছেন। এদের অনেককে বেশি টাকা দেওয়া হয়েছে। সেই টাকা নিয়ে কী করেছেন তা তারাই ভালো জানেন। তবে এখন ব্যাংক যে কোনো মূল্যে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান জানান, আর্থিক বিবরণী থেকে তিন হাজার কোটি টাকা একেবারে বাদ দেওয়া হয়েছে বিষয়টি তেমন না। তবে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে একটু সুবিধা পেতে এ পরিমাণ অর্থ আলাদাভাবে রাখা হয়েছে। এর বিপরীতে যে প্রভিশন রাখা প্রয়োজন তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ১০ বছর সময় দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনে বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগরসহ কয়েকটি শাখা থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। মূলত ২০১০ থেকে ১৪ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত এসব অনিয়ম হয়। এসব অনিয়মের প্রভাবে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়ে এখন ৮ হাজার ১০৮ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে যা মোট ঋণের ৬৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মূলধন ঘাটতি বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। এক সময়ে ব্যাংক খাতের ভালো প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত বেসিকের অনিয়মের তথ্য উদ্ঘাটনের প্রথম দিকে দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে তখনকার এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশের আলোকে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। অবশ্য পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন মূল অভিযুক্ত তখনকার চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু।বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, তারা চান ব্যাংকটি আবার ঘুরে দাঁড়াক। বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ব্যাংকটিকে ভালো অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সে বিবেচনায় ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণে দীর্ঘ সময় দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মূল আর্থিক বিবরণী থেকে একটি অংশ বাদ দিলেও তা ‘আলাদা সম্পদ’ এ দেখানো হয়েছে। এখানে বেআইনি কিছু করা হয়নি। ওই অর্থ কখনও আদায় হলে তা আবার ঋণ স্থিতিতে যোগ হবে।