সিসি ডেস্ক: প্রাথমিকে ভয়াবহ বৃত্তি কেলেঙ্কারি ঘটেছে। বৃত্তির তালিকা প্রকাশের তিন মাস পার হলেও কেলেঙ্কারির মূল হোতাদের চিহ্নিত করা হয়নি। হয়নি বৃত্তির তালিকা পরিবর্তন। নামকাওয়াস্তে সারা দেশে ২০ জন শিক্ষককে বরখাস্ত করেই দায় সেরেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। বরখাস্ত হওয়া শিক্ষকদের অধিকাংশই বরগুনার। এর বাইরে ঠাকুরগাঁও, চুয়াডাঙ্গাসহ কয়েকটি জেলার শিক্ষকরা রয়েছেন। কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিষ্পৃহতার কারণে অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব খবর পাওয়া গেছে।
গত ১৬ মার্চ প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা ফলের ভিত্তিতে চলতি বছরের বৃত্তি দেয়া হয়। এবার সারা দেশে প্রাথমিকে ৫৪ হাজার ৪৮১ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। এর পরই সারাদেশের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী বৃত্তি না পেয়ে অভিযোগ দায়ের করে। বলে, তাদের বৃত্তি না পাওয়ার কোনো কারণই নেই। একশ্রেণির শিক্ষকের কাছ থেকে বেশি অংকের টাকা নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তারা বৃত্তি দেননি। মূলত মাঠপর্যায়ের দুর্নীতিবাজ প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাই এই কেলেঙ্কারির হোতা। এছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অনেক পরীক্ষার্থী উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করেন। এতে ৮ হাজার পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়। পরিবর্তিত ফলে অধিকাংশই ‘জিপিএ-৫’ পেয়েছে। পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতে, সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর যদি ৮ হাজার পরীক্ষার্থীর ‘গ্রেড পরিবর্তন’ হতে পরে তাহলে বৃত্তিতে কেন হবে না-পাল্টা প্রশ্ন তাদের। তারা বলছেন, বৃত্তি তালিকা প্রকাশের পর অভিযোগ ও পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন জমা দেয়া হলেও শিক্ষা অফিসগুলো তোয়াক্কা করেনি। যদি বৃত্তির তালিকা পুনর্মূল্যায়ন হতো তাহলে এখানেও অনেক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হতো।
তবে এসব বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর। গতকাল তিনি বলেন, যেভাবে বলা হচ্ছে ঘটনাটি সেভাবে নয়। তার মতে, বৃত্তির তালিকা প্রকাশের পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে মাত্র ৩০৯টি অভিযোগ জমা হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে কী পরিমাণ অভিযোগ জমা হয়েছে তার পরিসংখ্যান দিতে পারেননি তিনি। তিনি বলেন, যেসব অভিযোগ অধিদফতরে জমা হয়েছে সেগুলোর নিষ্পত্তি করা হয়েছে। শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, উত্তরপত্রের ‘কোড নম্বর’ ফাঁস করার জন্য ১৫ জন এবং বৃত্তির অনিয়মে জড়িত থাকার জন্য ৫ জন শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৃত্তির কেলেঙ্কারি নিয়ে অভিযোগ জমা হলে অধিদফতর শুধু তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তি দেয়। বৃত্তির ফল পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না।
আগে প্রাথমিকের বৃত্তির জন্য আলাদা পরীক্ষা নেয়া হত। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে পঞ্চম শ্রেণি শেষে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নামে একটি পরীক্ষা নেয়া হয়। এই পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে প্রাথমিকের বৃত্তির তালিকা ঘোষণা করা হয়। এবার ট্যালেন্টপুলে ২১ হাজার ৯৮৩ ও সাধারণ কোটায় বৃত্তি পেয়েছে ৩২ হাজার ৪৯৮ জন। বিধি অনুযায়ী সমাপনী পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য এক উপজেলার শিক্ষক অন্য উপজেলায় যাবেন। তারাই উত্তরপত্রে কোড নম্বর দেবেন এবং মূল্যায়ন করবেন। মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের সহায়তায় এক শ্রেণির শিক্ষক অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নম্বর বাড়িয়ে দেন। এর ফলে অনৈতিকভাবে নম্বর বেশি পাওয়া শিক্ষার্থীরা যেমন সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল করে, তেমনি বৃত্তিও লাভ করে। এতে কম নম্বর পেয়ে অনেক মেধাবী বৃত্তির তালিকা থেকে ছিটকে পড়ে। কিন্তু এই অনৈতিক কাজ মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের সহায়তায় কিছু শিক্ষক করেন। ফলে দোষী শিক্ষকদের কোনো শাস্তি হয় না।
এরকমই একটি করুণ অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে সংযুক্ত দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক হীরেন্দ্র শেখর রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, তার বড় সন্তান শ্রীমঙ্গলের সেরা প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ থেকে চলতি বছর সমাপনী পরীক্ষায় ‘জিপিএ-৫’ পায়। সে ওই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ১ রোল নম্বরধারী শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু বৃত্তির তালিকায় দেখা গেছে, সে বৃত্তি পায়নি। ওই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ২ নম্বর রোল নম্বরধারী শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। কেন এমনটি ঘটল-এমন প্রশ্নের জবাবে হীরেন্দ্র শেখর রায় চৌধুরী বলেন, মৌলভীবাজার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন বালার সহায়তায় চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার ‘টাকার’ বিনিময়ে কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পাইয়ে দিয়েছেন। তার এই অভিযোগ নিয়ে গত দু’মাস ধরে শ্রীমঙ্গলের শিক্ষিত মহলে তোলপাড় চলছে। তিনি এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন বালা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, টাকা পয়সার ব্যাপারে আমি কোনো সময়ই জড়িত নয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃত্তির অনিয়ম নিয়ে মন্ত্রণালয়ে দুটি অভিযোগ জমা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো তদন্ত না করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে পাঠিয়ে দেয়। জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জ্ঞানেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের প্রতিনিধি। এখন তারাই যদি এসব অনিয়ম করেন তাহলে কোথায় যাব?
অধিদফতরের বৃত্তি শাখার সহকারী পরিচালক হাশেম খসরু বলেন, বৃত্তি নিয়ে অভিযোগ আসলেও সব সত্য নয়। তার মতে, বৃত্তি দেওয়া হয় নম্বরের ভিত্তিতে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী প্রত্যেক বিষয়ে ৮০ নম্বর পেলে ‘জিপিএ-৫’ পায়। আবার ৯৫ নম্বর পেলেও ‘জিপিএ-৫’ পায়। এক্ষেত্রে ৮০ নম্বর পেয়ে কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি পাবে নাকি ৯৫ নম্বর পেয়ে বৃত্তি পাবে-পাল্টা প্রশ্ন রাখেন তিনি। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলোর তদন্ত চলছে।