মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর : মিনতি বাঁশফোর, নুপুর বাঁশফোর, কোহিনুর বাঁশফোর, সুরভি বাঁশফোর, বৈশাখী বাঁশফোর সবুজ বাঁশফোর, ভরত বাঁসফোর, আসিফ বাঁশফোর, কৃষ্ণ বাঁশফোর, দেবদাস হেলা, তামান্না বাঁশফোর, মনজু বাঁশফোর, সাথী বাঁশফোর, বাপ্পি বাঁশফোর। এরা সবাই বিগত দু-তিন বছরে দিনাজপুর সুইপার কলোনীর শ্রী রামকৃষ্ণ আদর্শ শিশু বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এরপর তাদের শিক্ষা জীবন আর এগোয়নি। জীবনের প্রথম ধাপেই তাদের শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি হয়েছে। তাদের মত অনেক দলিত শিশুরই শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়েছে।
দিনাজপুরে দলিত শিশুদের শিক্ষার জন্য একমাত্র স্কুলটির নাম “শ্রী রামকৃষ্ণ আদর্শ শিশু বিদ্যালয়।” দলিত শিশুরা বিশেষ করে হরিজন শিশুরা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত এখানে লেখাপড়া করতে পারে। এরপর তাদের লেখাপড়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোন স্কুল নেই। তারা ভর্তি হয় অন্য কোন সাধারণ স্কুলে। কিন্তু সবাই সেখানে ভর্তি হতে পারেনা। ভর্তি হলেও পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনা। ফলে শিক্ষা জীবন থেকে বেশিরভাগ শিশু ঝরে পড়ে।
শ্রী রামকৃষ্ণ আদর্শ শিশু বিদ্যালয়টি দিনাজপুর শহরের বালুবাড়িস্থ সুইপার কলোনীতে অবস্থিত। স্থানীয় রামকৃষ্ণ আশ্রম হরিজন শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্য নিয়ে এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার পর ঐ শিশুদের ভর্তি হতে হয় বাঙালি অধ্যুষিত স্কুলগুলোতে। পরিবেশগত কারণে এসব স্কুলে সবাই ভর্তি হতে চায়না। ভর্তি হওয়ার পরেও অনেকে ক্লাসে যেতে আগ্রহী হয়না। ফলে তাদের শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে এবং উন্নত ও অগ্রসর জীবন প্রত্যাশার পরিসমাপ্তি ঘটে তাদের।
দিনাজপুরে শিশুদের জন্য যে ক’টি স্কুল আছে তার সবক’টিতে পার্কের মত গড়ে তুলেছে ওয়ার্ল্ড ভিশন নামের একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। শহরের উত্তর বালুবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শহীদ জমিরউদ্দিন বালিকা বিদ্যালয়, সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত দিনাজপুর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়সহ শহরের অনেক বিদ্যালয়ে শিশুদের খেলাধূলা ও বিনোদনের উপযোগি একাধিক ইভেন্ট বসিয়েছে সংস্থাটি। কিন্তু সুইপার কলোনীর একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে এ ধরণের কোন ইভেন্ট দেয়নি তারা। অন্য কোন সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠানও এই স্কুলের শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা করেনি।
গত মাসে এপেক্স ক্লাব অব দিনাজপুরের পক্ষ হতে হরিজন স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে স্কুলব্যাগ ও পিকনিকের জন্য কিছু টাকা দেয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা দারন খুশি। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবন নির্মাণে উদ্যোগ না নিলে এই আনন্দ বেশিদিন টিকে থাকবেনা।
শ্রী রামকৃষ্ণ আদর্শ শিশু বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সর্বমঙ্গলা দেবী বলেন, “এই স্কুলের দূরাবস্থা শুরু থেকেই। কিন্তু এর উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ নেয়নি কেউ। স্কুলটির ভিতরের পরিবেশ সম্পুর্ণরুপে শিক্ষার অনুপযোগি। স্কুল প্রাঙ্গণ যেন একটা জঙ্গল। ক্লাস রুমগুলোয় রং হয়নি শুরু থেকে। নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থাও। শ্যাওলা ধরা স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে ক্লাস করতে ভাল লাগে না শিশুদের।”
হরিজন শিশুদের তুলনায় দিনাজপুরের রবিদাস ও ঋষি সম্প্রদায়ের শিশুদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভাল। তবে তাদেরও ভবিষ্যৎ জীবন নির্মল নয়। এই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় সাধারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এসব বিদ্যালয়ে যে সব সুযোগ-সুবিধা থাকে তা তারাও ভোগ করতে পারে। তাদের অনেকে কলেজ শিক্ষাও শেষ করেছে। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ছে তারা।
দিনাজপুরের দলিত শিশুরা সাংস্কৃতিক অঙ্গণ থেকেও বিচ্ছিন্ন। জেলা শিশু একাডেমিতে দলিত শিশুদের কাউকে দেখা যায়না। শিল্পকলা একাডেমিও দলিত শিশুদের জন্য কোন ভূমিকা রাখছে না। এ সব বিবেচনা করে আগামী দিনে দলিতদের শিশুদের শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করবেন এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।