।। চিররঞ্জন সরকার ॥
যে বিএনপি কোনও রকম রাখঢাক ছাড়া সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা করছে, ‘আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক’ এই অভিযোগের ভিত্তিতে হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধদের ওপর নির্বিচারে হামলা-নির্যাতন পরিচালনা করেছে, ক্ষমতায় থাকাকালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিয়োগ-পদোন্নতি-পদায়ন প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, সেই বিএনপি নেত্রী সংখ্যালঘুদের সচেতন করেছেন আওয়ামী লীগ সম্পর্কে (নিজে কামড়াতে-কামড়াতে শক্তি শেষ, এখন এসেছেন, অন্যের কামড়ের ব্যাপারে সজাগ করতে)! সত্যি সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ, এই দেশের নেতানেত্রীগণ!
সম্প্রতি জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ হচ্ছে সাপ। সাপ যেন দংশন করতে না পারে, সে জন্য সতর্ক থাকবেন।’ আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচনা করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ লোক দেখানোর জন্য বলে তারা ধর্মনিরপেক্ষ। তারা মুখে সুন্দর সুন্দর কথা বলে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নির্যাতন করে। তাদের হাত থেকে কোনও ধর্মের লোক রেহাই পায়নি।’
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকার অদূরে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে ভারতের আধিপত্য বিস্তার হবে, মসজিদে মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি শোনা যাবে।’
খুবই দুঃখজনক যে, ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশে ‘মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনি হবে’ বিএনপি নেত্রীর এমন কট্টর সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুবিদ্বেষী রাজনীতির পর ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুরো দল হিন্দুবিরোধী তাণ্ডবে মেতে উঠে।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে শুরু হয় নজিরবিহীন নির্যাতন। লুণ্ঠন, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পোড়ানো, মারধর ও ধর্ষণ চলেছে নির্বিচারে। আর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় পুরো ব্যাপারটি ঘটেছিল। আবার ২০১৩ সালে যখন ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যায় ও মানবতার বিরুদ্ধে জড়িত অপরাধকারীদের দণ্ডিত করা হলো, তখন বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়ে আবার তাদের পুরনো এবং হিংসার খেলায় মেতে ওঠে। অতীতের মতোই নির্বিচারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটায়। সঙ্গে নতুন যোগ হলো হিন্দু মন্দিরগুলো ভেঙে ফেলার তাণ্ডব। ২০১৪ সালে দশম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পর দলটি আবার চড়াও হয় দেশের আনাচে-কানাচে বসবাসরত হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ সংগঠনটি বিএনপির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত, সমর্থন ও সহায়তা পেয়ে এসেছে। বিএনপি এখন পর্যন্ত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার দায় ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অস্বীকার করা ছাড়া সংখ্যালঘুদের স্বার্থে কী করেছে? বেগম জিয়া কি একটি উদাহরণও দিতে পারবেন? সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রশ্নে আওয়ামী লীগ যদি সাপ হয়, বিএনপি যে, বাপেরও বাপ!
তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে ক্ষেত্রবিশেষে বর্তমান শাসক দলের কোনও কোনও নেতাকর্মীও এ ধরনের অপতৎপরতার সঙ্গে জড়িয়েছেন! সম্প্রতি ফরিদপুরে মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী এক মন্ত্রী জোরপূর্বক বায়নাপত্রে সই আদায় করে বাড়ি ও মন্দির ভেঙে ফেলে তা দখল করে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশিষ্ট আইনজীবী রানা দাসগুপ্ত এই অভিযোগ তোলায় মন্ত্রীবাহাদুর প্রকাশ্য সভায় এই তার ‘চোখ তুলে নেওয়ার’ হুমকিও দিয়েছেন!
সম্প্রতি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে দুর্বৃত্তরা আবারও ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর, দোকানপাট, জায়গা-জমি, দেবোত্তর গির্জা ও বিহারের সম্পত্তি জবর দখলের উন্মত্ততায় মেতেছে। সরকারি দলের এমপি থেকে শুরু করে মন্ত্রী পরিষদের প্রভাবশালী সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের বর্তমান এমপি দবিরুল ইসলাম ও তার ছেলে মাজহারুল ইসলাম জেলার বালিয়াডাঙ্গা উপজেলার রনবাগে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি দখল ও দখলের অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। পিরোজপুরের সাংসদ এমএ আওয়ালের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীর দোকান দখলের অপপ্রয়াসের অভিযোগ উঠেছে। সংসদের হুইপ মাহবুব আরা গিনির বিরুদ্ধে গাইবান্ধার রামকৃঞ্চ মিশন ও আশ্রমের জমি দখল-গাছকাটার অভিযোগ উঠেছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় প্রভাবশালীরা গোপনে এতটাই মানসিক নির্যাতন চালায় ও হুমকি ধামকি দেয় যে অনেকে নিজের ভিটেমাটি জায়গা জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর তা করতে না চাইলে বা প্রতিবাদের চেষ্টা করলে জোর করে কেড়ে নেওয়া হয় তাদের ভূসম্পত্তি। সম্প্রতি পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বেশিকিছু সংখ্যালঘুর জমি দখল করে বসতঘর নির্মাণের এমন কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাতের আঁধারে ঘর তুলে দেওয়া, সামাজিকভাবে ধর্মীয় আচার আচরণে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেওয়ার কথাও বলেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় না; বিচার চাইলে মেলে না, মামলা দিলেও নিতে চায় না পুলিশ। সারাক্ষণ শুধু নিরাপত্তাহীনতা আর সব হারাবার ভয়। এমন অস্থির পরিস্থিতিতে থাকতে না পেরে খুব নীরবেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অনেকেই।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা অকারণে মার খায়, সকাল-সন্ধ্যা মার খায়, দিনের আলোয় কিংবা রাতের আঁধারেও মার খায় । নারীরা নির্যাতিত হয়। জোর করে ধর্ষণ পর্যন্ত করা হয়। যদিও তা এই দেশে আলোচ্য কোনও ইস্যু নয় অথবা শাস্তিযোগ্য অপরাধও নয় । অন্তত এ ধরনের ঘটনায় এদেশে কারও বিচারের মাধ্যমে শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই । বরং এ নিয়ে দু’চার কথা আলোচনা করাটাই সাম্প্রদায়িকতা!
যুদ্ধাপরাধের মামলায় দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর রায় ঘোষণার পরও সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের বিভীষিকা নেমে এসেছিলো। ‘সংখ্যালঘু-বান্ধব’ সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও কোনও ঘটনার কোনও সমাধান হয়নি! রাজনীতির হিসাব নিকাশ বাদ দিলেও, কেবলমাত্র আইনশৃংখলা পরিস্থিতির প্রশ্নেও তো তার একটা বিহিত হওয়ার কথা!
আসলে এ দেশে সংখ্যালঘুরা ফুটবলের মতো ব্যবহৃত হয়। কেবল লাথি খাওয়া। কখনও হালকা লাথি। কখনও বা তীব্র পেনাল্টি কিক। আওয়ামী লীগের লাথি খেয়ে বিএনপির পায়ে। বিএনপির লাথি খেয়ে আওয়ামী লীগের গায়ে। মৌলবাদী জামাতিরা তো শুধু লাথি মেরেই সন্তুষ্ট নয়, পারলে জবাই করে।
আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের ‘পোষা মুরগি’ মনে করে। আওয়ামী লীগারদের ধারণা, সংখ্যালঘুদের যতোই অবজ্ঞা, উপেক্ষা, অত্যাচার করা হোক না কেন, ওরা তো পকেটেই থাকবে। আওয়ামী লীগের আশ্রয় ছাড়া ব্যাটারা যাবে কোথায়? কাজেই বঞ্চনা চালাতে হয়, জুলুম করতে হয় করো! ‘পোষা মুরগি’র আবার আদর কী?
ওদিকে বিএনপি সংখ্যালঘুদের ভারত ও আওয়ামী লীগের ‘দালাল’ বা ‘আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক’ মনে করে। আর এই ‘দালাল’দের যে ভাবে শায়েস্তা করা সম্ভব সে চেষ্টা অত্যন্ত ভালোভাবে চালিয়ে যায়। সংখ্যালঘুদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা না করে সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে এবং আক্রমণ পরিচালনা করে। ভয়-ভীতি, জোর-জবরদস্তি কিংবা বাঁকা কথা বলে যে ‘মন’ পাওয়া যায় না, সে সত্যটা বোঝা বা উপলব্ধির মতো ক্ষমতা তাদের মধ্যে কখনই দেখা যায় না!
জামায়াত- জাতীয়পার্টি সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে বিএনপির আদর্শেরই অনুসারী। কেবল বামপন্থীরাই সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে কিছুটা উদার ও সৎ। কিন্তু এদেশে বাপন্থীদের অবস্থা সংখ্যালঘুদের মতোই সংকটাপন্ন।
যে আওয়ামী লীগকে সংখ্যালঘুর ঠিকানা হিসেবে প্রচার করা হয়, সেই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর সত্যিকার অর্থে সংখ্যালঘুর স্বার্থের অনুকূলে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে- এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। বরং অত্যাচার নির্যাতন, সংখ্যালঘুর সম্পত্তি দখলের প্রতিযোগিতায় তারা অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষায় কেউ আন্তরিক নয়। কিন্তু তদের নিয়ে খেলতে সবাই উৎসাহী।
সংখ্যালঘুরা বিশ্বাস করে যাদেরকেই রক্ষক মনে করেছে, সবাই বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। রক্ষকরাই ভক্ষক হয়ে দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘুরা নিজ দেশকেই ঠিকানা মনে করেছে খুব স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু এই ঠিকানা ভুলিয়ে দেওয়ার আয়োজন চলেছে সব সময়। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির উস্কানি, ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে কোনওমতে গা বাঁচিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু এ দেশে সংখ্যালঘুদের টিকে থাকা অতো সহজ নয়। তাইতো আওয়ামী লীগও সময়ে-সময়ে উদারভাবে এগিয়ে আসে সংখ্যালঘু সংহারে। তাদের জমি দখলের লালসায়! সংখ্যালঘুদের কাছে নৌকা-পাল্লা-ধানের শীষ-সবাই সাপ, সব সাপের একই দংশন, একই বিষ। তবে অন্যদের একটু ভণিতা আছে, চক্ষু লজ্জা আছে। বিএনপি-জামায়াতের তা নেই ! চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে বেগম খালেদা জিয়া কি শোনালেন !