।। রফিক মুয়াজ্জিন ।। সময়ের দাবি মেনে জন্ম হয়েছে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের। এনালগ থেকে ডিজিটাল হচ্ছে সবকিছু। তাহলে সংবাদ মাধ্যম বাদ যাবে কেন? কাগজে ছাপা পত্রিকার স্থলে তাই জায়গা করে নিচ্ছে অনলাইন পত্রিকা।
দিনে দিনে মানুষের ধৈর্য্যও যেন কমছে- আজকের খবরের জন্য আগামীকালের পত্রিকা পড়ার অপেক্ষা করতে চান না অনেকেই। সময়ের খবর সময়মতো জানতেই ক্লিক করছেন অনলাইন পত্রিকায়।
সংবাদ মাধ্যম হিসেবে অনলাইনের বয়স খুব বেশি দিন নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৪ সালে প্রথম ‘নিউজ রিপোর্ট’ নামের একটি অনলাইন পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পরে বিভিন্ন সংবাদপত্র তাদের অনলাইন ভার্সন চালু করে। তবে সত্যিকারের প্রথম অনলাইন পত্রিকা হিসেবে বিবেচিত হয় ২০০০ সালে যুক্তরাজ্যে চালু হওয়া ‘সাউথপোর্ট রিপোর্টার’।
বাংলাদেশে অনলাইন পত্রিকার যাত্রা শুরু ২০০৫ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের হাত ধরে। ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর পুরোপুরি কাজ শুরু বিডিনিউজ।
দেশে এখন অগুনতি অনলাইন পত্রিকা। এ ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠিত কাগুজে পত্রিকার অনলাইন ভার্সনও আছে। আরো আছে সংবাদ ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অনলাইন ভার্সন।
অনলাইন পত্রিকার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রতিযোগিতা। পাঠক আকৃষ্ট করতে চটকদার সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে অনেক অনলাইন পত্রিকা। এ ছাড়া, অ্যালেক্সা রাংকিংয়ে ওপরে ওঠার অঘোষিত প্রতিযোগিতা তো রয়েছেই।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনলাইন পত্রিকার পাঠকদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ। যাদের বয়সের গড় ৩০ এর আশেপাশে। এই শ্রেণির পাঠকদের টানতে এমন কিছু সংবাদ পরিবেশন করা হয়, যার সংবাদমূল্য (নিউজ ভ্যালু) নিতান্তই কম। অনেক সময়, এগুলোকেই ফলাও করে ছাপা হয়। অথচ গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংবাদ এড়িয়ে যাওয়া হয় কিংবা যেনতেনভাবে দেওয়া হয়।
জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ববহ সংবাদ ছাপিয়ে যায় যৌনতা, কেলেঙ্কারী, অপরাধ আর বিনোদনের খবর। কখনো কখনো সংবাদগুলো হয় আকর্ষণীয় ছবি আর চমকপ্রদ শিরোনাম সর্বস্ব। এমনকি শিরোনাম দেখে সংবাদ পাঠ করতে ভেতরে ঢুকলে প্রতারিত হতে হয়। শিরোনামে যা বলা হয়েছে, সংবাদ কাহিনীর সঙ্গে তার সামঞ্জস্য থাকে না।
আরো একটা প্রণতা হলো- যথার্থতার (অ্যাকুরেসি) চেয়ে দ্রুততাকে (টাইমলিনেস) বেশি গুরুত্ব দেওয়া। ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রকাশ করা যেন একটা বাহাদুরি। তবে এর চেয়ে যে বেশি জরুরি খবরের যথার্থতা বা সত্যতা, তা যেন ভুলেই যাচ্ছি আমরা। উড়ো খবর পেয়ে, তা ছাপিয়ে দেওয়া বাহাদুরি হতে পারে না। বরং ঘটনাস্থলে গিয়ে কিংবা বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়ার পরই সেটা পাঠককে জানানো উচিত।
অনেক সময় দেখা যায়, কিছু কিছু অনলাইন পত্রিকা গুজবের ওপর নির্ভর করেই সংবাদ প্রকাশ করে। পরে দেখা যায়, ঘটনা সত্য নয়। বিকৃত বা আংশিক সত্য তথ্যও পরিবেশন করা হয়ে থাকে। তথ্যের যথার্থতা যাচাই না করে তা প্রকাশ করা সাংবাদিকতার নীতির পরিপিন্থী। এমনও হয়েছে- ‘সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫’ শীর্ষক সংবাদ পরিবেশনের কয়েক মিনিট পর লিখেছে ‘সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩’। মানুষ মরে যাওয়ার পর আবার বেঁচে যাওয়ায় সুযোগ নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দুই ব্যক্তি বেঁচে যান কেবল অপসাংবাদিকতার আখড়া কিছু ভূঁইফোড় অনলাইন পত্রিকার জোরে।
মানুষ ভুল করে। সাংবাদিকদেরও ভুল হতে পারে। ভুল যদি হয় বানানে বা বাক্য গঠনে, সেটা ক্ষমা করা যায়। কিন্তু সংবাদে জীবন্ত মানুষকে মেরে ফেলা বা মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার ভুলটা ক্ষমার অযোগ্য। ওপরে যে ভুল সংবাদের কথা বললাম, তাতে না হয় পাঠকের খুব বেশি ক্ষতি হলো না, কিন্তু যে জীবিত মানুষ দুটোকে সংবাদে মেরে ফেললাম, তাদের পরিবারের সদস্যদের তখন কী হবে? হয়ত তারা মৃত্যুর সংবাদ শুনেই হাসপাতালে বা থানায় ছোটাছুটি করবেন। বেঁচে ওঠার খবরের জন্য অনলাইন পত্রিকা খুলে বসে থাকার সময় কোথায় তাদের।
অনলাইন পত্রিকাগুলোর আরেকটি ঘৃণ্য প্রবণতা হলো- চুরি বা নকল করা। অমুকডটকম, তমুকডটকম নামে প্রচুর অনলাইন পত্রিকা আছে এখন। এতে প্রয়োজনীয় লোকবল নেই। যে কয়েকজন আছেন, তাদের অনেকের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নেই। অল্পশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত লোক দিয়ে চালানো হয় এসব নিউজপোর্টাল। প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায়, এরা অন্য সাইট থেকে নিউজ চুরি করে। এমনকি এসব চুরি করা প্রতিবেদনে মূল উৎসের ক্রেডিটও দেয় না।
এসব কুম্ভীলক সাংবাদিকতা (?) করেন একাধিক বিশেষ উদ্দেশ্যে। এসব উদ্দেশের অন্যতম হলো- সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে অবৈধ উপার্জন করা। হেনতেনডটকমের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জনকে লোভ দেখিয়ে বা হুমকি দিয়ে টাকা বা অন্যান্য সুবিধা আদায় করা হয়।
তৈলমর্দন বা তোষণের উদ্দেশ্যেও করা হচ্ছে অনলাইন পত্রিকা। এসব ‘জ্বি হুজুর সাংবাদিক’ দুই লাইন প্রশংসা বাক্য লিখে বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংগঠনের কাছ বিবিধ সুবিধা নিয়ে থাকেন। অপরাধ ও কলঙ্ক ঢাকার অস্ত্র হিসেবেও অনলাইন পত্রিকা চলছে। বিশেষ করে, কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান অপকর্ম ঢাকতে অনলাইন পত্রিকাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন বা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে অনলাইন পত্রিকা। দুয়েকটা কম্পিউটার আর কপি-পেস্টের জন্য কয়েকজন লোক থাকলেই অনলাইন পত্রিকা চালানো যায়। তাই, ছলিমুদ্দিন, কলিমুদ্দিনরাও হচ্ছে নিউজ পোর্টালের মালিক-সম্পাদক।
আর এই অপসাংবাদিকতার ফলে সংবাদ, সাংবাদিক আর সাংবাদিকতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা দিনে দিনে নেতিবাচক হচ্ছে। সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা ও সমীহ তা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক শুনলেই ভ্রু কুঁচকান অনেকেই। ভাবখানা এমন- সাংবাদিকরা ছদ্মবেশে অপরাধী যেন। আর পরিবারের সদস্য আর স্বজনদের দুশ্চিন্তা- ছেলেটা কিছুই করতে পারল না, শেষ পর্যন্ত অনলাইন পত্রিকায় চাকরি করে, আহা আহা!
আমি একটা অনলাইন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করি। কোরবানির ঈদে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ঈদের পরের দিন বাড়ির পাশের ছোট্ট বাজারের চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছি। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় বড় ভাই আলাপের ফাঁকে জানতে চাইলেন- তুমি কী কর?
-সাংবাদিকতা করি। একটা অনলাইন পত্রিকায় আছি।
– আহা, ভার্সিটিত পড়ালেহা করলি। একটা সরকারি চাকরি জোটাতে পারলি না?
-সরকারি চাকরি করতে চাইনি তো।
-এসব দুই নম্বরি চাকরি করার জন্যে ভার্সিটিত পড়ার কি দরকার ছিল?
পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, কয়েক দিন আগে একটা অখ্যাত অনলাইন পত্রিকার স্থানীয় সংবাদদাতা কোনো একটা বিষয়ে তাকে জিম্মি করে টাকা-পয়সা খসিয়েছিল। এই হলো অবস্থা!
সেই সাংবাদিকও আমার পরিচিত। জিজ্ঞাসা করেছিলাম- ওই পত্রিকা কত বেতন দেয়? তিনি জানান, একটা পরিচয়পত্র দিয়েছে শুধু। তার বেতন লাগে না, লোকজন খুশি হয়ে (?) তাকে কিছু টাকা দেয়। পাশাপাশি ছোট ব্যবসাও করেন তিনি।
এত যে হতাশার কথা বললাম, এসবই শেষ কথা নয়। আশার কথাও আছে। সম্প্রতি অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধনের আওতায় আনতে যাচ্ছে সরকার। গত ৯ নভেম্বর তথ্য অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, অপসাংবাদিকতা রোধ এবং পত্রিকার প্রকাশক ও সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তথ্য অধিদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কোনো অনলাইন পত্রিকাকে নিবন্ধন দেওয়ার আগে পুলিশের বিশেষ বিভাগের কর্মকর্তরা ওই অনলাইন পত্রিকার অফিস পরিদর্শন করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেবে।
সময়োপযোগী এ উদ্যোগের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলে যে কেউ অনলাইন পত্রিকা করতে পারবে না। ফলে অপসাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য কমবে। অপসাংবাদিকতা বন্ধ হলে সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের হৃত সম্মান পুনরুদ্ধার হবে।
আর অনলাইন পত্রিকা মানেই অপসাংবাদিকতার চর্চাকেন্দ্র তা নয়। দেশে বেশ কয়েকটি অনলাইন পত্রিকা আছে, যারা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে পাঠকদের আস্থা কুড়িয়েছে।
প্রকৃত অনলাইন সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের জয় হোক।
লেখক : সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।
উৎস: রাইজিংবিডি