সিসি ডেস্ক: নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে গাড়ি থেকে বের করার সাথে সাথে তার মুখে ফুটে উঠেছে হাসির রেখা। কখনো সে রেখা ছিল গভীর কখনোবা ছিল মলিন। তবে এ রেখা মিলিয়ে যায়নি কখনো। উপস্থিত জনতা যখন জুতা হাতে তার ফাঁসির দাবি তুলে ঠিক তখনি তার এ হাসি ইঙ্গিত দেয় অন্য কিছুর। এ দৃশ্য অনেকের কাছে খটকা লাগে। এক সময় কার প্রতাপশালীর সামনে জুতা হাতে মিছিল যেমন তার প্রতাপের খর্বতা জানান দেয়। ঠিক তেমনি বিক্ষোব্ধ মানুষের জুতাকে উপেক্ষা করে বিচারের পরিণতির কথা মাথায় রেখে মুখে হাসি দেয়া যে ছিল একটি গভীর ইঙ্গিত তা সহজেই অনুমান করতে পারে উপস্থিতরা। এতে আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে ভুক্তভোগীসহ এলাকাবাসী।
আদালতে নেয়া ও আনার সময়ে নূর হোসেনের? হাসি তাকে আলোচনার আরো কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
১১ মামলার মধ্যে দু’টি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হলেও নূর হোসেনকে এ পর্যন্ত বিমর্ষ দেখা যায়নি। গত শুক্রবার দুপুরে যখন নারায়ণগঞ্জের আদালতে তাকে হাজির করানো হয় তখনো কোনো ভয় তাকে কাজ করতে দেখা যায়নি। জুতা নিক্ষেপের ঘটনায় কেয়ার ছিল না নূর হোসেনের। বরং তাকে আদালতের এজলাস ও আদালতে নেয়া আনার পথে হাসি মুখেই দেখা গেছে।
এতে প্রভাব পড়েছে সিদ্ধিরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার লোকজনদের মাঝে। চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। মুখ ফুটে কেউ কিছু বলতে না পারলেও চায়ের দোকানে এবং নিজেদের বিভিন্ন আড্ডায় ঘটনাটি বিশ্লেষণ করছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। অনেকে দায়ী করছে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের। আবার কেউ বলছেন, পুলিশের অদূরদর্শিতার ফলে নূর হোসেন ছাড় পাচ্ছে। কেউ কেউ পুলিশের সাথে নূর হোসেনের সখ্যকে দায়ী করছেন। তবে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে চায় না।
নূর হোসেনের এ আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। তিনি জানান, আমাদের দাবি ছিল নূর হোসেনকে আবারো নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করে চার্জশিট দেয়া হোক। তাহলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু নূরের চেহারা দেখে আমাদের কিছু ভয় কাজ করছে। কারণ নূরকে আদালতে নেয়া-আনার সময়ে হাসতে দেখা গেছে।
নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহিদুল ইসলাম বলেন, নূর হোসেনকে জামাই আদর করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তার রিমান্ড না চেয়েই তদন্তকারী পুলিশ প্রমাণ করেছে, তারা নূর হোসেনকে বাঁচতে সাহায্য করেছে। অনেক তথ্য আড়াল করার জন্য তারা রিমান্ড চায়নি। সবকিছু একই সূত্রে গাঁথা। নূর হোসেনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেই বের হয়ে যেত, কারা খুন করেছে, কে টাকা দিয়েছে, এ ঘটনার পেছনে কাদের হাত আছে, নূর হোসেনের কোনো কোনো সহযোগী এর সাথে জড়িত ছিলÑ সবই জানা যেত।
কিন্তু পুলিশ, র্যাব মিলে তা করতে দেয়নি। এটা করে এক দিকে তারা আইন লঙ্ঘন করেছে, অপর দিকে তারা নূর হোসেনের প নিয়েছে। মামলার শুরুতেই ছয় আসামি থেকে ওরা পাঁচজনের নাম বাদ দিয়েছে। তখনই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, পুলিশ অনেক কিছুই গোপন করছে।
এবার দুই কোটি টাকার অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় র্যাবকে দিয়ে নূর হোসেন ছয় কোটি টাকা দিয়ে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম বিউটির অভিযোগ করলেও টাকাসংক্রান্ত নতুন তথ্য দিয়েছে একই ঘটনায় নিহত অ্যাডভোকেট চন্দ্র সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের পরিবার।
ষাটোর্ধ্ব ইব্রাহিমের বাবা ওহাব মিয়া বলেন, ভারত থেকে নূর হোসেনকে বাংলাদেশে আনা হয়েছে। এখন সরকারের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই।
তিনি বলেন, বারদীতে রাস্তার পাশে আমাদের একটা জমি আছে। যেটা আনু দখল করার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনোভাবেই দখল না করতে পেরে পরে সোনারগাঁ থানার হারুন দারোগাকে দিয়ে চারটি মামলা করে। পরে ওই মামলায় ৪৩ দিন জেলে থাকার পর অ্যাডভোকেট চন্দন সাহেব জামিনে মুক্ত করেন।
সেই বিরোধের জেরে আনু ও মজিবর দুই কোটি টাকা দিয়ে নূর হোসেনের সাহায্যে ইব্রাহিমকে ও চন্দন সাহেবকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের পর আনু ও মজিবর নিজে তাদের বাসায় হুমকি দিয়ে এসব কথা বলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, এখন নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসা করলেই জানা যাবে হত্যার সব কিছু। ইব্রাহিম ও চন্দনের বিচার যেন হয়।
ইব্রাহিমের পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে ওহাব মিয়া বলেন, ছেলেটাকে মেরে ফেলেছে। এখন কোনো রকম দিন চলে। ভাত না খেতে পারলেও কারো কাছে মাথ নত করিনি। কোনো রকমে দিন পার করছি।
এ দিকে ইব্রাহিমের মা নূরজাহান বলেন, ছেলেকে মেরে ফেলেছে, এখন আর কি চাওয়ার আছে। ছেলের হত্যার বিচার যেন সুষ্ঠুভাবে হয় এটাই সরকারের কাছে চাওয়া। আমার বুক খালি করেছে আর যেন কারো বুক খালি না করতে পারে।
এর আগে নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি অভিযোগ করেন র্যাবকে ছয় কোটি টাকা দিয়ে নূর হোসেন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
শামীম ওসমান না আইভির লোক নূর হোসেন
বহুল আলোচিত সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন কার লোক? এ প্রশ্ন অনেকের। সাত খুন ঘটনার পর দু’টি অডিও প্রকাশ পায় বিভিন্ন মাধ্যমে। যাতে নূর হোসেন এবং সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ফোনালাপ প্রকাশ পায়। এর কিছু দিন পর প্রকাশ পায় আর একটি অডিও। যার কথপোকথনে উঠে আসে নূর হোসেন।
অপর দিকে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান সাত খুনের আসামি নূর হোসেনকে নারায়ণগঞ্জের মেয়র আইভির কাছের লোক বলে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, কাউন্সিলর হিসেবে আইভির অনেক কাছে চলে আসে নূর হোসেন। আর আমার সাথে একজন দলের কর্মী বা একটি ইউনিয়নের লিডারের যে সম্পর্ক থাকার কথা তার বেশি কিছু নয়। গণমাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এই আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করেন, তার সাথে নূর হোসেনের ফোনালাপ নিয়ে যেসব কথাবার্তা তা মিডিয়ার সৃষ্টি। আমি কোনো দিনই তাকে পালিয়ে যেতে বলিনি। বরং আইনের হাতে নিজেকে সোপর্দ করার কথা বলি। মিডিয়া এ নিয়ে অতিরঞ্জিত করেছে।
শামীম ওসমান বলেন, নূর হোসেন আওয়ামী লীগের একজন কাউন্সিলর। পরে কয়েক দিন তাকে থানার ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল। কিন্তু কী করে বলব কার পরামর্শে সে এমন খুন-খারাবির মধ্যে গেল।
এ কুকর্ম সে অন্য কারো পরামর্শে করতে পারে। মেয়র হিসেবে তার বস ছিল আইভি, তার সাথে নূরের অনেক বেশি ওঠাবসা ছিল। তবে সে কার পরামর্শে এসব করেছে, তা আইন-আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এখন হয়তো আরো কিয়ার হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, সে কোনো বড় মাপের নেতাই নয়। সামান্য কাউন্সিলর মাত্র। তা ছাড়া সে যে কুকর্ম করেছে তা কেউ বরদাশত করবে না। সবাই তার উপযুক্ত শাস্তি চায়। তাই তার শাস্তিতে দলের কোনো তি হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড থেকে নাসিক কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে র্যাব-১১-এর একটি দল। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল ছয়জন ও ১ মে একজনের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দায়ের করা দু’টি মামলার তদন্ত শেষে র্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা ও নূর হোসেনসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা জেলা ডিবি পুলিশ। এর মধ্যে ২২ জন গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দী রয়েছে। আর নূর হোসেনসহ ১৩ জন পলাতক। তবে নূর হোসেন ভারতে গ্রেফতার হয়ে ওই দেশের কারাগারে বন্দী রয়েছে। গত বছরের ১৪ জুন ভারতে তাকে গ্রেফতার করা হয়।