সিসি ডেস্ক: বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধান বন্ধ করে দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ থেকে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা অনুসন্ধান করে মামলা করা হলেও বাকি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার অনুসন্ধান বন্ধ রয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংকের ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা ৫৬ মামলার তদন্ত পর্যায়ে বাকি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লোপাটের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে একজন আইনজীবী বলেছেন, ওই আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা না করে তদন্ত করার সুযোগ নেই।
দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান বলেন, ৫৬ মামলার পর বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির বাকি টাকার বিষয়টি (প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা) তদন্তের সময় দেখা হবে। এরই মধ্যে মামলাগুলোর তদন্ত শুরু হয়েছে। বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাচ্চুকে আসামি করা হবে কি হবে না_ এ বিষয়ে তদন্ত পর্যায়ে দেখা হবে। এ বিষয়ে এখন আর কোনো মন্তব্য করা যাবে না।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে যে অভিযোগ দুদকে পাঠিয়েছে, তার পুরোটাই অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। ৫৬ মামলার বাইরে বাকি আড়াই হাজার কোটি টাকা
অনুসন্ধান না করে তদন্ত করার আইনগত ভিত্তি নেই। অনুসন্ধান পর্যায়ে না দেখে তদন্তে দেখা হবে বলা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো। ফলে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া মেনে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করাই শ্রেয়।
এদিকে দুদকের প্যানেল আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, আইন অনুযায়ী বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির বাকি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আলাদাভাবে অনুসন্ধান করে আলাদা মামলা করতে হবে। ওই অর্থ তদন্ত পর্যায়ে আনার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ওই আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে আলাদা কোম্পানি জড়িত। যাদের বিরুদ্ধে এখনও মামলা হয়নি।
সূত্র জানায়, শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ২০০৯ সাল থেকে গত বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকাকালে ঋণের নামে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছিল দুদকে। দুদক অনুসন্ধান করে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ২১-২৩ সেপ্টেম্বর তিন দিনে ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ মোট ১২০ জনকে আসামি করে ৫৬টি মামলা দায়ের করে। বাকি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৫৯ টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫৬ মামলায় আসামি করা কোম্পানি আর আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত কোম্পানি আলাদা। এ জন্য আলাদাভাবেই সব অনুসন্ধান, মামলা, তদন্ত ও চার্জশিট পেশ করতে হবে।
৫৬ মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘যেসব মামলার অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেগুলোর বাইরে আমাদের তদন্তের ক্ষমতা নেই। বাকি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ৫৬ মামলার আওতার বাইরে। সেগুলো অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। এ নিয়ে আমাদের বলার কিছু নেই।’
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার দীর্ঘ তিন বছর অনুসন্ধান করে প্রায় ৪০টি কোম্পানির বিরুদ্ধে ওই ৫৬ মামলা করা হয়েছে। ওইসব মামলার প্রায় ২ মাস পরও আরও ৫০-৫৫ কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধান শুরু করা হয়নি।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুদকে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। গত ২০১৩ সালের মার্চে বিবরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ওই চার বছর তিন মাসে ব্যাংক থেকে ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়, যার সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে গত বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছয় বছরে ওইসব ঋণ প্রদান করা হয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ওই সময়কার চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নির্দেশেই। ওই সময় ৩২টি ঋণ প্রস্তাব শাখা ব্যবস্থাপক ও এমডির মাধ্যমে পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়নি। অথচ সাবেক চেয়ারম্যানের নির্দেশে ওই ৩২টি ঋণ প্রস্তাব (রেজ্যুলেশন) তৈরি করে সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়। পরে ওইসব ঋণ প্রদান করা হয়।