সিসি ডেস্ক: ২০০৩ সালে কাগজের দিস্তা ছিল ৬ টাকা; ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা। এ সময়ে অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের দামও বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে পোশাক তৈরির খরচও। অথচ একযুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রাথমিক বৃত্তির পরিমাণ আগের ১০০ টাকাই রয়ে গেছে। টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি না করায় প্রাথমিক উপবৃত্তির মূল্যমান কমে অর্ধেকে নেমেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ ও অংশগ্রহণের হার বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০০৩ সালে সরকারিভাবে দেশব্যাপী উপবৃত্তি প্রদান প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পোশাক-পরিচ্ছেদ ও খাতা-কলমসহ আনুষঙ্গিক শিক্ষা উপকরণ কিনতে শিক্ষার্থীপ্রতি মাসিক ১০০ টাকা করে উপবৃত্তি প্রদান শুরু হয়। শুরুর দিকে বছরে ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পারায় প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের হারও অনেক বেড়ে যায়। তবে পোশাক ও স্টেশনারিসহ আনুষঙ্গিক শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ায় বর্তমানে ১০০ টাকায় প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, গত কয়েক বছরে খাতা, কলম ও স্কুল ড্রেসের ক্রয়মূল্যসহ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। অথচ সে অনুযায়ী বাড়ানো হয়নি বৃত্তির টাকার পরিমাণ। ফলে এ ব্যয় নির্বাহ করতে না পারায় ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। আমরা ঝরে পড়া রোধের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছি না।
প্রাথমিক উপবৃত্তির মূল্যমান হ্রাসের এসব তথ্য উঠে এসেছে ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন স্টাইপেন্ডস: আ কোয়ালিটেটিভ অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। প্রাথমিক বৃত্তি নিয়ে সম্প্রতি যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও জাতিসংঘের শিশু অধিকার-বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
প্রতিবেদনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মাসে ১০০ টাকা হারে যে উপবৃত্তি দেয়া হতো, বর্তমানেও তা অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি না করায় মূল্যস্ফীতির ফলে ২০০৩ সালের বৃত্তির ১০০ টাকার প্রকৃত মূল্য ২০১২ সালে এসে ৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
চালের দামের সঙ্গে তুলনা করে প্রাথমিক উপবৃত্তির একটি চিত্র তুলে ধরা হয় পিপিআরসির ওই প্রতিবেদনে। সেখানে দেখানো হয়, ২০০৩ সালে ১০০ টাকায় ৭ কেজি চাল কেনা যেত। ২০১২ সালে এসে ১০০ টাকায় চাল পাওয়া যায় ৩ দশমিক ৭ কেজি। সেই হিসাবে আগের তুলনায় এখন ১০০ টাকার মূল্যমান দাঁড়ায় ৫০ দশমিক ৫১ টাকা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে ২০০৩ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রদান প্রকল্প চালু করা হয়। কোনো পরিবারের এক শিশুর জন্য মাসিক ১০০ এবং দুই সন্তানের জন্য মাসিক ১২৫ টাকা হারে বৃত্তি দেয়া শুরু হয়। ২০১৫ সালে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের ৭৮ লাখ শিক্ষার্থীকে এ উপবৃত্তি প্রদান করা হয়। এরই মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি প্রদান প্রকল্পটির দুটি পর্যায়ের মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন করে তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে, যা পরিকল্পনা কমিশনে বিবেচনাধীন রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে উপবৃত্তি প্রকল্প চালু করার পর শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের হার বাড়লেও ঝরে পড়ার হার এখনো অনেক বেশি। সরকারি হিসাবেই বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার ২০ শতাংশেরও বেশি। ঝরে পড়া রোধে উপবৃত্তির পরিসর এবং পরিমাণ দুটিই বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে পিপিআরসির চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রাথমিক বৃত্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখি, ২০০৩ সালের প্রাথমিক বৃত্তির টাকার মূল্যমান কমে অর্ধেকে গিয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। তাই আমরা সরকারকে বৃত্তির টাকার পরিমাণ ১০০ থেকে ২৫০ টাকা করার পরামর্শ দিয়েছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে যে উপবৃত্তি দেয়া হয়, তার আর্থিক মূল্যমান কমেছে বিষয়টি সত্য। বৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়াতে হলে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে বৃত্তির টাকার পরিমাণ না বাড়ালেও বিনামূল্যে বই ও খাবার বিতরণসহ শিক্ষার্থীদের জন্য আনুষঙ্গিক সুবিধাদি বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আগে শিক্ষার্থীদের কিছু অংশ প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি পেত। বর্তমানে আমরা শতভাগ শিক্ষার্থীকে এ প্রকল্পের আওতায় আনতে চাচ্ছি। বিষয়টি পরিকল্পনা কমিশনের বিবেচনাধীন রয়েছে।