।। তানবীরা তালুকদার ।। সম্প্রতি ডাচ টিভি ‘নেদারল্যান্ড ওয়ানে’ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মুক্তচিন্তক নাজিমুদ্দিন সামাদের হত্যাকাণ্ড দেখিয়েছে। বলেছে, এথিস্ট হওয়ার কারণে সামাদকে খুন করা হয়েছে।
গত শুক্রবার সকাল, কাজের চাপ কম, কলিগরা আলোচনা করছিল, সামনে গরমের ছুটিতে কে কোথায় যাবে। আলোচনা তাসকিনের বলের মতো ঘুরতে ঘুরতে আমার টেবিলে এসে পড়ল, বাংলাদেশে গেলে কেমন হয়?
আমি মুখ খোলার আগেই আমার অন্য কলিগ বলল, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবস্থার বয়ান। একজন বলল, তোমরা কি মুসলিম? অন্যজন জবাব দিল, হোয়াট এলস, অন্য কোথাও কি হয় এমন অবস্থা?
তারপর শুরু হলো লেগ পুলিং, আমরা তো জানতাম না বাংলাদেশ এত এক্সট্রিমিস্ট। তোমাকে দেখে তো ধারণা করা যায় না। বসকে বলতে হবে নিচে এক্সরে মেশিন লাগাতে, তুমি বোম, চাপাতি, কী না কী নিয়ে ঢুকবে, তোমাকে পুরো স্ক্যান করে ঢোকাতে হবে। তোমাকে তো আমরা স্বাভাবিক-সাধারণ মানুষ মনে করেছিলাম। কাউকে বিশ্বাস নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।
কলিগরা ‘আল্লাহু আকবার’ ডাক দিয়ে দিয়ে একজনের পানির বোতল অন্যজনকে ছুড়ে ছুড়ে আইএস-আইএস, বোকো হারাম-বোকো হারাম খেলছে। ওদের সাথে শুকনো পাটকাঠিমুখ করে হাসিতে যোগ না দিয়ে উপায় নেই। কিন্তু ভেতরটা ময়নাকাঁটার ঘায়ে রক্তাক্ত। না, ধর্মের জন্যে নয়; মাতৃভূমির নামের অপমানের কারণে, জাতীয়তাবোধ অপমানিত হওয়ার কারণে। গরিব বলে পরিচিত তো ছিলামই, এখন সাথে সন্ত্রাসী উপাধিও যোগ হচ্ছে।
মনে মনে ভাবছিলাম, হে বাংলাদেশ, কোথায় যাচ্ছো তুমি!
এখন থেকে বাংলাদেশ শুনলে পশ্চিমা পৃথিবী আমাদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাবে, শুরু হবে থানা তল্লাশি সব জায়গায়। আমরা তো সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিলাম বিদেশে আমাদেরকে তাদের স্তরের সাধারণ-স্বাভাবিক মানুষ বলে প্রমাণ করতে; নিজের দেশের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি উপস্থাপন করতে। কিন্তু ভোটের রাজনীতির কাছে আমরা নিদারুণভাবে পরাজিত হলাম। ঠিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশ-ভারত খেলার মতো, জেতা খেলা অন্যে নিয়ে নিল। হয়ে গেলাম শেষ পর্যন্ত উপহাসের পাত্র। এই উন্নতি, এই জিডিপি দিয়ে আমরা কী করব? আমাদের পরিচয় কি সৌদি আরবের মতো ‘টাকাওয়ালা অমানুষ’ হবে?
‘বিচ্ছিন্ন আলোচনা’ বলে আমার কথাগুলো অনেকেই আজ পাশ কাটিয়ে যেতে পারবে হয়তো। আমি জানি, এখন কর্মক্ষেত্রে আমার মতো অনেক বাংলাদেশিই এ ধরনের আলোচনা, উপহাসের সম্মুখীন হবে। কিন্তু ক’দিন পর থেকে যখন বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলে জায়গায় জায়গায় স্ক্যানিং শুরু হবে তখন আর পাশ কাটানোর উপায় থাকবে না। আর এই স্ক্যানিং থেকে আমাদের মন্ত্রীরাও বাদ যাবে না। দেশে তারা যতরকম ভাবের মূর্তিই হয়ে থাকেন না কেন, বিদেশে তাদের কী সম্মান আর আদর মেলে সে তো সকলেই জানে।
আমেরিকা যদি শুধু নামের কারণে শাহরুখ খানের জুতো পর্যন্ত খুলিয়ে চেক করতে পারে তাহলে বাংলাদেশের মন্ত্রীদের চাড্ডি খুলিয়ে স্ক্যানিং করানোর দিন আর দূরে নয়।
সেদিনের অপেক্ষায়… তাদের খোঁড়া গর্তে কী করে তারা গড়াগড়ি খাবেন, দেখতে হবে কথিত মৌলবাদী দল বিএনপি-জামায়াতের অন্য সকল অর্জনের সাথে এই অর্জনকেও ম্লান করে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে কথিত সেক্যুলার দল আওয়ামী লীগ।
লেখক : কথাসাহিত্যিক