এছাড়া প্রকল্পটি ছিল মূলত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির পরিচয় করিয়ে দেওয়া, যাতে পরবর্তীতে তারা এর সুফল সম্পর্কে বুঝতে পারে। ব্যর্থতার কারণ হিসেবে শিক্ষকরা বলছেন, ক্লাসরুম আকর্ষণীয় ও তথ্য প্রযুক্তি সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের জ্ঞান সমৃদ্ধ হচ্ছেনা। পরীক্ষার ফলাফলেও এর কোনও প্রতিফলন দেখা যাচ্ছেনা। এক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ী করছেন তারা।
তথ্য প্রযুক্তি বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেভাবে এর সুফলটা পাওয়ার কথা সেভাবে পাওয়া যাচ্ছেনা। ডিজিটাল ক্লাসরুম থাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার অনেক কমে আসার কথা থাকলেও তেমন ফল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে পরীক্ষার ফলাফলেও এর তেমন প্রভাব দেখা যাচ্ছেনা।
এদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মাত্র ১৭০ বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি কক্ষ মাল্টিমিডিয়া করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। আইডিবি এটির প্রধান ডোনার এজেন্সি।
জানা গেছে, ২০১১ সালে চার বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেয় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর। ওই প্রকল্পে বলা হয়েছিল, সারা দেশ থেকে ২০ হাজার ৫শ’টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় একটি করে কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম স্থাপন করা হবে। সে জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে একটি করে ল্যাপটপ, ইন্টারনেট মডেম,স্ক্রিনসহ মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর এবং সাউন্ড সিস্টেম।পরে এ প্রকল্পের কিছু টাকা অব্যবহৃত থাকায় পরবর্তীতে আরও কিছু সংখ্যক স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসাকে প্রকল্পের আওতায় যুক্ত করা হয়।
মাউশি’র প্রকল্পটির পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ওই প্রকল্পটি চালু করার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদেরকে এর সুফল সম্পর্কে জানানো। যাতে তারা বুঝতে পারে তাদের এই জিনিসগুলো দরকার।এছাড়া কিছু ব্যর্থতা তো রয়েছেই।
কিন্তু গত বছরের জুন মাসে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে প্রকল্পের ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা হয়। শিক্ষকরা বলছেন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা, দ্রুত গতির ইন্টারনেট সংযোগ নেই, টানা লোডশেডিং, এমনকি তাদের ঠিক মত প্রশিক্ষণেরও অভাব রয়েছে।
বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ, ইন্টারনেট মডেম, প্রজেক্টর, প্রজেক্টরের স্ক্রিন এবং সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারই করা হয়নি।
রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুলে গিয়ে এ তথ্যের সত্যতাও পাওয়া গেছে। রাজধানীর আজিমপুরসহ বেশ কয়েকটি স্কুলে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বেশ কিছু যন্ত্রপাতি পেয়েছেন, অথচ তা ব্যবহার করেননি। কারণ, হিসেবে তারা জানান, ক্লাস রুমের সংকট রয়েছে। তাছাড়া, ক্লাসরুমের অবস্থাও ভালো না, ফলে ব্যবহারের সঠিক পরিবেশ নেই। এছাড়া বেশ কয়েকটি স্কুলের আলমারিতে ল্যাপটপসহ অন্যান্য জিনিস যত্ন করে তুলে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষকরা নিজেরাই ভালো মতো কম্পিউটার ব্যবহার করতে জানেন না। এর সত্যতাও পাওয়া গেল এক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে। পুরাণ ঢাকার রহমতুল্লাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক আইসিটি শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান,আমরা চেষ্টা করি শিক্ষার্থীদেরকে ঠিকমত শেখাতে, কিন্তু আমরাই তো ঠিকমত প্রশিক্ষণ পাইনা। তারা ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতেও পারেননা বলেও জানান।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমি নিজে অনেক স্কুল মনিটরিং করেছি। সেখানে গিয়ে দেখেছি শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে ল্যাপটপ, প্রজেক্টর ধরতে দেননা। এমনটি হলে তো শিক্ষার্থীরা কিছুই শিখতেই পারবেনা । কারণ শুধু প্রজেক্টরের একটি ছবি ভাসবে সেটা দেখে শিশুরা কি শিখবে। ভিজ্যুয়ালে কি দেখানো হবে সেটাও তো বুঝতে হবে। কনটেন্ট তৈরি করতে হয়। কিন্তু অনেক শিক্ষক কনটেন্ট তৈরিও করতে জানেন না। তাদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।
‘শিখন ও শিক্ষণ’ পদ্ধতির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হলেও এর ফলাফল খুব একটা ভালো নয় বলে ইউএনডিপি ২০১৪ সালে প্রকল্প চলাকালীন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ইউএনডিপি পরিচালিত ওই স্টাডি রিপোর্টে উঠে আসে এ পদ্ধতির ব্যর্থতার তথ্য। ইউএনডিপি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে এমন ১০৮টি স্কুল, ১৬টি কলেজ এবং ৪৩টি মাদ্রাসাকে স্টাডির আওতায় আনে।
পরে এক প্রতিবেদনে তারা জানায়, মাত্র ৬ শতাংশ শিক্ষক কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ, ১২ শতাংশ ই-মেইল ব্যবহারে এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পরিচালনা ও পাওয়ার পয়েন্ট তৈরিতে মাত্র ১ শতাংশের দক্ষতা রয়েছে। মাদ্রাসার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৩ শতাংশ শিক্ষক ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ, ৮ শতাংশ দক্ষ মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরিতে এবং ১১ শতাংশের দক্ষতা রয়েছে ই-মেইল এ্যাকাউন্ট খুলতে এবং ব্যবহার করতে। অন্যদিকে কলেজ শিক্ষকদের মধ্যেও এমন অদক্ষতার বিষয়টি উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে।
কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার বলেন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের নয় ডিজিটাল সিস্টেমে শিক্ষা দেওয়ার যে পরিকল্পনা রয়েছে সেটিই ত্রুটিপূর্ণ সারা পৃথিবীতে যেভাবে এই কাজটি করা হয়, তার থেকে অনেক নিম্নমানের পদ্ধতি এই দেশে চালু রয়েছে। এখানে যেসব সিস্টেম রাখা হয়েছে তা অনেক সমস্যার।শিক্ষার্থীদেরকে শেখাতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কনটেন্ট তৈরি।কিন্তু শিক্ষকদের দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করা হয়, একাজে তারা একেবারেই অদক্ষ। তাছাড়া তারা শিক্ষার্থীদের ঠিকমত বোঝাতেও পারেন না। আসল কথা হলো, অনেক গলদ রয়েছে এই পদ্ধতির মধ্যে।
তিনি আরও বলেন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনার জন্যে দরকার ডিজিটাল ক্লাসরুম, ডিজিটাল কনটেন্ট, ডিজিটাল ডিভাইস এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানে দক্ষ শিক্ষক।
উৎস: বাংলা ট্রিবিউন