সিসি ডেস্ক: প্রতিদিন নিয়ম করে সূর্য পশ্চিমাকাশে অস্ত যায়। প্রকৃতির বুকে সন্ধ্যা নামে। ঘরে ফিরতে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ। আর নগরবাসীর নিরাপত্তায় তখনো নগরের বিভিন্ন মোড়ে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন পুলিশ সদস্যরা। সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, পুলিশকে তখন চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। রাস্তার এ-মাথা থেকে ও-মাথায় টহল, আবার কখনো ঠায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোনো কারণে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হলে তখন তো কথাই নেই। রাত-দিন কেটে যায় রাস্তায় রাস্তায়। সেখানেই খাওয়া-দাওয়া। বিশ্রামের জন্য যেটুকু সময় পান, সেই সময়ও অপেক্ষায় থাকতে হয়-এই বুঝি কোনো নির্দেশ এলো। তাদের দিন কাটে রাস্তায় রাস্তায়, রাত কাটে নির্দেশের অপেক্ষায়। আবার সন্ত্রাসী হামলায় অকাতরে প্রাণও হারাতে হয় এই পুলিশ সদস্যদের।
চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই পারিবারিক ও সামাজিক জীবনযাত্রা, যথেচ্ছ চলাচল, আরামের ঘুম সবই হারিয়ে যায়। অধিকাংশ পুলিশ সদস্যকে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়। একটানা কাজ করতে গিয়ে অনেকের জীবনীশক্তি ক্ষয়ে যায়, রোগবালাই হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী। সরকারি অন্যান্য সার্ভিসের কর্মচারীরা যখন ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ করেন তখনো পুলিশকে রাস্তায় দাঁড়িয়েই দায়িত্ব পালন করতে হয়। হরতালের সময় পুরো অফিসপাড়ায় যখন ছুটির আমেজ, তখন রায়ট গিয়ার পরে পুলিশকে থাকতে হয় মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে। বোমা-গুলির শব্দে সবাই যখন জান-মাল রক্ষায় পালাতে ব্যস্ত, তখনও পুলিশকে ছুটে যেতে হয় বোমা-গুলির চরম ঝুঁকির স্থানে। পুলিশের ঘুমানোর যেমন নির্দিষ্ট সময় নেই, তেমনি আদৌ ঘুমানোর সুযোগ মিলবে কি না তারও নেই নিশ্চয়তা। কয়েক মিনিটে সারতে হয় প্রাকৃতিক কাজ ও প্রাতঃরাশ, এর পরই ছুটতে হয় কর্তব্য পালনে। কনস্টেবল থেকে শুরু করে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত প্রায় অভিন্ন রুটিন বজায় থাকে। রাষ্ট্রের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে জনসেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশের ভাল দিকগুলো কেউ দেখতেও চায় না! বা আলোচনায় আসে না, সবাই পুলিশের খারাপ দিকগুলো তুলে ধরতে ব্যস্ত। পুলিশ কোন ভাল কাজ করলে সেটা তার দায়িত্বের অংশ হয়। মন্দ কাজ করলে দায়িত্বের অতিরিক্ত হয়। আর ভাল-মন্দ যখন কোনটাই ঘটে না, তখন পুলিশ নিষ্কর্মা।
আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুসারে কোন জবই ৮ ঘণ্টার বেশি হবে না, তবে যদি শ্রমিক/কর্মচারি স্বেচ্ছায় করতে রাজি থাকে তাহলে তাকে রেগুলার বেতন থেকে দেড় গুন বেতন দিতে হবে অতিরিক্ত সময়ের জন্য। এখন একটু ভাবুনতো পুলিশ কয়ঘণ্টা ডিউটি করে? ১২ ঘণ্টা অন স্পট, যাতায়াত সহ ১৩ ঘণ্টা লাগে, প্রস্তুতি নিতে আরো এক ঘণ্টা লাগে। অতিরিক্ত ৪/৬ ঘণ্টার জন্য দেড়গুনতো দূরের কথা একটি পয়সাও পায় না। একজন গার্মেন্টস কর্মীও সেটা পায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্যের মানবাধিকার রক্ষার কথা বলা হলেও পুলিশ নিজেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার। তাই সুশাসনের স্বার্থে এই বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ তাদের।
প্রায় আট হাজার পুলিশ সদস্যের আবাসস্থল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস। তবে সেখানে কোনো পুলিশ সদস্যের নির্দিষ্ট কোনো বিছানা নেই। পালা করে একাধিক পুলিশ সদস্য থাকছেন একেকটি বিছানায়। ছারপোকার কামড় তাদের নিত্যসঙ্গী। ব্যারাকে ঘুমানোর মতো নির্দিষ্ট কোনো আসন বরাদ্দ নেই এমন পুলিশ সদস্যের হার কমপক্ষে শতকরা ২৫ ভাগ। শুধু থাকার কষ্টই নয়, পুলিশ সদস্যদের খাবারের সমস্যা আরও প্রকট। রাজারবাগ লাইনসে খাবার খেলে কিংবা না খেলেও মেস ম্যানেজার পুলিশ সদস্যদের বরাদ্দকৃত রেশনসামগ্রী তুলে নিচ্ছেন। না খেয়েও খাওয়ার খরচ গুনতে হচ্ছে ছুটি ভোগকারী পুলিশ সদস্যদের। আগের রাতের রান্না করা সবজি পরিবেশন করা হচ্ছে পরের দিনের তিন বেলা। কেবল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস নয়, একই চিত্র দেশের প্রায় প্রতিটি পুলিশ লাইনসের পুলিশ সদস্যদের।
আক্ষেপের সুরে কথাগুলো জানান রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ব্যারাকের এক সহকারী উপ-পরিদর্শক। : ‘আমাগো কেউ মানুষ বলে মনে করে না। কোনো সরকারই আমাগো কষ্ট বুঝতে চায় না। শুধু খাটায়া নেয়। সারা দিন খাটনির পর রাতে ব্যারাকে ফিরাও দেখি পানি নাই, বিদ্যুৎ নাই। খাবারও নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে নোংরা পোশাকেই আবার ডিউটিতে বাইর হওয়া লাগে। কোথায় যাব কন? আমরা কি আসলেই মানুষ!’ নীলক্ষেত মোড়ে দায়িত্বরত একজন ট্রাফিক কনস্টেবল বলেন, আমাদের থাকার মতো কোনো বাসস্থানের ব্যবস্থা নাই। কাঠফাটা রোদে কমপক্ষে আট ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়। মাসে আমাকে ট্রাফিক অ্যালাউন্স বাবদ দেওয়া হয় মাত্র ২৩ টাকা। এই গরমে একটি ডাব খেতেও ৫০ টাকা লাগে। আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে সত্যতা মেলে তাদের এই ‘অন্য জীবনের’।
রমনা বিভাগের উপকমিশনার সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আসলে ওদের কষ্টগুলো আমরা বুঝি। কিন্তু কী করব বলুন। আমরাও তো সমস্যার বাইরে নই। হরতালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ধরনের দৈব দুর্বিপাকে পুলিশকেই বেশি দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর পরও আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করি নিচের স্তরের পুলিশ সদস্যদের সমস্যার সমাধান করতে।’
পুলিশ সদস্যদের কাছে ‘ছুটি’ যেন সোনার হরিণ। পাওনা ছুটি চাইতে গেলেও পুলিশ সদস্যদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। টাকা ছাড়া ছুটি মেলে না তাদের। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের এক কনস্টেবল বলেন, ‘ছুটি চাইলেই স্যারেরা ক্ষেপে যান। তা ছাড়া ছুটির ফরম পূরণ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠতে হয়।
আস