।। রীতা রায় মিঠু ।। যে তিনজন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে, তার মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপের স্বত্বাধিকারী লতিফুর রহমানের কিশোর নাতি ফারাজ আছে। ফারাজ আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় এমরী ইউনিভারসিটির ছাত্র ছিল। এমরি ইউনিভারসিটিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়া কিন্তু অত সহজ নয়। মেধাবীরাই এসব ইউনিভারসিটিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। অকালে চলে যাওয়া ফারাজ যে অত্যন্ত মেধাবী ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার মেজো কন্যাও পাবলিক হেলথে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছিল। এই ইউনিভারসিটিতে পড়ার সময় ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর প্রজেক্টে কাজ করার এসাইনমেন্ট নিয়ে মিশা দেশে গেছিল ২০১৩ সালের সামারে। তখন দেশে চলছিল শাহবাগ আন্দোলন, রাজীবকে হত্যা করা হয়েছে, টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই মিশা দেশে গেলো। যাবেইতো, দেশটা ওর, নাড়ির টান আছেনা? সদ্য তরুণী হয়ে ওঠা মিশা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েই আমার নাকের ডগা দিয়ে চলে গেলো দেশে।
১৯ বছর বয়সী ফারাজও নাড়ির টানেই এবছর সামার ভ্যাকেশানে দেশে গেছিলো।
ফারাজের মা সিমিন হোসেন এবং বাবাকে টিভিতে দেখেছিলাম, পুলিশের কাছে সন্তানের খোঁজ জানতে চাইছিলেন। বাবা মায়ের আকুতি দেখে বুকে খুব যন্ত্রণা হচ্ছিলো, কিন্তু মনে মনে আশা করছিলাম, ছেলে জীবিত অবস্থায় বাবা মায়ের বুকে ফিরে আসবে।
ফারাজের ছবি দেখে হৃৎস্পন্দন থেমে যাওয়ার অবস্থা, মুখখানায় এখনও কৈশোরের নিষ্পাপ দুষ্টুমির ছাপা মাখামাখি হয়ে আছে। গেছিলো বাবা মায়ের কাছে, বন্ধু স্বজনের সাথে ঈদ করবে বলে। অথচ ওরই কাছাকাছি বয়সী কিছু তরুণের হাতে ওর প্রাণ চলে গেলো!
ফারাজ পড়তো আমেরিকার এমরী ইউনিভারসিটিতে, হত্যাকারী তরুণদের একজন নাকি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। মনে পড়ে, আমেরিকার জেলে নাফিস নামের যে ছেলেটি আজ বার্গার খাচ্ছে, সেও নর্থ সাউথ ইউনিভারসিটির ছাত্র ছিল, আমেরিকা এসেছিল রিজার্ভ ব্যাংক উড়িয়ে দেয়ার মিশন নিয়ে। রাজীবকে যারা হত্যা করেছিল, তারাও নাকি নর্থ সাউথ ইউনিভারসিটির ছাত্র ছিল। এটা কি করে হয়, ভাবতেই কেমন লাগে!!! নর্থ সাউথ ইউনিভারসিটি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে একটু ভাববেন কি?
** বাংলাদেশের বাবা মায়েরা একটু সজাগ হোন, কিশোর ছেলের গতিবিধি লক্ষ্য করতে শুরু করুন, ” আমার ছেলে খুব ধার্মিক, আমার ছেলে খুব শান্ত, কারো সাথে আড্ডা দেয়ন! মুভী দেখে , গান বাজনা শুনে সময় নষ্ট করেনা” —- এটা কিন্তু বগল বাজিয়ে আনন্দ করার ব্যাপার নয়। এটি এই বয়সী ছেলেদের জন্য অস্বাভাবিক, বাপ মায়ের জন্য অ্যালার্ট হওয়ার একটি ক্লু!
ধার্মিক পিতা মাতার সন্তান এমনিতেই ধার্মিক হবে, সব কিছুর জন্য নির্দিষ্ট বয়স থাকে। যে বয়সে ছেলে খেলাধূলা করবে, বন্ধুদের সাথে হাসাহাসি করবে, কার্টুন দেখবে, গান শুনবে, প্রেমে পড়বে——তা না করে ছেলে জন্মেই যদি পরকালের চিন্তা করতে থাকে, সেটি অস্বাভাবিক নয় কি?।
আমেরিকায় ৩০ বছরের জন্য কারাদন্ড পাওয়া সেই নাফিসও কিন্তু খুব ধার্মিক ছিল, শান্ত ছিল, কোন আড্ডায় যেতোনা, সারাক্ষণ ধর্ম চিন্তায় মগ্ন থাকতো। নাফিসের বাবা মা ধার্মিক ছেলের আচরণে নিশ্চিন্ত ছিলেন, এই নিশ্চিন্ততাই ‘কাল’ হয়ে এসেছে তাদের জীবনে। নাফিসের বাবা মায়ের কথা ভেবে আমি কত রাত কেঁদেছি।
সজাগ হোন, পরকালের চিন্তায় মগ্ন নিজের সন্তান যেন অন্যের সন্তানের প্রাণ হরণের দায় মাথায় না নেয়। আপনার সন্তান হয়তো পরকালের জন্য প্রস্তুত হয়, অন্যের সন্তানতো পরকালে যাওয়ার কথা ভাবেনা, তাহলে কেন তাদের প্রাণ হরণ করবে আপনার ছেলে?**
ফেসবুক থেকে নেয়া