সিসি ডেস্ক: জামায়াত-শিবির পরিচালিত কোচিং সেন্টার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই জঙ্গিবাদী তৎপরতা ও সরকারবিরোধী নাশকতামূলক কর্মকা- পরিচালনা হচ্ছে। জামায়াত-শিবিরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শতাধিক কোচিং সেন্টার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জঙ্গিবাদী তৎপরতায় লিপ্ত বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শিক্ষার আড়ালে এসব প্রতিষ্ঠানে তরুণদের বিপথগামী পথে জড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকা-ের জন্য শতাধিক কোচিং সেন্টার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে গত বছরের শেষদিকে গোয়েন্দা নজরদারিতে নিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কিন্তু থেমে নেই জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রশিবির’র তৎপরতা। ‘এসো নবীন দলে দলে, ছাত্রশিবিরের পতাকা তলে’, এবং ‘দাবার চালে ভুল করিলে রাজা খতম, সঠিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল ভর্তির জন্য সঠিক কোচিং না চিনিলে আপনি খতম’- এই ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশব্যাপী নিজেদের কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী কর্মকা- চালাচ্ছে জামায়াত-শিবির।
অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল ও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
জামায়াতের যত কোচিং সেন্টার:
শিক্ষা বিকাশের নামে অবৈধভাবে ‘ভর্তি কোচিং সেন্টার’ পরিচালনা করে দীর্ঘদিন ধরেই তরুণদের জঙ্গিবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, জামায়াত-শিবির নেতারা যেসব কোচিং সেন্টার পরিচালনা করছে সেগুলোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির রেটিনা ফোকাস, ফেমাস, সাকসেস, কনসেপ্ট, কনটেস্ট, প্রবাহ, প্রতিভা, ইনডেঙ্, রেডিয়াম, আল্টিমাম কোচিং সেন্টার, কনক্রিট ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি কোচিং সেন্টার অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের মনোযোগ ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন জঙ্গি হামলায় ওই সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও বেড়েছে।
কীভাবে চলে রেটিনা ও ফোকাস কোচিং সেন্টার : রেটিনা হচ্ছে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি কোচিং সেন্টার। এটি দেশে মেডিকেল পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ভর্তি কোচিং সেন্টার, যা সরাসরি ছাত্রশিবির পরিচালিত। ১৯৮০ সালে ছাত্রশিবিরের নেতারা রেটিনা প্রতিষ্ঠা করে। রেটিনা ফাউন্ডেশনের মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল অ্যাডমিশন কোচিং ‘রেটিনা’। এর প্রথম পরিচালক ছিলেন সোহরাব হোসেন, যিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। সারাদেশে রেটিনার কমপক্ষে এক ডজন শাখা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ছাত্রশিবিরের সব কোচিং সেন্টারের মুনাফার একটা বড় অংশই সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সহযোগিতা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘চিটাগাং ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট রিচার্স ফাউন্ডেশন’ পরিচালিত ‘ইনডেঙ্ কোচিং সেন্টার’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবদুল মালেক ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘ফোকাস’, কনক্রিট ফাউন্ডেশনের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার ভর্তি কোচিং ‘কনক্রিট’ ও প্রবাহসহ মোট ৫টি কোচিং সেন্টার শিবির নেতারা পরিচালনা করে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শিবির সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ নাঈম ও সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ শিহাব উল্লাহ যথাক্রমে ইনডেঙ্রে প্রধান পরিচালক ও পরিচালক ছিলেন। চবি শিবির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদাধিকার বলে ইনডেঙ্রে প্রধান পরিচালক ও পরিচালকের পদে থাকে।
ছাত্রশিবির পরিচালিত সবচেয়ে বড় কোচিং সেন্টার ‘ফোকাস’। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিহত ছাত্রশিবিরের সাথী আবদুল মালেকের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘শহীদ আবদুল মালেক ফাউন্ডেশন’র অধীনে পরিচালিত হয়। রাজধানীতে চারটিসহ সারাদেশে ফোকাসের কমপক্ষে ৩০টি শাখা আছে। ঢাকার ফার্মগেটে ফোকাস ও রেটিনার প্রধান শাখা।
জামায়াতের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচালিত বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়ান, নর্দান, দারুল ইহসানের দুটি পক্ষ, ঢাকায় বাংলাদেশ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (উদ্যোক্তা যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী) অন্যতম।
এছাড়াও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ১৯ জন প্রতিষ্ঠাতার মধ্যে বেশির ভাগই বিএনপি-জামায়াত সমর্থক ব্যবসায়ী-শিল্পপ্রতি।
মঙ্গলবার রাজধানীর কল্যাণপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত ৯ জঙ্গির তিনজনের পরিচয় মিলেছে, যাদের দু’জনই জামায়াত-শিবির পরিচালিত দুটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। এর মধ্যে জঙ্গি সাবি্বরুল হক কণিক জামায়াত সমর্থক ব্যক্তিদের পরিচালিত আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (চট্টগ্রাম ও ঢাকা) চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
একই ঘটনায় পুলিশের গুলিতে আহত জঙ্গি রাকিবুল হাসান (রিগেন) ২০১৫ সালে এইচএসসি পাস করে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য বগুড়া শহরে স্থানীয় জামায়াত-শিবির পরিচালিত ‘রেটিনা কোচিং’ সেন্টারে ভর্তি হয়। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কারণে মঙ্গলবার রাতে বগুড়া শহরের বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ বিতর্কিত ‘রেটিনা কোচিং’ সেন্টারে ভাঙচুর চালায়, আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে স্থানীয় জামায়াত-শিবির নেতারা ‘রেটিনা কোচিং’ সেন্টারে হামলার জন্য শহর সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের দায়ী করে।
মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত আরেক জঙ্গি সাজ্জাদ রউফ অর্ক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এর আগে গুলশান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলায় নিহত দুই জঙ্গিও নর্থ সাউথের শিক্ষার্থী ছিল।
এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কয়েকটি জঙ্গি হামলায় যেসব জঙ্গি নিহত ও গ্রেফতার হয়েছে এদের বেশির ভাগই জামায়াত সমর্থক ব্যক্তিদের পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিল। জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ব্যাপকহারে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উদ্ঘাটন হওয়ায় উৎকণ্ঠায় আছেন জামায়াত-শিবিরের শিক্ষা ব্যবসায়ীরা।
এদিকে সনদ বাণিজ্য, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় ইন্দনের অভিযোগে মঙ্গলবার জামায়াত প্রতিষ্ঠিত বিতর্কিত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। পাশাপাশি সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আউটার ক্যাম্পাসও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই পরিচালনা করছেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা।
জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় জামায়াত-শিবিরের শিক্ষা ব্যবসা চিহ্নিত করতে সরেজমিনে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে একাধিক সংস্থা। জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যনির্ভর প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’র বিষয়ে অতীতের দুটি তদন্ত প্রতিবেদন এবং নতুন আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে শিক্ষা প্রশাসন।
জামায়াত-শিবিরের আরও যত প্রতিষ্ঠান :
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয় গত ৬ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামী নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন আর্থিক, শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেয়। এর আগে ২৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ওই নির্দেশনার আলোকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের খোঁজ খবর নিতে শুরু করে।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার আলোকে দেশব্যাপী জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রিত ৫৬১টি বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তেও জামায়াতের ১২৭ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়। এর আগে ২০১৩ সালে শাহবাগে আন্দোলন শুরু হওয়ার গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত জামায়াত-শিবির নেতাদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও রয়েছে, আইবি ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, আইবি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কিং ফয়সাল ইনস্টিটিউট, কুমিল্লার আল-আমিন একাডেমি, ইসলামী প্রি-ক্যাডেট স্কুল, লাইসিয়াম কিন্ডারগার্টেন, আল হেরা কিন্ডারগার্টেন, চট্টগ্রামের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আল্লামা মওদুদী ইনস্টিটিউট, আল জাবের ইনস্টিটিউট, আল জাবের বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জামান-আনোয়ার ইনস্টিটিউট, ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদ হাইস্কুল, আবু হুরায়রা একাডেমি, আদর্শ ইসলামিক ক্যাডেট স্কুল, আয়তুল হিকমা ক্যাডেট মাদ্রাসা, মডার্ন টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, তালিমুল কুরআন ট্রাস্ট, ইসলামিক অ্যাডুকেশন সেন্টার, ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক হইয়ার লার্নিং সোসাইটি অন্যতম।
এছাড়া জামায়াত-শিবিরের বেশকিছু নোট-গাইড বই ও প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এর মধ্যে বহুল বিতর্কিত ‘পিস’ পাবলিকেশন, কামিয়াব গাইড ও প্রকাশনী, আল ফাতাহ গাইড, আল ফালাহ গাইড, আধুনিক প্রকাশনী, সোনালী সোপান প্রকাশনী, তাছমিয়া পাবলিকেশন, শতাব্দী প্রকাশনী, ইসলামিক সেন্টার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক ন্যাট, প্রত্যয় প্রকাশনী, প্যান্টন প্রিন্টিং প্রেস, গ্লোবাল প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন নেটওয়ার্কস, চট্টগ্রামের মদিনা একাডেমি পাবলিকেশন অন্যতম।
দৈনিক সংবাদ