• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১২ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

খালেদাকে অভিনন্দন, কেকের ছুরিতে হৃদপিণ্ডের রক্ত ঝরে

পীর হাবিবুর রহমান।। পীর হাবিবুর রহমান ।।

এবার বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কেক কেটে জন্মদিন পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খবরটি জানাতেই আনন্দিত হয়েছি। স্বস্তি পেয়েছি। শোকরিয়া। মানুষের ইচ্ছাকেই সম্মানিত করে তিনি সঠিক পথটিই নিয়েছেন। খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন।

প্রতিবছর শোক দিবসে কেক কাটার দৃশ্য হৃদয় রক্তাক্ত করেছে। জাতির জনকের শাহাদাত বার্ষিকীর রজনীতে একজন জাতীয় নেত্রীর জন্মদিনের কেক কাটার উৎসব কখনোই গৌরবের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তারাধিকারিত্ব বহন করেনা। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীর শোকাবহ রজনীতে জন্মদিনের কেক কাটলে বুকে রক্ত ঝরে। ঢাউস সাইজের কেক কাটার ছবি আমাদের জাতীয় রাজনীতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যর চিত্রপটে এক বিবৎস রূপই তুলে ধরেনি, একজন জাতীয় নেত্রীর নির্দয়তাকেও উন্মোচিত করে। তাই ম্যাডাম খালেদা জিয়া জাতীর বেধনা বিদূর শোকাবহ রজনীতে আপনি কেক কেটে জন্মদিন পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সঠিক কাজ করেছেন। রাজনীতিতে সবাই যা চেয়েছেন তাই করেছেন। … অভিনন্দন।

আপনার রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে, আপনার শাসনামল নিয়ে সমালোচনা ও হাজার প্রশ্ন থাকতেই পারে। ৭১-এর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী স্বাধীনতা বিরোধী ও মানবতাবিরোধী অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চাপ থাকতেই পারে। কিন্তু তারপরও আপনি একজন গণতন্ত্রের নেত্রী। সেনাশাসন কবলিত বাংলাদেশে সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের বীর উত্তমের সহধর্মীনি হিসেবে আপনি রাজনীতিতে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। সেই সময়ে উত্তাল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আপনার সাহসী ভূমিকা ও নেতৃত্বের গুণাবলী দিয়েই জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছিলেন। এমনকি সেনাশাসন অবসানের পর গণতন্ত্রের নবযাত্রায় ৯১ সালের অবাধ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে সকল হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে গণরায়ে ভিক্টোরি খচিত বিজয় চিহ্ন নিয়ে প্রধামন্ত্রী হয়েছিলেন। আপনি গণরায়ে দুবার ও সাংবিধানিভাবে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। যারা ১৫ই আগস্ট আপনার জন্মদিন ঘোষণা করে কেক কাটার উৎসব শুরু করেছেন তারা আপনাকে দিয়ে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের মনেই যন্ত্রণা দেননি, মুজিব অন্তপ্রাণ মানুষের হৃদপিন্ডে ছুরি চালিয়েছেন।

১৫ই আগস্ট জাতীর জীবনে এক শোকাবহ দিন। ৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ফজরের নামাজের সুরেলা আযান উপেক্ষা করে একদল বিপদগামী সেনাসদস্য পরিবার-পরিজনসহ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের ঠিকানা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে নৃশংসভাবে জাতীর মহত্তম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ট্র্যাজেডি বা বিপর্জয় আর কখনো আসেনি। তাই নয়, বিশ্বে কোন রাষ্ট্র নায়ককে এভাবে পরিবার -পরিজনসহ জীবন দিতে হয়নি। তার জীবন-যৌবন ছিল মানুষের অধিকার আদায় ও জাতির মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত। জেল-জুলুম, নির্যাতন, ফাঁসি কোন কিছুই তাকে আটকাতে পারেনি।

একটি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মোহনায় একসূতোয় বেধেছিলেন তার অসীম সাহসী নেতৃত্বের গুণে। ৭০-এর গণরায় নিয়ে জাতির অধিকার আদায়ের সকল আপোষের পথ উপেক্ষা করে অসহযোগ আন্দোলনের পথে নিজের জীবন বিপন্ন করে পাকিস্তানের আক্রমণের মুখে বাঙালী জাতিকে ঐক্যের মোহনায় মিলিত করে একজন বিশ্বনন্দিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা হিসেবেই নন, জাতির নির্বাচিত অবিসংবাদিত নেতা হিসেবেই স্বাধীনতার ডাক দেন। একদল ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তি আর ব্যক্তি বিশষ ছাড়া দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ স্বশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। যারা যুদ্ধে যাননি মানসিক সমর্থন করেছেন।

সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আপনার স্বামী জিয়াউর রহমান বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেই বীর উত্তম। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বশস্ত্র যুদ্ধে যারা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন, আত্মদান করেছেন, সম্ভ্রম হারিয়েছেন, ইতিহাস তাদের অমরত্ব দিয়েছে। ইতিহাস রচনায় কাটা ছেঁড়া, সংকীর্ণতা প্রতিটি শাসক দেখিয়ে আসলেও জনগণের হৃদয়ে সবাই যার যার প্রাপ্য সম্মানে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু আওয়ামী লীগের নেতাই নন, জনগণের নেতা ও অভিভাবকে পরিণত হন। তাই আওয়ামী লীগ ও তার সরকারের একজন সমালোচক হলেও অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করি আমার আত্মাজুড়ে তিনিই সেই মহান রাজনীতিবিদ। তাই বলি বঙ্গবন্ধুই আমার নেতা মানুষই আমার দল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড একদল বিপদগামী সেনাসদস্য সংগঠিত করে একটি নির্বাচিত সাংবিধানিক সরকারকে উৎখাত করে তারই বিশ্বস্ত সহচর ইতিহাস যাকে মীর্জাফর বলে চিহ্নিত করেছে, নিন্দিত করেছে সেই খুনী মুশতাককে ও আওয়ামী লীগের কয়েকজনকে অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসিয়ে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারা থেকেই বিচ্যুত করেনি, সামরিক শাসনের দুয়ার খুলে দিয়েছিল। সেই কলঙ্কের বোঝা বা রক্তাক্ত ক্ষতের যন্ত্রণা এখনো বাংলাদেশ বইছে।

দেশের অকৃতজ্ঞ সন্তানরা হত্যাকাণ্ড ঘটালেও, বিশ্বাসঘাতক সহকর্মীরা অবৈধ ক্ষমতায় বসলেও সেদিন বিশ্ব রাজনীতিতে বহমান দুই সুপার পাওয়ারের ঠাণ্ডাযুদ্ধ কবলিত আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ষড়যন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ১৫ই আগস্টের কালো রাত। পরবর্তী প্রতিটি শাসক ইতিহাসের এই মহান নেতার প্রতি অন্যায়-অবিচার ও অমর্যাদা করেছেন। ঘাতকচক্র তার লাশটিকে পর্যন্ত ভয় করে কঠোর প্রহরায় টুঙ্গি পাড়ায় কবর দিয়েছিলেন। আর পরবর্তী শাসকরা তার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের চিরসত্য হয়ে শেখ মুজিব বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সঙ্গে দিনে দিনে উদ্বাসিত হয়েছিলেন আপন মহিমায়-আপন কীর্তিতে।

আওয়ামী লীগ করেন না, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন না, বঙ্গবন্ধুর নামে জীবন ও জীবীকা নির্বাহ করেন না, কিন্তু সুমহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে লালন করেন, এমন লাখো কোটি মানুষ তাকে হৃদয়ে দিয়ে শ্রদ্ধা করেন ও ভালবাসেন। বাংলাদেশের আত্মা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ ও মুক্তযুদ্ধের গৌরব পূর্ণতা পায় না। জনগণের রাজনীতি, মানুষের কল্যাণের রাজনীতি হয় না।

বেগম খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় নেত্রী হিসেবে দেশের মানুষ আপনার প্রতি আস্থা হারায় নি, কিন্তু আপনার জন্মদিন ১৫ই আগস্ট হলেও আপনি এবার জন্মদিনের কেক কাটতে যাবেন না। জন্মদিনের কেক কেটে আনন্দ লাভের কিছু নেই আপনার। জনগণের রাজনীতিতে ৭১ বছর বয়সে এসে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পথে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে মানুষের কল্যাণ ও তাদের আবেগ অনুভূতিকে লালন ও সম্মান দানই সুখের হওয়ার কথা। কেক কাটলে সেই ছুরিটি ঢাউস সাইজের কেকের মধ্যে নয়, বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের মতো আবেগ অনুভূতি প্রবণ মানুষের হৃদপিণ্ডে চালানো হবে। সেই হৃদপিণ্ড থেকে যে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরবে তা আপনার জন্য সুখকর হওয়ার কথা নয়।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম আপনার সঙ্গে দেখা করে জন্মদিনের কেক না কাটার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন মহল থেকে প্রতি বছর একই আকুতি জানিয়ে আসছে। এমনকি আপনার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ওয়ান ইলেভেনের কারা জীবন থেকে বেরিয়ে যে ডায়েরী প্রকাশ করেছেন, সেখানে পরিস্কার লিখেছেন ১৫ই আগস্ট জন্মদিন হলেও সেই দিন পালন করা ঠিক নয়। অন্তত পালন করতে হলেও দু-তিন দিন আগ-পিছ করে করা উচিত। আপনার দলের অনেকেও এটি সমর্থন করেন না।

আমাদের দেশে একটি সংস্কৃতি রয়েছে কোথাও বিয়ে বা উৎসব হলে প্রতিবেশী কেউ মারা গেলে সেখানে উৎসবে ভাটা পড়ে। কখনো উৎসব স্থগিত হয় কখনো বা সেটি আডম্ভর হয় না। জাতীয় শোক দিবস বা বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকীর এই দিনে যারা কেক কাটাতেন তারা খুনীদের আত্মাকে সন্তুষ্ট করতেন। আপনাকে সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত করতেন। এরা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনীদের যারা সূর্য সন্তান বলে উল্লাস করেছিলেন তাদেরকেই সন্তুষ্ট করেন। ৭১-এর পরাজিত পাকিস্তান ও যেসব দেশ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তাদেরকে খুশি করান। এই কালো শক্তির ফাঁদে আপনি আর পা দেবেন না সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রাতের প্রথম প্রহরে অতীতে দলের নেতা-কর্মীরা আনপকে নিয়ে কেক কাটার উল্লাস করতেন।

যদি আপনার জন্মদিনে কেক না কেটে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকীতে তার ও তার সঙ্গে শাহাদাত বরণকারী পরিবারের সদস্যদের জন্য পরিবারের জন্য দোয়া মাহফিল করান, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিক থেকে সেটি হবে গ্রহণযোগ্য। শোকের দিনে জন্মদিন পালন না করার এ সিদ্ধান্ত বহাল থাক বাকি জীবন। আওয়ামী লীগ আপনার ও আপনার স্বামী সন্তান নিয়ে যতকথা বলুক। আপনার ও দলের ওপর সরকার অন্যায় করলেও তার জবাব রাজনৈতিকভাবে দিন। জনগণ নিয়ে। শোক দিবসে কেক কেটে নয়।

উৎসঃ   পূর্বপশ্চিমবডি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ