মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে ঐতিয্যবাহী ভাদর কাটানি উৎসব। শ্রাবণ মাস শেষ হয়ে ভাদ্র মাস পড়েছে। উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘ভাদর কাটানি’র প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ীতে যেতে শুরু করেছে নববিবাহিতা বধূরা। এ উৎসবের রীতি অনুযায়ী ভাদ্র মাসের প্রথম দিন হতে সাতদিন পর্যন্ত স্বামীর কল্যাণ কামনায় কোনো নববধূ তার স্বামীর মুখ দর্শন করবেন না।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ভাদর কাটানির’ কোনো ভিত্তি বা কোন ব্যাখ্যা না থাকলেও আদিকাল থেকে প্রথা অনুযায়ী দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে ভাদ্র মাসের পয়লা তারিখ থেকে শুরু হয়ে ৭ তারিখ পর্যন্ত যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে এ উৎসব। উৎসবকে নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে শুরু হয়েছে নানা আয়োজন।
সাজ সাজ রব পড়ে গেছে নতুন বিয়ে হওয়া বর-কনে পক্ষের মধ্যে। উদ্দেশ্য, ‘নববিবাহিতা বধূরা বাবার বাড়িতে নাইয়র যাবে।’ গত বছরের আশ্বিন মাস থেকে এ বছরের শ্রাবণ মাস পর্যন্ত যতো ছেলে-মেয়ের বিয়ে হয়েছে তাদের নিয়েই এ আয়োজন। তাই শ্রাবণ মাসের দু’একদিন বাকি থাকতেই মেয়ে পক্ষের লোকজন অনেকটা ধুমধাম করে মেয়েকে স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ীতে নিয়ে আসেন।
স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস, বিবাহিত জীবনের প্রথম ভাদ্র মাসের এক থেকে সাত তারিখ পর্যন্ত সাতদিন স্বামীর মুখ দেখলে অমঙ্গল হবে, চোখ অন্ধ হয়ে যাবে, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদসহ তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হবে না। তাই নবদম্পতিদের এ মাসে নূন্যতম সাত দিন দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ রাখাই এ অঞ্চলের রীতি হয়ে উঠেছে। তাছাড়া এ মাসে নতুন করে কোনো বিয়ের আয়োজনও করা হয় না। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত এ প্রথাটি দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় হিন্দুু-মুসলিমদের মধ্যে চলে আসছে।
নিয়ম অনুযায়ী, কনে পক্ষ শ্রাবণ মাসের দু’একদিন বাকি থাকতেই বর পক্ষের বাড়িতে সাধ্যমতো বিভিন্ন রকমের ফল, মিষ্টি, পায়েসসহ নানা রকম পিঠা-পুলি নিয়ে যায়। বর পক্ষও সাধ্যমতো তাদের আপ্যায়ণ করে। বাড়ীতে কনে পক্ষের লোকজন আসায় চারদিকে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। কনে পক্ষ থেকে নিয়ে আসা বিভিন্ন খাবার বর পক্ষ তাদের আত্বীয়-স্বজন ছাড়াও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করে।
ইসলাম ধর্ম মতে এর কোন ভিত্তি না থাকলেও এ অঞ্চলে ভাদর কাটানি প্রথাটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এখানে এক সময় সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায় বসবাস করতো। তারা এ উৎসবকে জাকজমকভাবে পালন করতো। তাদের এ রেওয়াজ ক্রমান্বয়ে এ অঞ্চলের মানুুষকে প্রভাবিত করার এক পর্যায়ে উৎসবটি এ অঞ্চলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষের জন্য সাংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়।