বিশেষ প্রতিনিধি: মুই আর ক্যানে ভিক্ষা করির যাওয়ং, মুই এখন আর খাবার চিন্তা করংনা, চটের বস্তা দিয়ে চালা বানেয়া কি কষ্ট করে আছনু। ঝড় বৃষ্টি আর শীতোত মোক আর চিন্তা করিবার নাগিবে না। সরকার মোক একটা ঘর দিয়া কি যে উপকার করছে। ঘর পেয়ে খুশিতে অশ্রুশিক্ত হয়ে এ কথাগুলো বলেছিলেন জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের পুর্নবাসিত ভিক্ষুক বাচ্চনী বেওয়া (৫৫)। তার মত ৯৮৯জন পুর্নবাসিত হাত পেতে ও মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভিক্ষা করা ছিল যাদের পেশা। এই পুনর্বাসিতরা বিভিন্ন সুবিধাভোগী প্রকল্পের আওতায় এসে রুপান্তরিত হয়েছে উন্নয়ন কর্মী হিসেবে। এরা সকলে এখন স্বাবলম্বীর পথে। তালিকাভূক্ত ৯৮৯ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনীর আওতায় আনা হয়। দেয়া হয়েছে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় ৯৫১ জন পুনর্বাসিতকে সদস্য করে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মমূখী করে গড়ে তোলা হয়। মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে খাওয়া মানুষ গুলো রুপান্তরিত হয়ে কর্মের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের সিদ্ধান্ত নেয়। একটি বাড়ি একটি খামারের ঋনের টাকা দিয়ে গরু, ছাগল পালন ও ব্যবসা করে আজ তারা স্বাবলম্বীর পথে। তাদের একাউন্টে বর্তমানে নিজস্ব সঞ্চয় ৪৬ লক্ষ ৬৪ হাজার ৮শ’ টাকা, কল্যাণ অনুদান ৪৫লক্ষ ৬৪হাজার ৮শ, আবর্তক তহবিল ৪৫লক্ষ ৩১ হাজার ৬শ ২৩টাকাসহ মোট তহবিল রয়েছে ১ কোটি ৩৭লক্ষ ৬১হাজার ২২৩টাকা তহবিল রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুনর্বাসিতদের সাফল্যের কথা শুনে সরেজমিনে দেখার জন্য আসেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মূখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। তিনি পুনর্বাসিতদের পুনর্বাসনের কাহিনী শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এদের ঘর নির্মানের প্রস্তাব পেশ করায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প হতে প্রথম পর্যায় ১০জন পুনর্বাসিতদের ঘর নির্মাণের জন্য ৬০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। পুনর্বাসিত ১০জনের ঘর নির্মান কাজের প্লান, ডিজাইন ও প্রাক্কলন মোতাবেক ঘর নিমার্ণ সম্পন্ন হলে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের একটি দল তা পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ৩ দফায় আরো ২৩২ জনের ঘর নিমার্ণের জন্য ঘর প্রতি ৭৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ প্রদান করেন। বরাদ্দ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটি ঘর নির্মাণ কাজ শুারু করেন। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের তত্বাবাধনে উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটি ঘর নির্মান কাজটি বাস্তবায়ন করেছে।
এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী এসএম কেরামত উল্লাহ নান্নু ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান, পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের ঘর নির্মাণ কাজের প্রেরিত প্লান, ডিজাইন ও প্রাক্কলন মোতাবেক ঘর নির্মান করা হয়েছে এবং কাজ সম্পন্ন পূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম মেহেদী হাসান বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক মনিটরিং এর মাধ্যমে উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটির মাধ্যমে ঘর নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পুনর্বাসিতরা ঘর পাওয়ায় তাদের সামাজিকভাবে মর্যাদা বেড়েছে। সফলভাবে ঘর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ায় আগামীতে বাকী পুনর্বাসিতদের ঘরের জন্য বরাদ্দ পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর পেয়ে পুনর্বাসিতরা খুবেই খুশী ও মাথা গোজার ঠাই পেয়েছে বলে পুনর্বাসিতরা অভিমত প্রকাশ করেন। বাহাগিলী ইউনিয়নের আলেমা বেগম জানান, ঝড়-বৃষ্টির দিনোত কি যে কষ্ট করি আছনু। ঘর পাওয়ায় আর কষ্ট করির নাগবে না। চাঁদখানা ইউনিয়নের আলিজোন বেওয়া জানান, সরকার থাকি ঘর পাওয়ায় মোক আর কষ্ট করির নাগবে না। রনচন্ডী ইউনিয়নের মহিলা জানান, আল্লাহ এবার হামার প্যাকে ঘুরে দেখছে, থাকার একটা ঘর হইছে। আলেমা, আলিজোন বেওয়া, মহিলা, বাচ্চানী বেওয়ার মত ২৪২ জন পুনর্বাসিত ভিক্ষুক ঘর পাওয়ায় তাদের দুঃখ দুর্দশার দিন শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প এর অধীনে ৯৮৯জন পুনর্বাসিদের মধ্যে ২৪২জনকে “যার জমি আছে ঘর নেই তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ” প্রকল্প হতে এ সকল পুনর্বাসিতদের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে নীলফামারী জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন কিশোরগঞ্জকে ভিক্ষুকমুক্ত করার বিষয়টি ব্যতিক্রমী ও বড় ধরণের সাহসী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে এ চ্যালেঞ্জিং প্রকল্পটি সকলের সহযোগীতায় সফলতা পেয়েছে। স্থানীয়ভাবে এ মহতি কাজটি যেন সকলে মিলে করি যাতে সাড়া দেশে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হয়। ভিক্ষুক পুনর্বাসনের বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর কার্যালয়ের সুদৃষ্টি থাকায় অবশিষ্ট পুনর্বাসিতদের ঘর নির্মাণ করে দেয়া হবে বলে আশা করছি।
উল্লেখ্য যে, সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিদ্দিকুর রহমানের উদ্যোগে ২০১৪ সালের ৫জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হয়।