• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
“ভালো থেকো আমার না হওয়া মহারানী” চলন্ত ট্রাকে আড়াই ঘন্টা ঝুলে ৩২ লাখ টাকার ইয়াবা জব্দ করলেন সিপাহি জয়পুরহাট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪ ড্রাম ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহি বাসের ধাক্কা, নিহত ৩ সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার

রাজারহাটে মৌমাছি চাষ করে জব্বার এখন কোটিপতি

rajarhat-kurigram-fisher-news-pic-29-09-2016-2রফিকুল ইসলাম, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম): বাড়ির নাম মৌরাণী মহল। সেই মহলে বাস করে কয়েকটি রাণী ও লাখ-লাখ কর্মী মৌমাছি। মহলের মুকুটহীন অধিপতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার (৮৫)। মৌচাষ করে নিঃস্ব অবস্থা থেকে এখন তিনি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন। চেষ্টা আর একাগ্রতার মাধ্যমে ভাগ্য বদলের এক সফল উপাখ্যানের নায়ক তিনি। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলা সদর থেকে ৮ কিঃ মিঃ দুরে ছিনাই ইউনিয়নের মীরেরবাড়ী মৌজার রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কের পার্শ্বেই আলোকিত এই সাফল্য কুঠির মৌরাণী মহলের অবস্থান।
১৯৭১ সনের সদ্য মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছেন ৬ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার। হাক্কোজ নেই। বাড়ি-ভিটা ছাড়া সহায়-সম্পদ বলতে কিছুই ছিলনা তার। অভাব-অনটনের ঘেরাটোপে বন্দি তখন তার সংসার-জীবন। এ সময় কৃষি বিভাগ প্রকাশিত ‘কথা ম্যাগাজিন’ তার হাতে এসে পৌঁছে। সেখানে মৌচাষের কলা কৌশল পড়ে তার চোখ খুলে যায়। তিনি ১৯৭৯ সনে গাজীপুরের জয়দেবপুর বিসিকের ব্যবস্থাপনায় মৌচাষের উপর দু’মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বাড়ি ফিরে শুরু করেন মৌচাষ। এরপর ১৯৮৭ সনে জাতিসংঘের সহায়তায় মৌচাষের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে যান ভারতের পূণ্যায়। সেখানে সেন্ট্রাল বি রিয়ার্স ইনষ্টিটিউটে ৩ মাসের প্রশিক্ষণে শিখে নেন মৌচাষের অনেক অজানা কলা-কৌশল। দেশে ফিরে শুরু করেন উন্নত মৌচাষ। এর পরের গল্প শুধুই… সাফল্যের।
মৌচাষী আব্দুল জব্বার জানান, মৌচাষ করা তেমন কঠিন কিছু নয়। নিয়ম জানা থাকলে যে কেউ মৌমাছি পালন করে মধু উৎপাদন করতে পারবে। বিজ্ঞান সম্মত সাইজের কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালন করা যায়। প্রতিটি কাঠের বাক্সের সাইজ হবে দৈর্ঘ্য ১১ ইঞ্চি, প্রস্থ সাড়ে ১০ ইঞ্চি এবং উচ্চতা সোয়া ৭ ইঞ্চি। বাক্সের আকৃতি হবে চারকোণা। এ বাক্সে ৮টি ফ্রেম রাখা যায়। মৌমাছি বাক্সের ভেতর ঢুকে অবস্থান করে। প্রতিটি ফ্রেমে তৈরী হওয়া মধুর চাকটি যখন কালো রং ধারণ করে তখন চাকটি খুলে নিয়ে আলাদা বাক্সের ফ্রেমে স্থাপন করতে হয়। মৌমাছি বাইরে থেকে মধু সংগ্রহ করে এনে কালো রঙের চাকটিতে মধু ঢেলে দেয়। এক সপ্তাহের মধ্যেই মধু দিয়ে কালো রঙের চাকটি টুই-টুম্বর হয়। এরপর মধুর চাক থেকে হস্তচালিত মধু নিষ্কাশন যন্ত্রের মাধ্যমে মধু আলাদা করা হয়। এরপর আগুনের আঁচে মধু জীবাণুমুক্ত করে বোতলজাত করা হয়। তিনি আরও জানান, বন-জঙ্গল থেকে রাণী মৌমাছি বিশেষ কৌশলে ধরা হয়। বংশবৃদ্ধির জন্য রাণী মৌমাছির জন্ম দেয়া হয় এখানে। এখানকার মৌমাছিরা আশ-পাশের সরিষা ক্ষেত, আম, জাম, লিচু, কলা এবং সূর্যমুখী ফুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফল ও ফুলের গাছ থেকে মধু সংগ্রহ করে।
আব্দুল জবারের মৌরাণী মহলে শুরুতে বাক্সের সংখ্যা ছিল মাত্র একটি। এখন প্রায় ২০০ টিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাক্সগুলো বাড়ি ও বাড়ি লাগোয়া বাগানের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করে রাখা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে এসব বাক্স থেকে মধু উৎপাদন হয়- সরিষার মওসুমে ৬০-৬৫ কেজি। অন্য সময়ে ২৫-৩০ কেজি। প্রতি কেজি মধু পাইকারী ৪০০-৪৫০ টাকা দরে এখানকার অকৃত্রিম মধু কিনে নিয়ে যান রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, এমনকি রাজধানী ঢাকার ব্যবসায়ীরা। মাস শেষে মধু বিক্রি করে আয় হয় শীতকালে প্রায় লাখ টাকা। বছরের অন্য সময়ে মাসিক আয় ৩৫-৪০ হাজার টাকা। পরিবারের সদস্যরাই মধু সংগ্রহ ও শোধনের কাজ করে থাকেন। সুতরাং খরচ নেই বললেই চলে। ভাগ্যের চাকা দ্রুত পাল্টে যায় জব্বারের। আর-কে রোডের পার্শ্বেই ২৫ বিঘা জমি রয়েছে তাঁর। বর্তমান বাজার মুল্যে এ জমির দাম প্রায় দু’কোটি টাকার অধিক। এছাড়া সেলিম নগর বাজারে “ছ”মিল, রাইচ মিল ও ৬টি দোকানসহ নির্মাণ করেছেন বিশাল পাকা বাড়ি। ৬ পুত্র ও ১ কন্যাকে লেখাপড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
আব্দুল জব্বার তার সাফল্যের সুফল একা ভোগ করতে চান না। সে জন্য বাড়িতে স্থাপন করেছেন “খেদাবাগ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা” নামের একটি সামাজিক সংগঠন। তিনি এলাকার উৎসাহী বেকার যুবক-যুবতীদের নিয়ে নিজ খরচে প্রশিক্ষণ দিয়ে হাতে কলমে শেখাচ্ছেন মৌচাষের কলা-কৌশল। ২ মাসের প্রশিক্ষণে ২০-৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী এতে অংশ নেন। তার মতে, বাংলাদেশে মধু উৎপাদন ও রপ্তানীর উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বেকার সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি আয় করা সম্ভব মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। ছিনাই ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান সহঃ অধ্যাপক মোঃ সাদেকুল হক নুরু বলেন, অত্র ইউনিয়নে মৌচাষী আব্দুল জব্বারের বিষয়টি শুধু জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তিনি রংপুর বিভাগের শ্রেষ্ঠ সফল একজন মৌচাষী হবেন। সরকারিভাবে এসব মৌচাষীদের তালিকা প্রণয়ন পূর্বক ঋণদানসহ অনুপ্রেরণা পেলে তারা মৌচাষে আরও উৎসাহী হয়ে উঠতেন। মৌচাষী আব্দুল জব্বার (৮৫) এর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে ক্ষোভ করে বলেন, এসব লিখে লাভ কি? আমার বিষয়ে একাধিক মিডিয়ায় ফলাও করে অনেক সংবাদ করা হয়েছে। তাতে করে কোন লাভ হয়নি। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোন সার্বিক সহযোগিতা তো দূরের কথা, কোন দপ্তর উৎসাহ পর্যন্ত দেননি। রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, তাঁর বিষয়ে এমনিতেই অনেক শুনেছি, তিনি একজন সফল মৌ-চাষী। শীঘ্রই মৌরাণী মহলটি দেখতে যাবো।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ