সিসি ডেস্ক: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুন্ডি ব্যবসা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্বর্ণ, ডলার, বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা, মাদক, পণ্য রপ্তানি ও আমদানির আড়ালে চলছে এই ব্যবসা। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুধু শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়েই বছরে পাচার হচ্ছে শতকোটি ডলার। বিমানবন্দরে এই অপৎপরতা যেমন বেড়ে গেছে, তেমনই সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে নিয়মিত ধরাও পড়ছে হুন্ডির নানা উপকরণ। গ্রেপ্তার হচ্ছে চোরাকারবারিরা। তবে খোদ বিমানবন্দরের একটি সিন্ডিকেটের কারণে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এই কারবার। এর মাধ্যমে দেশের সম্পদ চলে যাচ্ছে বিদেশে, সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
বিমানবন্দরে কর্মরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন সংস্থা হুন্ডির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে ধরা পড়ছে বিপুল পরিমাণ হুন্ডির উপকরণ।
সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে ২৫৪ কেজি স্বর্ণ আটক করে ঢাকা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। প্রতি কেজির দাম ৫০ লাখ টাকা করে হলে এর মূল্য দাঁড়ায় ১২৭ কোটি টাকা। এটি শুধু ধরা পড়েছে। এর বাইরেও অনেক স্বর্ণ দেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। দেশে স্বর্ণ ব্যবসার বড় অংশই বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালান হয়ে দেশে আসে। এগুলোর মূল্য শোধ করা হয় হুন্ডির মাধ্যমে।
এপিবিএন ২০১০ সালের জুন থেকে ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫ বছরে বিমানবন্দর থেকে ৩১৬ কেজি অবৈধ স্বর্ণের চালান আটক করেছে। এ ছাড়া ২০ হাজার ৮৯০ কার্টন সিগারেট, ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা, ১৬ কেজি হেরোইন, ২০ হাজার বোতল মদ, ৭১৫টি কচ্ছপ, ৭১৫টি এলইডি টিভি, ৩ হাজার ৩৬০টি মোবাইল ও ৩ হাজার ৫৯১টি বিদেশি শাড়ি জব্দ করে তারা। এপিবিএন বলছে, এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ২২৯ কোটি ৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এই পাঁচ বছরে এসব পণ্যের সঙ্গে আটক করা হয়েছে ৫ হাজার ১৫৬ চোরাকারবারিকে। গ্রেপ্তারকৃত অনেকের কাছ থেকে বেরিয়ে আসে হুন্ডি ব্যবসার চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাচারে জড়িত থাকা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের নামও উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার (প্রিভেন্টিভ) এইচএম আহসানুল কবির বলেন, বিমানবন্দরে স্বর্ণসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা সক্রিয় রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষা, শুল্কফাঁকি রোধ ও চোরাচালান নিবারণের জন্য এদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানায়, গত ২৪ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৩ কেজি স্বর্ণালংকার ও স্বর্ণবার আটক করে ঢাকা কাস্টম হাউস। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় আনা ১৬ কেজি তরল টোব্যাকো জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। ১৬ জুন বিমানবন্দরে ৩০ লাখ ভারতীয় মুদ্রাসহ আবুল বাশার নামে এক যাত্রীকে আটক করে শুল্ক গোয়েন্দারা। ২৮ জুন বিমানবন্দর থেকে সিটি ব্যাংকের এক লাখ ভুয়া এটিএম কার্ড জব্দ করে ঢাকা কাস্টম হাউস। ২৬ জানুয়ারি বিমানবন্দর থেকে ৩২ কেজি ৬২০ গ্রাম স্বর্ণ আটক করা হয়। ৮ জানুয়ারি ১৯ হাজার সিমকার্ড আটক করে কাস্টমস। চলতি বছর মার্চে ৭৬ হাজার মেমরি কার্ড জব্দ করা হয়। এ ছাড়া সবজি রপ্তানি ও বিদেশ থেকে তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও চলছে এই ব্যবসা। সম্প্রতি বিদেশ থেকে কম্পিউটার আমদানির কন্টেইনারে পাওয়া গেছে ইট-বালি ও ছেঁড়া কাগজ। কম্পিউটার আমদানির এলসি খুলে বিদেশে ডলারে মূল্য শোধ করেও পণ্য দেশে আনা হয়নি। আবার সবজি রপ্তানি করা হচ্ছে, কিন্তু এর মূল্য দেশে আসছে না। অনেক ক্ষেত্রে বেশি সবজি রপ্তানি করে এলসিতে দেখানো হচ্ছে কম। বাকি পণ্যের মুদ্রা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেন, বিমানবন্দরে হুন্ডির মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের প্রবণতা বেড়ে গেছে। বিভিন্ন আমদানি-রপ্তানি অথবা অবৈধভাবে অর্থপাচারের মাধ্যমে এগুলো হচ্ছে। বন্দরগুলো দিয়ে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নগদ আকারে বৈদেশিক মুদ্রাও (বাল্কক্যাশ) স্থানান্তরের ঘটনা ধরা পড়ছে। যেটির বিরুদ্ধে গত তিন বছর ধরে আমরা অভিযান পরিচালনা করে আসছি।
তিনি বলেন, আরেকটা বিষয় হলো বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিং। এর মাধ্যমে পণ্য আমদানি বা রপ্তানির ক্ষেত্রে টাকা পাচার করা হচ্ছে। বেশিরভাগই হচ্ছে হুন্ডির আড়ালে। সেটার ওপর আমরা নজরদারি চালাচ্ছি। কিছু প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি। এ নিয়ে দ্রুত আরও কাজ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হুন্ডি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট বিমানবন্দরে দায়িত্বরত অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে গড়ে তুলেছেন নিবিড় যোগাযোগ। এই সিন্ডিকেটের কাছ থেকে নিয়মিত সুবিধাও নেন অসাধু কর্মকর্তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে ধরা পড়লেও জামিনে বের হয়ে ফের একই কাজে যোগ দিচ্ছেন অনেকে। অনেককে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়েও দমানো যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ধনী ব্যবসায়ী এবং ভারতীয় মাড়োয়ারিরা মুদ্রার মাধ্যমে হুন্ডির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। আর এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশি ছাড়াও পাকিস্তান, ভারত এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের। বিমানবন্দর সিভিল এভিয়েশন, বিমান, ব্যাংক, কাস্টমস, মানি এক্সচেঞ্জ, সিঅ্যান্ডএফের সহায়তায় মুদ্রা পাচারের ঘটনা ঘটছে।
বিমানবন্দরে দায়িত্বরত এপিবিএনের এএসপি তানজিনা আক্তার বলেন, বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অবৈধ চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এপিবিএন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বর্ণ চোরাচালান এবং সবজি রপ্তানির আড়ালে বিমানবন্দর দিয়ে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হচ্ছে। শুল্ক বিভাগের হিসাব বলছে, চাল ও আলুর মতো পণ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করা হয়েছে। এসব মুদ্রা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বৈদেশিক মুদ্রাপাচারে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকা ট্রেড লিংক, ইন্টারপোর্ট, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হিমালয় ট্রেড, তাহোরা ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এসব অবৈধ কার্যক্রমে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস।