সিসি ডেস্ক: ‘বাঁকা পথের, নির্বাক পথিক’- ছেলেটির ফেসবুকের বায়োগ্রাফিতে লিখা। মুরারি চাঁদ কলেজের পথটি সেদিন বাঁকাই ছিল। সবাই যে পথ ছেড়ে পালায়- সে পথটিতো বাঁকাই। আর নির্বাক পথিক- যে পথিক নিরবে হাঁটে। তিনিও নিরবে এগিয়ে গিয়েছিলেন সেই বিকেলে রক্তস্নাত মানবতাকে জিইয়ে দিতে।হালকা পাতলা গড়নের, শ্যামল বর্ণের তরুণ এম আই ইমরান। পুরো নাম মোহাম্মদ ইমরান কবির। ফেসবুকে ইংরেজি বর্ণের পাশে বাংলা বর্ণমালাতে আরেকটি নাম রয়েছে তার- ‘মুসাফির’।
সিলেট সরকারি কলেজ থেকে সদ্য এইচ এস সি দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতিতেই ব্যস্ততা তার। জেলার কোম্পানীগঞ্জের ঢালারপাড় গ্রামের এই যুবক জেলা নগরীতে থেকেই পড়ালেখা করছেন। রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই তার।
সোমবার বিকেলে এমসি কলেজে হাঁটতে গিয়ে মুখোমুখি হন নির্মম বাস্তবতার। একটি মেয়েকে কুপিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। অথচ এগিয়ে যাচ্ছে না কেউ। সবাই উল্টোপথেই দৌড়ুচ্ছে।
চাপাতির কোপে রক্তে রঞ্জিত খাদিজা বেগম নার্গিসকে পাজাকোলা করে তুলে ছুটলেন হাসপাতালের পথে। নাম না জানা আরও দুই যুবক তাকে সহযোগিতা করলেন। আর তখন জনতা গণধোলাই দিচ্ছিল ‘বদ’ বদরুলকে।
বড় বোনের পরম মমতায় খাদিজাকে একটি সিএনজি অটোরিকশাতে করে নিয়ে গেলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
জরুরি বিভাগে নিয়ে চিকিৎসকদের আশ্রয় করে দিলেন রক্তাক্ত বোনটিকে। খাদিজার শরীর থেকে রক্তক্ষরণে রক্তে লাল হয়ে গেছে ইমরান কবিরের পুরো কাপড় চোপড়, শরীর।
খাদিজাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার পর জরুরি রক্তের প্রয়োজন পড়লে এই ইমরানই জানালেন তার রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ। প্রথম ব্যাগটি তারই দেয়া।
খাদিজার স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে আসার পর রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে ওসমানী হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) খাদিজাকে রেখে নিজ বাসায় ফিরেন ইমরান কবির।
মো. ইমরান কবির জানান- ‘সবাই দৌড়ে পালাচ্ছিল ভয়ে আতঙ্কে। আমি এগিয়ে গেলাম। পুকুরপাড়ে মেয়েটি পড়ে আছে রক্তাক্ত। জ্ঞানহীন। একজন লোকও এর আগে এগিয়ে যায়নি তার সাহায্যে। আমি চিৎকার করে সাহায্য করার জন্য ডাকলে পরে নাম না জানা দু’জন আসলেন।’
পরে মেয়েটিকে সিএনজি অটোরিকশাতে করে নিয়ে যাওয়া হয় মেডিকেলে। অপারেশন থিয়েটারে থাকাকালীন প্রয়োজনীয় ঔষধপত্রও কিনে দেন ইমরান।
তিনি জানালেন, মেয়েটিকে বাঁচাতে হবে! এই ইচ্ছাশক্তিই তাকে প্রেরণা যুগিয়েছে। আর তার পরিবারের শিক্ষা।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার বিকেল ৫ টার দিকে এম সি কলেজ ক্যাম্পাসে সরকারি মহিলা কলেজের ডিগ্রী (পাস) কোর্সের ২য় বর্ষের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে নির্মমভাবে কুপিয়ে জখম করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সিনিয়র সহ-সম্পাদক বদরুল ইসলাম।
খাদিজা আক্তার নার্গিস ঢাকার স্কয়ার হসপিটালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। আর বদরুল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেলের তৃতীয় তলাতে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন।