• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৯ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

মহেশপুরে টুটুলের ব্যতিক্রমী লাইব্রেরি

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: শ্যামলছায়ায় ঢাকা পাখির কাকলিতে মুখর নিভৃত এক পল্লী গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি টিনশেড ঘর। লোহার খুঁটিতে ঘরের সামনে টাঙানো  সাইনবোর্ড। দূর থেকেই সেটি যে কারো দৃষ্টি কাড়বে। টিনশেড ও চারপাশে টিনের বেড়ায় ঘেরা ঘরটির ভেতর কোন জ্ঞানপিপাসু ঢুকলে তাঁর অবাক না হয়ে উপায় নেই।
লাইব্রেরী ঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো- বই দিয়ে ঠাসা ৭/৮টি আলমারি। আরও অনেক বই আলমারি/র‌্যাকের অভাবে সযতেœ গোছানো আছে দু’একটি টেবিলের উপরে। লক্ষ্যনীয় বিয়য় হচ্ছে- ঘরভর্তি পাঠক, অথচ পিনপতন নিরবতা। লম্বা টেবিলে সারিবদ্ধভাবে বসে বই পড়ছেন বেশ কয়জন পাঠক। কেউবা চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন দৈনিক পত্রিকার পাতায়। এলাকার মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী- এ হচ্ছে মাতৃভাষা গণগ্রন্থাগারের সুন্দরতম এক নৈমিত্তিক দৃশ্য।
উদ্যমী স্বপ্নবাজ এক তরুণের একক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই লাইব্রেরী। অজপাড়া গাঁয়ের মানুষ এখন লাইব্রেরীর কল্যাণে বই পড়তে পারেন। চোখ বোলাতে পারেন অনেক গুলো দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়। ওই তরুণের নাম এম. কে. টুটুল। সে জানালেন- বায়ান্ন তাঁর চেতনা, একাত্তর তাঁর প্রেরনা। মা মাটি মানুষ মুক্তিযুদ্ধ তার সমান প্রিয়। তাই তো তাঁর প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরীর নাম রেখেছেন  মাতৃভাষা গনগ্রন্থগার। স্বল্প পরিসরে হলেও নিজ বিভায় ক্রমে ক্রমে বিকশিত হয়ে উঠছে লাইব্রেরীটি।
ঝিনাইদহ মহেশপুর উপজেলার অজপাড়াগাঁ কালুহুদায় ২০০১ সালে এম. কে. টুটুল নামের মুক্তমনের অধিকারী, পরপোকারী ও সমাজ সচেতন তরুণের নিরলস প্রতিষ্ঠার আধুনিক সুযোগরবঞ্চিত এমন এক অখ্যাত পল্লীতেই গড়ে ওঠে লাইব্রেরীটি। মাত্র ১৬ বছরের ব্যবধানে ছোট্ট পরিসরের সেই লাইব্রেরীর কার্যক্রম ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করেছে, আশপাশের প্রত্যন্ত গ্রাম গুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে। টুটুল এখন শিক্ষার আলো দিয়ে আলোকিত করছে পুরো অঞ্চলকে। মাতৃভাষা গনগ্রন্থগার বদলে দিচ্ছে এসব এলাকার শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক পরিবেশ।
দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক ও ফরম পূরণের অর্থ সরবরাহ ও জামানত কিংবা চাঁদা ছাড়া এ লাইব্রেরীতে বই ও পত্রিকা পড়ার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত। এলাকার সবার মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি লাইব্রেরীর উদ্যোগে নিয়মিত গরীব মানুষের বসত বাড়িতে বৃক্ষরোপন, জাতীয় দিবস পালন, কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে।
এছাড়াও গণসচেতনা সৃষ্টি করতে মাল্টিমিডিয়া প্রজক্টর মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, মাদক, যৌতুক, ইভটিজিং-এর  বিরুদ্ধে প্রচারনা চালানো এছাড়াও তরুণ প্রজন্মকে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব গাথা ইতিহাস জানানোর লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনি সে সাথে গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। আর  এ কাজকে আরো গতিশীল করতে সম্প্রতি লাইব্রের তে কেনা হয়েছে একটি হ্যান্ডমাইক।
এসব কারণে কালুহুদাসহ আশপাশের সব গ্রামের জ্ঞানপিপাসু মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এ লাইব্রেরীর কার্যক্রম। ডাঃ সাইফুল ইসলাম ডিগ্রী কলেজের শিক্ষার্থী আবু হাসান দৈনিক ৩ কিলোমিটার হেঁটে এ লাইব্রেরীতে পড়তে আসেন। লাইব্রেরীর কল্যাণে তিনি এসএসসিতে ভালো ফল করতে পেরেছেন। আলাপকালে আবু হাসান বলেন, আমার লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক এবং সহপাঠ্য বই কেনার সামর্থ ছিল না এ লাইব্রেরী আমার সেই অভাব মিটিয়েছে।
একই ধরণের কথা বলেন, পাশের হাবাশপুর গ্রামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোঃ শিপন হোসেন, জোকা গ্রামের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেলোয়ার হোসেন, শংকরহুদা গ্রামের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন  ও কালুহুদা গ্রামের চৌগাছা ডিগ্রী কলেজের ছাত্র হাসানুর রহমান।
কালুহুদা গ্রামের ৬২ বছর বয়সী  মোঃ লুৎফর রহমান বলেন, দারিদ্র পীড়িত এ এলাকার মানুষ স্বাভাবিক কারণেই লেখাপড়া বিমুখ ছিল। স্কুলশিক্ষা শুধু বিত্তবানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন দিনমজুরের মেয়েছেলেরাও স্কুলে যায়। লাইব্রেরীর কল্যাণেই এ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
এসব এলাকার শিক্ষার্থী-কৃষক-যুবকসহ বেশিরভাগ মানুষ এখন লাইব্রেরী মুখে। লুৎফর রহমান খুব গর্ব অনুভব করেন এ জন্য যে, উপজেলা শহর থেকে জ্ঞানপিপাসু মানুষের স্রোত এখন উল্টে কালুহুদা গ্রামের দিকে। তিনি বলেন, মহেশপুর থেকে এখন কবি সাহিত্যিক গবেষকরা বই পড়তে আমাদের গ্রামে চলে আসে। আমাদের খুব ভাল লাগে।
টুটুলের অক্লান্ত পরিশ্রম, তার মায়ের স্নেহ ছায়া আর হাজার মানুষের ভালবাসায় ভিজে ভিজে এগিয়ে যাচ্ছে মাতৃভাষা গনগ্রন্থগার। টুটুল যখন বই সংগ্রহ করতে ঢাকা বা অন্য কোথাও যায়, পত্রিকা সংগ্রহ বা লাইব্রেরী সংক্রান্ত কাজে উপজেলা বা জেলা সদরে যায় তখন এই গ্রন্থগারটি বুক দিয়ে আগলে রাখেন তার মা। তার অনুপস্থিতিতে পাঠককে বই সরবরাহ করেন মা। ’মা-ই আমার সব। তার প্রশয় ছাড়া আমি এমন একটি কাজে এগিয়ে আসতে পারতাম না।’ বিনয়ী হাসি দিয়ে বললেন টুটুল।
টুটুলের মা শুকতারা বেগম বলেন, ‘টিউশনির আয়, বাড়ির গাছের ফল বিক্রি করা, এমনকি আমার সংসারের বাজার কিংবা ঔষধ কেনা টাকা থেকেও লাইব্রেরী পেছনে ব্যয় করে টুটুল। টিনশেডের নড়বড়ে ঘর হওয়ায় ঝড়বৃষ্টি এলে তার অস্থিরতা দেখলে খুবই কষ্ট লাগে। আমারও সামর্থ্য নাই পাকা ঘর তৈরী করে দেয়ার। লেখাপড়া শেষ হবার পর পরিবার থেকে চাকরির জন্য চাপ দিয়েছি।
কিন্তু সে তার প্রানের লাইব্রেরী ছেড়ে যেতে নারাজ। এখন আমি সমাজ দেশ ও জাতির কল্যাণে শহীদ রুমীর মতো টুটুলকেও…।’ তার কণ্ঠ বাস্পরুদ্ধ হয়ে আসে।  লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতা এম. কে. টুটুল বলেন, ‘১৯৯৫ সালে ৮ম শ্রেনীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় বড় অসময় বাবা মিজানুর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। বিধবা মায়ের অসচ্ছল সংসার থেকে লেখাপড়া করতে অনেক কষ্ট হয়েছে।
এ ছাড়াও ২০০০ সালের আকস্মিক বন্যায় এলাকায় ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। দরিদ্র পিতামাতা তাদের সন্তানদের নতুন বইখাতা কিনে দিতে পারছে না। এই অবস্থা থেকে আমার মাথায় লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার ভাবনা আসে। এরপর নিজের বাড়ির এক কোণে টিন-বাঁশের ঘর তৈরী করি। মামা শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবলের লেখা ‘ধূসর সীমান্ত’ সহ মাত্র ৫০টি বই নিয়ে লাইব্রেরির যাত্রা শুরু করি। এখন বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। পাঠ্যপুস্তক, কৃষি, মুক্তিযুদ্ধ বিষযক বই- মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত চলচ্চিত্র ও প্রামান্য চিত্র, গল্প-উপন্যাস, কবিতা-প্রবন্ধ সহ সাহিত্যের ও সব ধরণের বই আছে এ লাইব্রেরীতে।
অমর একুশে বইমেলা, প্রকাশক, লেখক ও খ্যাতিমান মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে এসব বই সংগ্রহ করেছি। এছাড়া প্রতিদিন ৮ কিলোমিটার বাইসাইকেল চালিয়ে উপজেলা সদর থেকে সংগ্রহ করে আনি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা।’
টুটুলের সব স্বপ্ন এ এলাকার মানুষের বাতিঘর খ্যাত মাতৃভাষা গনগ্রন্থগারকে ঘিরে। তার ইচ্ছা সেখানে শিশুদের জন্য পৃথক কর্ণার ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের। তথ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এ অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। আর শিশুকর্ণারে অবুঝ শিশুরা নিজেদের মতো করে হেসে খেলে বেড়াবে। কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভালো মানের ভবনসহ আধুনিক প্রযুক্তির অভাব। গ্রন্থগারের জরার্জীণ টিনের চালা আজও বিদ্যমান।
গ্রন্থগারের ভবিষ্যৎ ভেবে সুহৃদয় প্রাক্তন ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক জনাব শফিকুল ইসলাম, বর্তমান জেলা প্রশাসক জনাব মাহবুব আলম তালুকদার, প্রাক্তন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব নাছিমা খাতুন, বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব আশাফুর রহমান ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ড.আব্দুল মালেক গাজী মহোদয়দের মহানুভবতায় (৩৭.২৯ বর্গফুট আয়তন বিশিষ্ট) নতুন ভবনের কাজ নির্মাণাধীন। ভবনটি নির্মাণে আনুমানিক খরচ হবে ১৫ লক্ষ টাকা। যদিও গ্রন্থগারের নিজস্ব কোনো তহবিল নেই। তারপরও আশাবাদী টুটুল। মানুষের ভালবাসাকে পুঁজি করে এগিয়ে যেতে চান আরো বহুদূর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ