মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: দিনাজপুরে ইটভাটা গ্রাস করছে ফসলি জমি। ইটভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে জমির উপরিভাগের মাটি। এতে জমির উর্বরতা হ্রাসের পাশাপাশি জমি হারিয়ে ফেলছে ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা। এছাড়া আবাদী জমির ইটভাটা গড়ে উঠায় দিনদিন কমে যাচ্ছে আবাদী জমির পরিমান।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী জেলার ১৩টি উপজেলায় ছোট বড় ১৭৬টি ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটাগুলোর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৩টি, বিরলে ১৭টি, বীরগঞ্জে ও বোচাগঞ্জে ১৬টি করে, চিরিরবন্দর ও নবাবগঞ্জে ১৯টি করে, পার্বতীপুর উপজেলায় ৩০টি। বাকিগুলো অন্যান্য উপজেলায়।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ইটভাটায় বছরে তৈরি হয় গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ইট। দিনাজপুর ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক বকুস জানান, এক হাজার বর্গফুট মাটি দিয়ে ইট তৈরি হয় ৮ হাজার ৫শ’টি। সে হিসেব অনুযায়ী প্রতিটি ইটভাটায় প্রতিবছর ইট তৈরির জন্য ১২ থেকে ১৫ একর জমির উপরিভাগের মাটি কাটতে হয়। এতে জেলার ১৭৬টি ইটভাটায় প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার একরেরও বেশি জমির উপরিভাগের মাটি কাটতে হয়।
পরিবেশবিদ আবুল কালাম আজাদ জানান, আইন অনুযায়ী একটি ইটভাটার মোট দু’একর মাটি কাটার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু ইটভাটা মালিকরা তা উপেক্ষা করে প্রতিটি ভাটায় ১২ থেকে ১৫ একর আবাদি জমির মাটি কেটে নিচ্ছে।
দিনাজপুর সদর ও বিরল উপজেলার কয়েকটি ইটভাট সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইটভাটা গড়ে উঠেছে আবাদি জমির উপর। আবাদী জমির ইটভাটা গড়ে উঠায় দিনদিন কমে যাচ্ছে আবাদী জমির পরিমান।
এসব ভাটায় ইট তৈরির জন্য কেটে নেয়া হচ্ছে জমির উপরিভাগের মাটি। মাটির গুণাগুণ সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অধিক মুনাফার আশায় দালালের মাধ্যমে জমির মালিকরা মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন ইটভাটা মালিকদের কাছে। প্রতি বিঘা জমির মাটি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে কিনছেন ইটভাটা মালিকরা।
বিরলের হাসিলা গ্রামের সোহরাব হোসেন জানান, তিনি এক ফুট গভীরতায় মাটি কেটে নেয়ার শর্তে ইটভাটা মালিকের কাছে এক একর জমির মাটি বিক্রি করেছেন ৫০ হাজার টাকায়।
জমির উপরিভাগের মাটি কাটার ফলে জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। উপরিভাগের ৪ থেকে ৬ ইঞ্চির মধ্যে থাকে জমির খাদ্যকণা ও জৈব উপাদান। এছাড়াও জমির উপরিভাগের মাটি কাটার ফলে জমি নিচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে ওইসব জমিতে ধান চাষ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।
দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. মনছুর রহমান বলেন, মাটির উপরিভাগে যে গুরুত্বপূর্ণ জৈব পদার্থ থাকে তা নিচের মাটিতে থাকে না। জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ফেলা হলে আগামী ২০ বছরেও সেই জমির প্রয়োজনীয় জৈব পদার্থের ঘাটতি পূরণ হবে না। উদ্ভিদের জন্য যে পুষ্টির প্রয়োজন তা থাকে মাটির উপরিভাগে। মাটির উপরিভাগের ৮ ইঞ্চির মধ্যে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, বোরন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংকসহ ১৩ ধরনের পদার্থ থাকে। যা উদ্ভিদের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেয়ার ফলে এসব পদার্থ চলে যাচ্ছে ইটভাটায়। তিনি ইটভাটায় এসব উর্বর আবাদি জমি ব্যবহার না করে পুকুর কেটে মাটি ব্যবহার অথবা জমির মাটি কাটার সময় উপরিভাগের মাটি সরিয়ে নিচের মাটি কাটার আহ্বান জানান। পরে উপরিভাগের মাটি ওই জমিতে পূরণ করে দিয়ে আবাদ করার পরামর্শ দেন এই মাটি বিশেষজ্ঞ।