।। তুষার আবদুল্লাহ ।। খুঁজি। নিত্য খুঁজে বেড়াই। শহরে-গ্রামে। করিডোরে মেঠোপথে। কেবল চোখ যে পেতে রেখেছি তা নয়, পেতে রেখেছি কানও। কারণ যাকে, যাদের খুঁজছি তাদের কণ্ঠ শুনলেই চিনে নিতে পারবো। চোখ দেখেই যে সব সময় চেনা যায়, তাতো নয়। কণ্ঠের দৃঢ়তা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত, স্বপ্নের মানুষকে চিনে নিতে পারি।যাকে এভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছি তিনি হচ্ছেন ‘নেতা’। এই নেতা এখন নিখোঁজ। স্বঘোষিত নেতার ঘাটতি নেই কোথাও। বরং হাটে মাঠে ঘাটে ক্ষমতা চক্রে এই স্বঘোষিত নেতা উপচে পড়ছে। কিন্তু আমি এবং আমরা যে নেতাকে খুঁজছি সেই নেতা অনুপস্থিত। নিখোঁজ তারা। কেন নিখোঁজ বা অনুপস্থিত তারা? উত্তর খুঁজতে গুগল অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই।
সবার জানা -নেতা নির্মাণের আতুঁড় ঘরে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে নেতা তৈরির অনুশীলন বন্ধ দীর্ঘ ২৭ বছর। এই যে ২৭ বছর নেতা নির্মানের আতুঁড় ঘরটি বন্ধ রয়েছে, তার বিরূপ প্রভাব কি কেবল রাজনীতির মাঠে, মঞ্চে এবং সংসদে দক্ষ নেতার অভাব? বাস্তবতা হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ধাপেই এর বিরূপ প্রভাব সুস্পষ্ট।
নেতা তৈরির আতুঁড় ঘর বলতে আমরা যে ছাত্র সংসদকে বুঝি বা জানতাম, সেখানে শুধু শ্লোগান দেয়া, বক্তৃতা দেয়ারই অনুশীলন হতো তা নয়। সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলার সৃজনশীলতার চর্চা হতো।
এই চর্চার মাধ্যমেই নেতৃত্ব তৈরির অনুশীলন চলতো। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শিখতো, নতুন-পুরাতন চিন্তা নিয়ে তর্ক করে ভাবনার নতুন দিগন্তে পৌঁছতে চাইতো। লেখার অনুশীলন হতো এবং সার্বিক ভাবে নিজের কোন কাজের প্রতি এক প্রকার জবাবদিহীতা ছিল।
এই চর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকা শিক্ষার্থী সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ না করে সরকারি-বেসরকারি চাকরি কিংবা ব্যবসায় যোগ দিলে, সেখানে তারা আলো ছড়াতেন। তুলে ধরতেন নিজেদের স্বাতন্ত্র্যতা। এবং ঐ পেশাতে তারা দক্ষতার পরিচয় রাখতেন, দিতেন নেতৃত্ব। ফলে, পেশাজীবীদের কাছ থেকে আমরা যে দক্ষতা দেখতে পেতাম গত ২৭ বছরে তার অবনমন ঘটেছে।
এই অবনমন এবং মানহীনতা আমরা তৃণমূলের রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত দেখছি। ১৯৯০ এর পর দেশে বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ পর্যায়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। ১৯৯০ ছাত্র সংসদের নেতারা এখন প্রবীণ।
সেই সাবেক ছাত্র নেতারা এখনো বিন্দু বিন্দু আলো ছড়িয়ে রেখেছেন রাজনীতিতে। কিন্তু গত ২৭ বছরে সৃজনশীল রাজনীতির চর্চার বাইরে আছে যে ছাত্র রাজনীতি, সেখান থেকে আলো ছড়ানোর মতো নেতৃত্ব কয়জন পেয়েছি? প্রশ্ন দশ দিক ঘুরে এলেও কোন সংখ্যা হয়তো খুঁজে পাবে না।
আমরা রাজনীতির ময়দানের মতো আমাদের প্রশাসন এবং সকল পেশাতেই দক্ষ বক্তা ও কুশলী কর্মী খুঁজে পাচ্ছি না। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে গত ২৭ বছর যারা যুক্ত ছিলেন, আছেন তাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে জবাবদিহীতা নেই।
কারণ ভোটের জন্য তারা শিক্ষার্থীদের কাছে দায়বদ্ধ নন। তারা পদের জন্য কেন্দ্রের নেতাদের কাছে দায়বদ্ধ। ফলে কেন্দ্রের লেজুড়বৃত্তি ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতিই চলছে। এই প্রক্রিয়ায় সৃজনশীল রাজনীতির অনুশীলন প্রত্যাশা করাটাই বোকামী।
তবে ছাত্র সংসদে তালা ঝুলিয়ে রাখার সুবিধাটা নিয়েছে মুনাফা ও দখল মনস্ক রাজনীতিক নেতারা। রাজনীতিতে তাদের অনুপ্রবেশই ঘটেছে এই সময়ের মধ্যে। তারাই ঐ তালার চাবি বুক পেকেটে রেখে দিয়েছেন।
কারণ তারা জানেন ছাত্র সংসদের তালা খুলে গেলে, দেশে আবার সৃজনশীল রাজনীতির চর্চা শুরু হবে, তৈরি হবে দক্ষ নেতৃত্ব। রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রেই আমরা আবারো সেই স্বপ্নের নেতাদের কন্ঠস্বর শুনতে পাবো।
প্রকৃত নেতারা হবেন দৃশ্যমান। আর অনুপ্রবেশকারীরা হবেন বিতাড়িত। তাই তারা চাইবেন চাবিটি লুকিয়ে রাখতে। আমি মনে করে সেই জং ধরা চাবি খুঁজে সময় অপচয়ের প্রয়োজন নেই। তালাটিতেও এতোদিনে মরিচা পড়ে গেছে।
কতো জেলের তালা ভাঙ্গার অভ্যাস ও গৌরবইতো আমাদের আছে। সুতরাং এই তালা ভেঙ্গে ছাত্র রাজনীতির নুতন দিন আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো। তবে তালা আমাদের ভাঙ্গতে হবে এখন এমনটাও মনে হচ্ছে না।
কারণ দেশের শীর্ষ ব্যক্তি মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিজেই ছাত্র সংসদের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। তাগিদ দিয়েছেন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। কারণ এখনো বাংলাদেশের রাজনীতির শীর্ষে যারা অবস্থান করছেন, তারাতো ঐ সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এসেছেন। তারা নিশ্চয়ই যোগ্য উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান। আর সেই জন্য তারাই খুলে দেবেন বন্ধ ছাত্র সংসদের দুয়ার।