
।। এম সাখাওয়াত হোসেন ।। বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/বহু ব্যয় করে বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু/ দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া/ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শীষের উপর/একটি শিশির বিন্দু। রবীন্দ্রনাথের এই বিখ্যাত কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের এ লেখার সূচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কবির বর্ণনায় যেমনটি ব্যক্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি আমার ভ্রমণকাহিনি। পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি এবং তার ওপর ভিত্তি করে প্রায় প্রতিবছর একটি করে বই লিখেছি কিন্তু দেশের ভেতরের বহু জায়গায় যাওয়া হয়নি, তবে সে তালিকা খুব একটা বড় না হলেও একেবারেই সংক্ষিপ্ত নয়। তাই এবার সিদ্ধান্ত করলাম মাঝে মধ্যে দেশের অন্তত কয়েকটি অধিক পরিচিত জায়গা একবার দেখার চেষ্টা করব। তাই এবার কয়েকজন সফরসঙ্গী নিয়ে আমরা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণস্থল কোরাল দ্বীপ বলে পরিচিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ সফরে গিয়েছিলাম। আমাদের যেতে হয়েছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন শহর কক্সবাজার হয়ে। আমরা সেন্টমার্টিন যেতে এবং ফিরে আসার পথে দুরাত কক্সবাজার ছিলাম।
সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম টেকনাফের অদূরে জলযানঘাট থেকে প্রায় দুঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগরের আনুমানিক আট কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। এ পথটুকুতে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য যে কয়েকটি জলযান রয়েছে সেগুলো বছরের সীমিত সময় চলাচল করে। মূলত নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের শেষদিন পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে সেন্টমার্টিনে চলাচলের সময়। এর পর সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে বিধায় যাত্রী নিয়ে ছোট আকারের এই জলযানগুলোকে অনুমতি দেওয়া হয় না। এগুলো কোনোভাবেই সমুদ্রযান বলে শ্রেণিগত নয়। তবে স্থানীয়রা বলেছেন, গ্রীষ্মকালে বড় বড় ট্রলারে সীমিতসংখ্যক দেশি ও কিছুসংখ্যক বিদেশি পর্যটক যাতায়াত করে থাকেন তাদের নিজেদের উদ্যোগে। সাধারণত পর্যটন মৌসুমে দেশীয় পর্যটকদের আনাগোনাই বেশি, তবে তাদেরও সিংহভাগ দিনে দিনে ফিরে আসেন। অনেকে রাত্রিযাপন করেন কয়েকটি সীমিতসংখ্যক কটেজ, মোটেল আর হোটেলে। কয়েকদিনের সরকারি ছুটির সময় রাত্রিযাপনের জায়গাও পাওয়া যায় না।
টেকনাফ থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার দূরের এই একমাত্র কোরাল দ্বীপটি মিয়ানমার রাখাইন অঞ্চলের তট থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ ভূমি। কোরাল দ্বীপ হওয়ায় বাংলাদেশের অন্য পলিমাটির দ্বীপগুলো থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের। কোরাল পাথরের প্রাকৃতিক বেষ্টুনীর কারণে পাড় ভাঙার প্রবণতাও বেশ কম। মূল দ্বীপের সঙ্গে দক্ষিণে একটি সামান্য বিচ্ছিন্ন দ্বীপের নাম ছেড়া দ্বীপ। আর রয়েছে ছোট ছোট দুটি কোরাল দ্বীপ, যেখানে সঙ্গত কারণেই জনবসতি নেই। মূল দ্বীপটিতেই রয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষের বাস, যাদের অনেকেরই মূল বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে। গত তিন দশকে আরও কিছু রোহিঙ্গা বলে পরিচিত মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে মানুষের বাস রয়েছে।
পর্যটনের জায়গা হিসেবে ১৯৯৮ সালে সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর বেশ কিছু দালানকোঠা আর স্থাপনা তৈরি হয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই ব্যক্তিমালিকানাধীন। রয়েছে কিছু সামরিক ও আধাসামরিক স্থাপনা। যার মধ্যে রয়েছে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং আনসার ভিডিপির স্থাপনা। তা ছাড়া একটি ছোট হাসপাতাল রয়েছে। সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের একটি ইউনিয়ন, তাই রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। গত নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজার। একজন ওয়ার্ড মেম্বার জানালেন, গত নির্বাচনে তিনি ৬২টি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভোট পড়েছিল প্রায় ষাট ভাগের কাছাকাছি। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় কয়েক হাজার অস্থায়ী পর্যটক আসেন এ দ্বীপে বেড়াতে। যদিও ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর তেমন কিছু গড়ে ওঠেনি, যেমনটা আমরা দেখেছিলাম এখান থেকে আরও দক্ষিণে ভারতীয় কোরাল দ্বীপপুঞ্জ আন্দামান দ্বীপগুলোয়। এখানে সহজেই জলক্রীড়া ও প্রমদক্রীড়াগুলো গড়ে উঠতে পারে।
দ্বীপটিতে সাইকেল-রিকশা আর সাইকেল-রিকশাভ্যান বলে কথিত যানবাহনই চলাচলের একমাত্র বাহন। তবে আয়তনে ছোট হওয়ায় দ্বীপের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত, প্রায় ৮ কিমি. হেঁটেই যাওয়া যায়। পূর্ব-পশ্চিমের সমুদ্রতট দৃষ্টিনন্দন, বিশেষ করে উভয়প্রান্ত থেকে সূর্যোদয় ও অস্ত যাওয়ার দৃশ্য অবলোকনের জন্য। এখানকার অর্থনীতির মূল সমুদ্র থেকে মাছ ধরা, যৎসামান্য কৃষি ও পর্যটন। তবে মৌসুমে পর্যটনই হয়ে ওঠে অর্থনীতির মূল কর্মকা-। ছোট বাজার এবং কয়েকটি রেস্তোরাঁ অন্তত দিনের সময়টিতে থাকে সরগরম। পর্যটন মৌসুম শেষ হলে বাজারটিও নিস্তেজ হয়ে পড়ে আর যানবাহনগুলো ঝিমিয়ে থাকে। স্থানীয়রা বলেন, ওই সময়ে তাদের জন্য ভালো মৌসুম কারণ চড়া দামের মাছগুলো তাদের ক্রয়ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে। অন্যথায় সামুদ্রিক মাছের দাম রাজধানী ঢাকা শহরের তুলনায়ও বেশি থাকে। কারণ তখন বিভিন্ন মাছের ভাজা বা বারবিকিউর ব্যাপক চাহিদা থাকে, বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে চড়া দাম থাকে এসব সুস্বাদু তাজা ফরমালিনবিহীন মাছের।
কেয়া আর নারকেল গাছে পরিপূর্ণ দ্বীপটি জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশেষ সামুদ্রিক জীব, কোরালের জন্য বিখ্যাত। তবে হাজার হাজার মানুষের আগমন এবং অনিয়ন্ত্রিত নিষিদ্ধ কোরাল পাথর, ঝিনুক, শামুক ইত্যাদি উত্তোলন ও নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অবাধ বিক্রয়ের কারণে পরিবেশের দারুণ ক্ষতি হচ্ছে। যদিও কোস্টগার্ড এবং হালে পর্যটন পুলিশের স্থাপনা রয়েছে তথাপি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অথবা আইন কার্যকর না করায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের কারণে দ্রুত জীববৈচিত্র্য হারাতে বসেছে। অনেকেই আমাকে বলেছেন, দ্বীপের পরিধি সম্প্রসারণ হওয়ায় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কোরাল নামক জলজ প্রাণীগুলো দূরে সরে যাওয়ার কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তার ওপর রয়েছে আমাদের অপরিচ্ছন্ন অভ্যাস। সমুদ্রসৈকতগুলো প্লাস্টিক আর বিভিন্ন পরিত্যক্ত দ্রব্যাদিতে ভরপুর। পরিষ্কার করার তেমন সামর্থ্য নেই ইউনিয়ন পরিষদের। পরিষদের আয় সীমিত, শুধু ট্রেড লাইসেন্সের ওপর নির্ভরশীল অথচ অন্য সব ইজারা দেওয়া হয় জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে। পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার কারণে স্থানীয় ট্যাক্স এবং পর্যটন ট্যাক্সের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি ভালোভাবেই দেখভাল করতে পারে। এমন একটি জায়গায় ইউনিয়ন পরিষদ নিজের আয় বাড়াতে পারে, খরচ করতে পারে অন্যান্য উন্নয়নের জন্য। এমনটা হলে জেলা পরিষদ অথবা সরকারি অনুদানের ওপর তেমন নির্ভর করতে হবে না বলে স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
এই দ্বীপটি কবে বঙ্গোপসাগরে জন্মেছিল তার তেমন তথ্য না পাওয়া গেলেও প্রায় দু’শ পঞ্চাশ বছর আগে এখানে প্রথম পা ফেলেছিল আরবের নাবিকরা এবং এ জায়গার নাম রেখেছিল ‘জাজিরা’ বা দ্বীপ। সেই থেকে এই দ্বীপ ‘জিঞ্জিরা’ বা ‘নারকেল জিঞ্জিরা’ হিসেবেও পরিচিত। তবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের পর এর নাম রাখা হয় সেন্টমার্টিন, যে নামে অধিক পরিচিত। এই দ্বীপটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের হাতে আসে প্রথম ‘এঙ্গলো-বার্মিজ’ যুদ্ধের পর। তার পর থেকেই তৎকালীন বার্মা বা মিয়ানমার দ্বীপটি নিজেদের বলে দাবি করে আসছিল। যে দাবি ১৯৪৭ ভারত বিভাজনের পরও থেমে থাকেনি। এখনও থেকে থেকে মিয়ানমারের কোস্টগার্ড এবং নৌবাহিনী অনেক জেলেকে ধরে নিয়ে যায় বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। হয়তো সে কারণেই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সবলে উপস্থিতি দৃশ্যমান। যাহোক এ কয়েকটি নাম ছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের লেখনীর কল্যাণে এ দ্বীপের আর একটি নাম দারুচিনি দ্বীপ।
মালদ্বীপের সর্বদক্ষিণের অংশটি সম্পূর্ণ প্রবাল অঞ্চল, যার নাম ছেড়া দ্বীপ। বর্ষায় এবং জোয়ারে বিচ্ছিন্ন থাকে বলেই এই জায়গার নাম ছেড়া দ্বীপ। এখানে জনবসতি তেমন নেই, তবে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশীয় পর্যটকের পদভারে মুখরিত থাকে। একই সঙ্গে বেপরোয়া জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, বিভিন্ন কোরাল জাতীয় পাথর সংগ্রহে ক্রমেই দ্বীপটি মৃত্যুর পথে রয়েছে। স্থানীয় একজন ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার জানালেন, নিষিদ্ধ হলেও প্রভাবশালীদের কারণে তারা আইন প্রয়োগ করতে পারছেন না। এমনকি হালে কিছুসংখ্যক প্রভাবশালী কোরাল পাথর উত্তোলন করে ছোট ছোট টুকরা করে ট্রলারে করে নিয়েছেন চুনাপাথরগুলো এবং রঙিন কোরাল পাথরগুলো এখন নেই বললেই চলে। তবে ওই প্রতিনিধিই জানালেন, এই সরকার আগামী তিন বছর এ ছেড়া দ্বীপ পর্যটকদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে পরিবেশ বাঁচাতে এবং যাতে কোরালগুলো সরে যেতে না পারে।
আমরা একদিন কাটিয়েছি এই দ্বীপটিতে। সামনে সমুদ্রের নীলপানি অদ্ভুত এক অনুভূতি জাগিয়েছিল। এমন নিটল নীল পানি এর আগে দেখেছিলাম আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে আন্দামান সাগরে। যেভাবে ওই দ্বীপপুঞ্জে পর্যটনশিল্প গড়ে উঠেছে তার কিছু এখানে অনুকরণীয় হলেও ব্যবস্থাপনা ভালো হতো। সরকার একটি পর্যটন করপোরেশন পুষছে অথচ তাদের কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ার মতো নয়। রয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, তিনিও যে খুব সক্রিয় তেমন দেখা যায় না। সেন্টমার্টিনের মতো দ্বীপ বাংলাদেশে একটাই যা প্রাকৃতিক দ্বিতীয় দ্বীপ আমরা তৈরি করতে পারব না তাই হারালে আর পাওয়া যাবে না।
বহুদিন পরে কক্সবাজারে গিয়েছিলাম সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে। বর্তমানে বিমান ছাড়াও বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিমান নিয়মিত যাতায়াত করছে সেখানে। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত আগের তুলনায় অনেক পরিচ্ছন্ন হলেও অপরিকল্পিতভাবে অগণিত হোটেল-মোটেল যেভাবে গড়ে উঠেছে সে কারণে কক্সবাজারকে পর্যটন নগরী বলা যায় কিনা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এ রকম বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো কীভাবে অনুমোদন পায় তা জানা নেই।
কক্সবাজার শহরটিও তেমন বড় নয়। ১৮৬৯ সালে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পৌরসভা। বর্তমানে এর আয়তন ৬.৮৫ বর্গকিলোমিটার। পৌরসভার জনসংখ্যা প্রায় ৫২ হাজার। কক্সবাজার জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৭৪ সালে। ওই সময় কেমন ছিল তার চিত্র পাওয়া না গেলেও বর্তমান চিত্র সুখকর নয়। এমন একটি নোংরা শহরকে কীভাবে পর্যটন নগরী হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়! রাস্তাগুলোকে রাস্তাও বলা যায় না। ড্রেনগুলো বন্ধ নোংরা আর দুর্গন্ধের কারণে নাক-মুখ চেপে চলতে হয়। জায়গায় জায়গায় জলাবদ্ধতা, মশার জন্মস্থান। দৃশ্যত মিউনিসিপ্যালিটির কোনো কর্তৃত্বই দৃশ্যমান নয় অথচ কক্সবাজার পৌরসভার অর্থাভাব হওয়ার কথা নয়। এমন নগরীকে আমার কাছে পর্যটন নগরী বলে মনে হয়নি। বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকতের শহরটির এমন অস্বাস্থ্যকর দশায় আমরা বিদেশি পর্যটকদের কীভাবে আকৃষ্ট করব আমার বোধগম্য নয়।
পরিশেষে সংক্ষেপে বলতে হয়, আমাদের দেশে আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় তেমন বৈচিত্র্য নেই, তবে যাও আছে সেগুলোই বা আমরা কতখানি সংরক্ষণ বা উন্নয়ন করছি তা ভেবে দেখতে হবে। সরকারের অর্থ খরচ করে পর্যটন সপ্তাহ পালন দিয়ে পর্যটনের বিকাশ হয় না, প্রয়োজন অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণের। অন্যথায় সেøাগান সেøাগানেই থেকে যাবে।